প্রজন্মের ভাবনা
আশেক মাহমুদ সোহান
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৪ ১২:৫৯ পিএম
করোনা মহামারির সময় তরুণ প্রজন্ম বিষণ্ন অবস্থায় পার করেছে। মহামারি পার হওয়ার পর গোটা বিশ্বের ভূরাজনীতি বদলাতে শুরু করেছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে দুটি যুদ্ধ, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত-সহিংসতা, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, পশ্চিমা সম্প্রদায়ের আধিপত্য-প্রভাব কমে যাওয়ায় মাল্টিপোলার বিশ্বে প্রতিটি দেশই নানামুখী সংকটে পড়ছে। প্রতিটি দেশেরই শঙ্কা আলাদা হলেও একটি বিষয় সম্প্রতি রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর নেতিবাচক প্রভাব এখন প্রতিটি দেশের জন্যই বড় রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ভাবনা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নানামুখী ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনা হচ্ছে বটে, কিন্তু তা যেন রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টোতেই সীমাবদ্ধ। এর মূল কারণ অধিকাংশ দেশেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিষয়টি প্রবীণ রাজনীতিকদের হাতে থাকা এবং তরুণ প্রজন্মের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।
রাজনীতি করা এবং রাজনীতিসচেতন হওয়াÑদুটি আলাদা বিষয়। কিন্তু এ দুটিই মূলত বৃহৎ অর্থে রাজনীতি। আমাদের দেশে তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিসচেতন নয়। তবে রাজনীতি করার প্রতি অনেকেরই আগ্রহ দেখা যায়। আগ্রহটি আদর্শ দ্বারা অধিকাংশ সময় চালিত হয় না। বরং তারা ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য দেয় এবং অনেক সময় নিজ দলের জন্য বড় সংকট দাঁড় করায়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট থাকা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ার বিষয়ে প্রবীণরা খুব বেশি চিন্তিত এমনটি বলা যাবে না। অথচ উন্নত দেশগুলোয় কেউ রাজনীতি না করলেও অন্তত খোঁজ রাখে। তাদের কাছে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বের বিষয়টি কখনই এড়ানোর নয়। এ সচেতনতা আছে বলেই তারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত-সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। ভূরাজনৈতিক সচেতনতা তাদের পোক্ত বলেই রাষ্ট্রও তরুণদের কথা শুনতে বাধ্য হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনের পক্ষে সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভের বিষয়টি লক্ষ করলেই বোঝা যায়। তাদের এ অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্য বারবার শঙ্কা প্রকাশ করলেও তা কোনো ভূরাজনৈতিক প্রভাব রাখতে পারছে বলে মনে হয় না।
প্রবীণ রাজনীতিকদের তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতির জন্য প্রস্তুত করার দায়িত্ব পালন করতে হয়। কিন্তু সে দায় যেন তাদের নেই। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তাদের ভাবনা কম। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি তাদের কম ভোগ করতে হবে। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম অনাগত ভবিষ্যৎ কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারে। উন্নত দেশগুলোয় তরুণরা তাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সবার আগে চিন্তা করে কোন রাজনৈতিক দলটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি রোধ করতে সব থেকে বেশি সক্রিয়। অথচ আজ তরুণদের অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষার পর তার লক্ষ্য কী, এমনকি রাজনীতিতে তার অবস্থান কীÑএসব প্রশ্নে জর্জরিত এখনকার প্রজন্ম। ফলে রাষ্ট্রের গতিবিধি কেমন হবে, তা নিয়ে আগ্রহ আরও কমেছে। তরুণদের রাজনীতিবিমুখ হওয়া মানেই একটি রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির গতিবিধি পথ হারানো। তরুণরা সচেতন হলে এবং যখন তারা রাষ্ট্রের কাছে দাবি করবে, তখন রাষ্ট্রও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সচেতন হয়ে উঠতে পারবে। তরুণদের উদ্যোগেই ভবিষ্যৎ সুন্দর ও বর্তমানের এ ভয়াবহতা মোকাবিলা করার পথ তৈরি হবে। বিদ্যমান বাস্তবতায় রাজনীতিসচেতনতা ছাড়া জীবন গড়ার সংগ্রাম অনেক বেশি কঠিন। সে কঠিন সংগ্রাম প্রজন্মের সামনে।