স্থানীয় সরকার
ড. মোসলেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৪ ১৫:০৭ পিএম
দেশে যে ধরনের
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা দেখা যায় তা মূলত সরকারেরই বর্ধিত অংশ। মহান মুক্তিযুদ্ধোত্তর ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন জাতির পিতা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সাল থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ও রাষ্ট্রীয়
কাঠামো সুসংহত করার পথ মসৃণ করার বিষয়ে তার একাধিক পরিকল্পনা ছিল। ওই পরিকল্পনার
মধ্যে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার দূরদর্শী ভাবনাও ছিল। যদিও সুসংহত কাঠামো
পূর্ণাঙ্গ রূপদানের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যাও তাঁর সামনে ছিল। প্রথমে স্থানীয় সরকারকে
তিনি ‘পঞ্চায়েত’ নামে অভিহিত করলেন। পরে নাম দিলেন ‘ইউনিয়ন পরিষদ’। এরশাদ সরকার আমলে
স্থানীয় সরকারকে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম
পরিচালনা সহজ করতে উপজেলা পরিষদ গড়ে তোলা হয়। এভাবে স্থানীয় সরকারের অংশীজনেরা
সরকারের তাঁবেদারে পরিণত হয়। এমনটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সংবিধানের চতুর্থ ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছদের ৫৯ (১) ধারায় বলা
আছে, ‘আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর
প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে’। অর্থাৎ
সংবিধানে মূলত স্থানীয় শাসনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ কোনো নির্ধারিত
স্থানে স্থানীয় সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত
থাকবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের অভিযোগ শুনতে হচ্ছে, প্রকৃতার্থে
দেশে এখন স্থানীয় শাসন নেই। কারণ স্থানীয় সরকার শাসনব্যবস্থায় দায়িত্বশীল কেউই
স্থানীয়ভাবে কোনো তহবিল সংগ্রহ করেন না। তারা সরকারের দেওয়া বরাদ্দের ওপর
নির্ভরশীল। সরকার স্থানীয় সরকারের জন্য যে বরাদ্দ দেয় তা মূলত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএনডিপি,
জাইকা
কিংবা অন্যান্য দাতা সংস্থা থেকে সংগ্রহ করে। স্থানীয় শাসন
পরিচালনার পদ্ধতিগুলো তারা অনুসরণ করে না। বরাদ্দ সংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশ
অনুসারে কাজ করাকে স্থানীয় শাসন বলা চলে না।
২০০৭-০৮ সালে অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় স্থানীয় সরকার কাঠামোর রূপান্তরের
জন্য বেশ কয়েকটি কমিশন গড়ে তোলা হয়। বিটিআরসি থেকে শুরু করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কমিশন
গড়ে তোলা হয় তখন। এসব কমিশন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ছিল দেশের মানুষকে সম্পৃক্ত করা। সাধারণ
মানুষ যেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে তা নিশ্চিত করা। টেলিফোন, বিদ্যুৎ
বা অন্য কোনো বিষয়ে যেন প্রশাসন প্রভাব খাটাতে না পারে সেজন্যই এসব কমিশন গড়ে তোলা
হয়। ওই সময়ে স্থানীয় সরকার কমিশনও গড়ে তোলা হয়। কমিশনে একজন চেয়ারম্যান থাকবেন এবং
দুজন সদস্য থাকবেন। এ কমিশনে চেয়ারম্যান হিসেবে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ
কোনো ব্যক্তিই থাকবেন। তত্ত্ববধায়ক সরকারের সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে সংসদে পাস হতে হয়।
২০০৭-০৮ সালের পর অধিকাংশ সিদ্ধান্ত পাস হলেও স্থানীয় সরকার কমিশন গড়ার আইন পাস হয়নি।
ওই সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অনেক শক্তিশালী ছিল। তাদের মনে হয়েছিল, এ আইন পাস
হলে মন্ত্রণালয়ের প্রভাব থাকে না। এ কমিশন গড়ে তোলা গেলে আখেরে সুবিধাভোগী হতাম আমরাই।
স্থানীয় সরকার কাঠামোর নিজস্ব শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এ ধরনের কমিশন গড়ে তোলা
জরুরি। বিশেষত বিদ্যমান আইনের সংস্কারও প্রয়োজন।
সরকার যেকোনো কারণ দেখিয়ে যেকোনো সময় স্থানীয় সরকার
প্রতিনিধির পদ বাতিল ঘোষণা করতে পারে, এমনটি স্থানীয় সরকার আইনেই
স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ফলে আমরা বলছি স্থানীয় সরকার কাঠামোর কথা কিন্তু কার্যত রয়ে
গেছে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো তার নিজ নিজ অবস্থানে কাজ করছে।
সেজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে
হচ্ছে। কার্যত স্থানীয় সরকারের যে দর্শন তা পুরোপুরি উপেক্ষিত। একসময় কাঠামো
কিছুটা হলেও ছিল কিন্তু এখন তা-ও নেইÑএমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার
অবকাশও ক্ষীণ। কখনও কখনও মনে হয় স্থানীয় সরকার যেন অনেকাংশেই প্রশাসনের বর্ধিত
কোনো স্তর। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার নিয়ন্ত্রিত-নির্দেশিত প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত
নয়। কারণ তাদের নিজেদের শক্তি খুব কম, বিশেষভাবে অর্থনৈতিক শক্তি।
