× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাসেলস ভাইপার

ঠেকাতে হবে বংশ বিস্তার

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৪ ১৫:০৬ পিএম

ঠেকাতে হবে বংশ বিস্তার

ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বিষধর সাপের একটি চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার। বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে এর বিস্তৃতি নজরে পড়ছে। এটি ক্রমেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এর কামড়ে মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। এর কামড়ে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশের ১৭ জেলায় ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। চন্দ্রবোড়ার মাথা চ্যাপ্টা, ত্রিভুজাকার। নাকের ছিদ্র ও চোখ বড়। দেহ মোটাসোটা। পিঠের গায়ের রঙ হলুদ, গাঢ় বাদামি ও কালো বলয়যুক্ত বা অর্ধচন্দ্রের মতো, তিন সারিতে বিভক্ত। পেটের দিকটা সাদা, হলুদ, গোলাপি রঙের। দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১.২৪ মিমি। এরা সাধারণত ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করে। বেশিরভাগ সময় খোলা এলাকা, ঝোপঝাড়, বাগান বা কৃষিজমিতে পাওয়া যায়। বাসাবাড়িতে না গেলেও ইঁদুরের সন্ধানে যেতে পারে। কচুরিপানার ওপর শুয়ে রোদ পোহায় বলে ভেসে সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যেতে পারে। চন্দ্রবোড়া নিশাচর হলেও ঠান্ডা আবহাওয়ায় দিনের বেলায়ও সক্রিয় থাকে। এটি সেকেন্ডের ১৬ ভাগের এক ভাগ সময়ে কামড় দিতে পারে। এরা সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে। জুন-জুলাইয়ে ২০ থেকে ৪০টি বাচ্চা প্রসব করে।

চন্দ্রবোড়ার প্রধান খাবার ইঁদুর হলেও ছোট ছোট পাখি, টিকটিকি, ছোট ছোট সরীসৃপ খেয়ে থাকে। এরা শিকার করতে অভিনব কৌশল ব্যবহার করে। এরা ইঁদুরকে কামড় দিয়ে খেয়ে ফেলে না। ছেড়ে দেয়। ইঁদুরটি যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে গর্তে যায়। পরে সাপটি সেই গর্তে থাকা বাকি ইঁদুরদেরও খেয়ে ফেলে। ২০০৯ সালের আগে ১০০ বছরে চন্দ্রবোড়াকে বাংলাদেশে দেখা না যাওয়ায় বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে রাজশাহী অঞ্চলে এটি আবার দেখা যায়। এখন পদ্মা ও মেঘনার তীরবর্তী বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, মুন্সীগঞ্জ, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুর, রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ মোট ১৭ জেলায় দেখা যাচ্ছে। আবার একটি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে রাজশাহীতে, ২০১০ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জে, ২০১২ সালে নাটোরে, ২০১৩ সালে পাবনায় এবং ২০১৫ সালে চাঁদপুরে চন্দ্রবোড়া দেখা যায়। এ সাপ মূলত নদীর ধার ও চরাঞ্চলে বেশি থাকে। চন্দ্রবোড়া ৪৫-৬০ মিলিগ্রাম বিষ প্রয়োগ করতে পারে। একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য ৪২ মিলিগ্রাম বিষই যথেষ্ট। এটি কামড় দিলে বেশ কিছু লক্ষণ দেখা যায়। যেমন কামড়ের স্থানে ব্যথা করবে, ফুলে যাবে। দাঁতের মাড়ি ও প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে রক্ত বেরোবে। কামড়ের স্থানে ফোসকা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন কমে যাবে।

একটি তথ্যমতে, বাংলাদেশে ১০০ প্রজাতির মতো সাপ রয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ প্রজাতির সাপ বিষাক্ত। এসবের মধ্যে ১৬ প্রজাতির সাপ সমুদ্রে বাস করে, তিন প্রজাতির কোবরা, ৫ প্রজাতির কেউটে, ২ প্রজাতির কোরাল, ৬ প্রজাতির সবুজবোড়া, এক প্রজাতির চন্দ্রবোড়া। চন্দ্রবোড়া মূলত এশিয়া অঞ্চলের সাপ। এটি ভারতীয় অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ এলাকা, দক্ষিণ চীন ও তাইওয়ানেও দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয়। এর মধ্যে ১ লাখ মানুষ মারা যায়। প্রায় ৪ লাখ মানুষ এর কামড়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে। সংস্থাটির মতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হয় এবং প্রায় ৬ হাজার মানুষ মারা যায়। ভারতে ৩০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে; যার মধ্যে ৬০ প্রজাতির সাপ বিষাক্ত। সেখানে প্রতি বছর ৬৪ হাজার মারা যায় সাপের কামড়ে। এ সংখ্যা বিশ্বে সাপের কামড়ে মৃত্যুর ৮০ ভাগের বেশি। তবে অনেক দেশে বিষধর সাপ থাকলেও মৃত্যহার খুবই কম। যেমন অস্ট্রেলিয়ায় ১৭২ প্রজাতির সাপ রয়েছে; তার মধ্যে ১০০ প্রজাতি বিষাক্ত। এ সত্ত্বেও প্রতি বছর এখানে মাত্র ৩ হাজার সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে। এখানে বছরে সাপের কামড়ে মৃত্যুহার মাত্র ২%।

