অর্থনীতি
ড. নীলাঞ্জন কুমার সাহা
প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৪ ১২:২৮ পিএম
২২ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের কারণে রিজার্ভ রক্ষায় কৃচ্ছ্রসাধন নীতিতে চলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে ডলার খরচ কমানো হয়েছে। তাতে একদিকে কিছু ডলার সাশ্রয় হলেও উৎপাদনমুখী পণ্যের কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতেও লাগাম পড়েছে। আমদানি কমায় উৎপাদনও কমেছে। ফলে চাহিদার বিপরীতে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তথ্যমতে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) নিত্যপণ্যের এলসি বা ঋণপত্র খোলা কমেছে ১৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ২০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডলার সংকটের কারণে দুই বছর ধরে কম গুরুত্বপূর্ণ ও বিলাসপণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা। এর কিছু সুফলও মিলেছে। তবে বিলাসী পণ্য নিয়ন্ত্রণের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের আমদানিতে। ডলারের অভাবে এসব পণ্যের আমদানিকারকরাও চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে পারছেন না। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সংকটের কারণে ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি কমার প্রভাব পড়েছে বাজারের ওপর। চাহিদামতো এলসি করতে না পারায় পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে।
আমরা দেখছি, মূল্যস্ফীতি আমাদের জন্য একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি মাসেই প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি কমানোর বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এ স্তম্ভেই লিখেছিলাম, বাস্তবতার নিরিখে বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যে প্রত্যাশা-সদিচ্ছার কথা বলা হয়েছে তা সংকট নিরসনে অপ্রতুল। বাজেটের আকার যদি আরেকটু ছোট রাখা যেত এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের মাত্রাটা আরও কম রাখা হতো তাহলে আমাদের বাজেট ঘাটতির পরিমাণও কমত। প্রস্তাবিত বাজেটের পর সংশোধিত বাজেটে সম্ভবত এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ মূল্যস্ফীতি যেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, তা দেখলে এ মুহূর্তে বেশ কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া দরকার। প্রথমত মূসক, রেগুলেটরি ডিউটি, আমদানি শুল্ক এসব জায়গায় ছোটখাটো পরিবর্তন করা যেতে পারে। সামান্য এ পরিবর্তনে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন না হলেও সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেত। তৃতীয়ত, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ও মানুষের খরচের চাপ বিবেচনায় করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো প্রয়োজন। বছরে সাড়ে ৩ লাখ টাকার আয়সীমা বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করলে, এ টাকার ক্রয়ক্ষমতা কতটুকু আছে তা একবার ভেবে দেখা জরুরি। টাকার প্রকৃত মূল্য বিবেচনা করে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের অভাব। কর্মসংস্থানের জন্য ব্যক্তি খাতকে প্রণোদনা দেওয়া, উৎসাহিত করার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা আমাদের শিল্প খাত বিস্তৃত করতে চাচ্ছি। অভ্যন্তরীণ শ্রম খাত তৈরিতে শ্রমিকদের জন্য রেশনিং, সুলভমূল্যে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিবেচনা করা যেতে পারে। মনে রাখা জরুরি, শিল্প খাতে যে প্রণোদনা দেওয়া হয় তা সামান্য শর্তভিত্তিক করতে পারলে শ্রমিকরা স্বস্তি পেত। পাশাপাশি শিল্প খাতেরও অগ্রগতি ঘটত। বিগত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির চাপে-তাপে পিষ্ট শ্রমিকরা তাদের অধিকারের জন্য বেশ কয়েকবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এর সমাধান শুধু বেতনভাতা বাড়ালেই মিলবে না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জোর দেওয়া জরুরি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দারিদ্র্যমোচন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মুদ্রানীতির মাধ্যমে কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে সুদহার ফ্লেক্সিবল করে মানি সাপ্লাই কমিয়ে আনা ও রেপো বা নীতিসুদহারের পরিবর্তনের মতো বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এ উদ্যোগগুলো একটু দেরিতেই নেওয়া হয়েছে। মানুষের চাহিদা যখন পড়তির দিকে এবং আর্থিক খাতের প্রতি আস্থা কমে যেতে শুরু করে, তখন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য সুদের হারে পরিবর্তন সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেনি। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ-কর্মসূচি বাড়াতে হবেই। কিন্তু মানুষকে আবার আর্থিক খাতের দিকে কীভাবে আকৃষ্ট করা যায় সেদিকেও মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
মূল্যস্ফীতি বাগে আনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় একটা দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। আমদানি পণ্যের মূল্যস্ফীতি ছাড়াও সার্বিক বাজার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে একটা মূল্যস্ফীতি রয়ে গেছে। বারবার বলা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে আমরা তেমন সাফল্য অর্জন করতে পারছি না। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দের দিক থেকে এবং আওতা বাড়ানোর দিক থেকে কয়েক গুণ বাড়ানোর মাধ্যমে এ পরিস্থিতিতে একটা বিকল্প সমাধান আনা যেত। শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্তদের জন্যও ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া যেত। এ ক্ষেত্রে যদি বড় ধরনের উল্লম্ফন করা যেত, তাহলে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেত। যেমন আরও বেশি টিসিবি কার্ডের ব্যবস্থা করা, টিসিবির পণ্যে আরও বেশি ছাড় দেওয়া, পণ্যের সংখ্যা আরও বাড়ানো ইত্যাদি। এসবের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটানোর প্রয়োজন ছিল। এখনকার সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে বরাদ্দ আছে সেটা পেনশন, সুদ ও বৃত্তিকে হিসাব করলে ১৭ শতাংশের মতো। এ বিষয়গুলো বাদ দিলে মূল বাজেটের ১০ থেকে ১১ শতাংশ সরাসরি দরিদ্রদের কাছে যাচ্ছে। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, মাথাপিছু ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, নতুন করে কিছু মানুষকে ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। এগুলো সাধুবাদ জানানোর মতো। তবে সার্বিক চাহিদার তুলনায় এটা একেবারেই অপ্রতুল।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন দরকার। এর একটি বিষয় হচ্ছে শহরাঞ্চলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংখ্যা বাড়ানো। শহরের বস্তিতে কিন্তু অনেক দরিদ্র মানুষ রয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে তাদের স্বস্তি দেওয়ার জন্য সুস্পষ্ট যদি কিছু থাকত তাহলে তাদের জন্য সেটা অনেক উপকারে আসত। কর্মসংস্থান তৈরির জন্যও বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে এখন ব্যক্তি খাতে ঋণের প্রবাহ কম হওয়ায় বড় ধরনের কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা যেহেতু কম, সেখানে এ ধরনের পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বা এনট্রিপলএস কার্যকর করবারও এটি প্রকৃত সময়। বেশ কয়েক বছর আগেই এটা জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর যে চিন্তা সেটা এখন বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে। এখন টিসিবির বরাদ্দ ও সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়ানো দরকার। টিসিবির পণ্যগুলোয় আরও কিছুটা ভর্তুকি দেওয়া গেলে, পণ্যের সংখ্যা বাড়ালে তা মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এটা প্রয়োজনীয়। গ্রামে নিজস্ব জমি নিজস্ব খামারের কারণে মানুষ চাপটা কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারে।
প্রকল্পগুলো ডিজিটাল করার মাধ্যমে কিছু দুর্বলতা কমানো এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনের পদ্ধতি হালনাগাদ করাটাও এখন জরুরি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে পেনশন, সুদ ও বৃত্তিÑএ তিন ক্যাটাগরি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে আলাদা করতে হবে। পেনশনটা মধ্যবিত্ত পায়, অনেক ক্ষেত্রে উচ্চবিত্তরাও পেনশন পায়। আমরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা যখন বলি, তখন কেবল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কথাটাই বেশি বেশি বলি। অথচ খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে, সার্বিক খাদ্যব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে একটা সমন্বয় সেল দরকার। প্রতিযোগিতা কমিশনের সক্ষমতা বাড়িয়ে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ যদি কেউ বিনষ্ট করে এর জন্য একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স তৈরি করতে হবে।
বহুদিন ধরে ডলারের মূল্যমান ধরে রাখা, সুদহার ধরে রাখার ঘটনা ঘটেছে। এসব অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ের কারণ মূল্যস্ফীতি এখন লাগামছাড়া অবস্থায় চলে গেছে। তাই অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী এবং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে খুব দ্রুত মূল্যস্ফীতির বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ পেতে কিছুদিন লাগবে। তবে সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়া যেতে পারে।