স্বশাসনের এ দর্শন ভুলে যাওয়ার ফল ভালো হয়নি। আমরা দেখছি, স্থানীয় সরকার কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর উপজেলা নির্বাচনে ভোটারের খরা এবং বেশ কিছু বিষয় অনুপস্থিতির ফলে
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি উপেক্ষা বাড়ছে; যা আমাদের জন্য শুভ কিছু নয়।
অতীতে আমরা দেখেছি স্থানীয় সরকার নির্বাচন উৎসবমুখর
পরিবেশেই সম্পন্ন হতো। কিন্তু বিগত কয়েকটি নির্বাচনে আমরা দেখেছি, এ
ধরনের নির্বাচনেও প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেছে। দেশের
মানুষ নির্বাচন আয়োজনকে উৎসব হিসেবেই ভাবে। উৎসবমুখর পরিবেশে স্থানীয় সরকার
পর্যায়ে নির্বাচনের নজির আমাদের সামনে রয়েছে। কিন্তু এ ধারণায় পরিবর্তন এসেছে।
১০ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়
রেমালের কারণে স্থগিত হওয়া বাগেরহাটের তিন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ৯ জুন অনুষ্ঠিত
হয়েছে। এতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা
ও মোংলা উপজেলায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মী-সমর্থক আহত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মোরেলগঞ্জে
আহত নেতাকর্মীর সংখ্যা শতাধিক। হামলার ভয়ে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে
আশ্রয় নিয়েছে। নেতাকর্মীদের ওপরে হামলা ও নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়
জনপ্রতিনিধি ও পরাজিত প্রার্থী। সহিংসতার বিষয়টি পুলিশ স্বীকার করে জানায়, দোষীদের
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আমরা দেখছি, বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে সংঘাত-সহিংসতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার অভাব থাকায় এমনটি হয়েছে বলে দাবি অনেকের। প্রধান নির্বাচন
কমিশনার হাবিবুল আউয়াল সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, এবারের উপজেলা নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের
অংশগ্রহণ কম থাকায় তাদের সমর্থকরা ভোট দিতে আসেনি। ফলে ভোটার উপস্থিতি কম হয়েছে। অন্যদিকে
তিনি বলছেন, নির্বাচনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটেছে। দুটো কথাই পরস্পরবিরোধী ও সাংঘর্ষিক।
এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ। ফলে সব প্রার্থীর জন্য
ছিল অবারিত সুযোগ। কিন্তু এভাবে রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে না। ভোটার
খরার বিষয়ে নির্বাচন কমিশন একাধিক অজুহাত দাঁড় করিয়েছে। কোনোটিই মেনে নেওয়ার মতো নয়।
স্থানীয় সরকার কাঠামোর জন্য উপজেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখানে জেলা পরিষদ অপ্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হলেও মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত
সরকার কাঠামো ব্যবস্থা। উপজেলা পরিষদে কার্যক্রম পরিচালনা অধিক সহজ। যেকোনো
প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে উপজেলায় বেশি সুযোগসুবিধা পাওয়া যায়। ফলে
উপজেলা পরিষদে যদি বেশিসংখ্যক ভোটার উপস্থিত করা যায় তাহলে লাভবান হবে স্থানীয়
সরকার কাঠামো। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি তার দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে
সচেতন থাকবেন। আর এ সচেতনতার অবস্থান থেকেই প্রতিনিধিরা উপজেলার উন্নয়নকল্পে কাজ
করবেন। স্থানীয় সরকার কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণের কথাও অতীতে কয়েকবার হয়েছে। তবে
স্থানীয় সরকার কাঠামোর প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার কারণটি বোঝা জরুরি। আমরা
দেখছি, জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে উৎসবে ভাটা পড়েছে।
মানুষের মনে এমন একটি ধারণা জন্ম নিয়েছে, জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনেই যদি এত সংকট জিইয়ে থাকে তাহলে স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনেও সুষ্ঠু-অবাধ ও আনন্দমুখর পরিবেশ প্রত্যাশিত হতে পারে না। ভোটদানের বিষয়ে মানুষের মধ্যে আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ততা ও আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দলের মধ্যকার আস্থার সংকট নানাভাবে ভোটারদেরও প্রভাবিত করছে। মূলত স্থানীয় পর্যায়ের সরকার কাঠামো সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণ করার মতো শক্তিশালী নয় বিধায়ও অনেকে এ ধরনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখায় না। স্থানীয় সরকারের সুসংহত কাঠামো আমরা এত দিনেও গড়তে পারিনি। উপজেলা পরিষদ স্থানীয় মানুষের কল্যাণকামী প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা গেলে জনকল্যাণের পথ সুগম হবে। সর্বাগ্রে জরুরি হলো স্থানীয় সরকারের দর্শন ফিরিয়ে আনা। শুধু কাঠামো জিইয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলবে না। স্বশাসনের দর্শন ফেরাতে হবে বৃহৎ স্বার্থ ও প্রয়োজনেই।