সাপের কামড় বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ নগরায়ণ হতে পারে। নগরায়ণের কারণে কৃষিভূমি কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে পুকুর ও জলাশয়। সাপ প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। মানুষের ঘরবাড়িতে প্রবেশ করছে। আরও একটি কারণ হলো, এক ফসলের জায়গায় তিন ফসলের চাষ। এ ঘটনাটি বরেন্দ্র অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে। সেখানে আগে বছরে একটি ফসল করা হতো। কিন্তু এখন বছরে তিন ফসল করা হয়। তিনটি ফসল চাষ করলে জমিতে সব সময় পানি থাকে এবং ইঁদুরের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ইঁদুর বাড়ার কারণে চন্দ্রবোড়াও বাড়তে থাকে। আগে এক ফসল থাকার সময় বাকি সময় ফসলি জমি পতিত পড়ে থাকত বিধায় বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ পেত না। গবেষকদের মতে, এটি ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বাংলাদেশ কৃষিভূমি অনেক। এসব কৃষিভূমিতে ইঁদুর বেশি থাকে। চন্দ্রবোড়ার প্রিয় শিকার ইঁদুর। এটি সারা বছরই কৃষকের ফসলি ক্ষেতে থাকে। ইঁদুরের সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রবোড়াও কৃষিজমিতে থেকে খাবার শিকার করে এবং বসবাস শুরু। এখানেই সে বংশ বৃদ্ধি করে। এর ফলে এর সংখ্যা বাড়ছে ক্রমেই।

বাংলাদেশে চন্দ্রবোড়ার কামড়ের হার তেমন একটা বেশি এখনও বাড়েনি। ভারতে মোট সাপের কামড়ের ৪৩% চন্দ্রবোড়ার কারণে ঘটে। প্রতি বছর শ্রীলঙ্কায় ৩০-৪০ ভাগ সাপের কামড় ঘটে চন্দ্রবোড়ার কারণে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে মানুষ না জেনে এর গায়ের ওপর পা দেওয়ায় বা বিরক্ত করায় এটি কামড় দিয়েছে। আমাদের দেশে সাপের কামড়ে মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ এখনও ওঝার কাছে যাওয়া। ততক্ষণে রোগী মারা যায়। গোখরো সাপে কামড়ালে ৮ ঘণ্টা পর মানুষ মারা যায়। কেউটে সাপ কামড়ালে ১৮ ঘণ্টা পর মারা যায়। চন্দ্রবোড়া কামড়ালে ৭২ ঘণ্টা পর রোগীর মৃত্যু ঘটে। অথচ হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করলেই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তবে চন্দ্রবোড়ার সঠিক অ্যান্টিভেনম বাংলাদেশে পাওয়া যায় না। এখানে চন্দ্রবোড়া কামড়ালে যে ভারতীয় অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করা হয়, তা ঠিকভাবে কাজ করে না। এতে রোগীকে বাঁচানো কষ্টকর হয়ে ওঠে। চন্দ্রবোড়ার কামড়ে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ এর চিকিৎসায় যে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয় তা ঠিকভাবে কাজ করে না। এখানকার অন্য বিষধর সাপগুলো সাধারণত আমাদের শরীরে এক বা দুই ধরনের বিষ ঢুকিয়ে দেয়। কিন্তু চন্দ্রবোড়া সাপের বিষে দুইয়ের অধিক ধরনের বিষ রয়েছে যা রক্ত, বৃক্ক, কলা ও স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতি করা শুরু করে। ফলে চিকিৎসকরা এর চিকিৎসা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। সাধারণত অন্যান্য বিষধর সাপ কামড়ালে চিকিৎসার পরও ১০ থেকে ১৫ ভাগের মৃত্যুর শঙ্কা থেকে যায়। কিন্তু চন্দ্রবোড়ার কামড়ে চিকিৎসার পরও মৃত্যুর শঙ্কা থাকে ৩০ ভাগ।

আমাদের দেশে সাপের কামড়ের প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েও অনেকে অবগত নই। বর্ষাকালে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। সাপের কামড়ের প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সবারই একটি ধারণা থাকা দরকার। সাপ কামড়ালে আমাদের আতঙ্কিত হওয়া চলবে না। শান্ত থাকতে হবে। শরীরের যে স্থানে সাপ কামড়িয়েছে সেটা নড়াচড়া করা যাবে না। আক্রান্ত স্থানে কাপড় বেঁধে দিতে হবে। তবে শক্ত করে বাধা যাবে না। এ ছাড়া সাপ কামড়ালে আক্রান্ত স্থান থেকে রক্ত চুষে বের করা যাবে না। ওই স্থান কেটে রক্তক্ষরণ করা যাবে না। বরফ, তাপ বা রাসায়নিক দ্রব্য ওই স্থানে প্রয়োগ করা যাবে না। বাংলাদেশে প্রতি বছর সাপের কামড়ে মারা যায় ৬ হাজার ৪১ জন। তার পরও বাংলাদেশের অ্যান্টিভেনমের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে বাংলাদেশে ভেনম রিসার্চ সেন্টার হয়েছে। এখন এ দেশে বিষধর সাপের বিষ ও বিষক্ষয় নিয়ে গবেষণা চলছে। বাংলাদেশে বিষের তীব্রতার দিক থেকে চন্দ্রবোড়া সবচেয়ে বিষাক্ত। এখানে আমরা যে অ্যান্টিভেনম ব্যবহার করি তা ভারত থেকে আমদানিকৃত। কিন্তু ভারতের থেকে এখানকার সাপের বিষাক্ততার ধরন আলাদা হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা কাজ করে না। তবে বাংলাদেশেও এখন অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এটি করছে ভেনম রিসার্চ সেন্টার ও অ্যানিমেল ইমিউনাইজেশন ল্যাব। এদের সৃষ্ট অ্যান্টিভেনম মৃত্যুহার অনেকটাই কমিয়ে আনবে আশা করি।


  • লেখক, শিক্ষক ও গবেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা