অর্থনীতি
আনু মুহাম্মদ
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ১৪:৪৪ পিএম
অলঙ্করণ প্রবা
বাংলাদেশে দশকজুড়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ঘনীভূত হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকট। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও সংকটের পাশাপাশি যাত্রায় বাংলাদেশ এক ধরনের মডেলে পরিণত হয়েছে। আমরা দেখছি, একদিকে সরকারি হিসাবে মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি অথচ অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আর্থিক কষ্ট, বেকারত্ব, ক্ষুধা, অপুষ্টি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা বেড়েই যাচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকের অভূতপূর্ব সম্প্রসারণ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঋণখেলাপি, বড় ধরনের প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে লুণ্ঠনে ব্যাংকিং খাতের সংকট বাড়ছে। গত এক দশকে একদিকে দেখা গেছে নির্মাণ খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ, অন্যদিকে এর কারণেই দেখেছি বন উজাড়, বায়ু ও জলদূষণ, ভূমি ও নদী দখলের সর্বোচ্চ হার।
সরকারের সুপার অ্যাকটিভ প্রোপাগান্ডা মেশিনের পাশাপাশি তাদের দেশি-বিদেশি অংশীদাররা ক্রমাগত এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে যে, দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে। এটা বলতে গিয়ে তারা প্রধানত বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের কথা বলে থাকে। বলা বাহুল্য, এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এত উচ্চ ব্যয়বহুল হওয়ার কারণ সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্পে বড় কমিশন, দুর্নীতি ও অদক্ষতা। এটা ঠিক যে, গত দেড় দশকে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই মেগা প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য একদিকে বিপজ্জনক অন্যদিকে অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে উঠবে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের এনটিপিসির সঙ্গে অংশীদারত্বে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র আমাদের জন্য অমূল্য সুন্দরবনের মারাত্মক ক্ষতি করবে। এই প্রকল্পের পিছে পিছে এই এলাকায় শতাধিক বিপজ্জনক প্রকল্প বসেছে, যেগুলো পুরো অঞ্চলে ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হবে। চীন ও জাপানের ঋণে ও কর্তৃত্বে উপকূলীয় এলাকায় আরও কয়েকটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। এসব প্রকল্প জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের যে ঝুঁকি তা আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি করবে। একই সঙ্গে ভয়াবহ ঝুঁকি আর বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে এলএনজি আমদানির বড় প্রকল্পও রয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর কারণে বিশাল বৈদেশিক ঋণ জমছে; যা পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক ভালো বিকল্প থাকা সত্ত্বেও এই প্রকল্পগুলো কেন গ্রহণ করা হলো, এগুলোকে কোনোভাবেই যৌক্তিক করা সম্ভব নয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ খাতের জন্য সুলভ ও পরিবেশবান্ধব অনেক ভালো পথ ছিল, সেদিকে না গিয়ে কয়লা ও পারমাণবিকের বিপজ্জনক পথে দেশকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
উন্নয়নের এ ধরনের কারণে বাংলাদেশ দ্রুতবর্ধনশীল অতিধনী অলিগার্কির দেশে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যেরও। সরকারি দলিল (গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় সমীক্ষা, এইচইআইএস; ২০১০, ২০১৬ এবং ২০২২) থেকেই দেখা যাচ্ছে, অল্প কয়েকটি গোষ্ঠীর দ্রুত সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশে বৈষম্যও আরও বেশি গভীরতর হয়েছে। ২০১০ সালে আয়গোষ্ঠীর শীর্ষ ৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৫ শতাংশের মধ্যে আয়ের অনুপাত ছিল প্রায় ৩০:১। ২০১৬ সালে এই অনুপাত হয়েছে ৬০ গুণ। ২০২২ সালে তা ৮০ গুণে পৌঁছেছে। কিন্তু এটাও প্রকৃত চিত্র নয়। কারণ আমরা জানি, এই ক্ষুদ্র ধনিকগোষ্ঠীর ঘোষিত আয় তাদের দেশে ও বিদেশে জমা হওয়া প্রকৃত সম্পদের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।
অন্যদিকে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। যেমন সরকার দেশের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৩ লাখ টাকার বেশি দেখায়। এই পরিসংখ্যানটি শিশু, বেকার, অনানুষ্ঠানিক কর্মী, অবসরপ্রাপ্ত, ভিক্ষুক ও ধনীসহ সমগ্র জনসংখ্যার আয়ের একটি গড়। এই হিসাবে জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকার বেশি মাসিক আয় হওয়ার কথা, মানে চারজনের একটি পরিবারে মাসে এক লাখ টাকা। অথচ বাস্তবে অনেক পরিবার বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। তাদের কাছে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম খাবার এবং আশ্রয়ের জন্য লড়াই-ই প্রধান। নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর পারিবারিক আয় প্রতি মাসে ১ লাখের বদলে ৩০ হাজার টাকারও নিচে। বাকি ৭০ হাজার কোথায়?
গত এক দশকে বাংলাদেশের জিডিপিতে শীর্ষ আয়ের পাঁচ শতাংশ মানুষের অনুপাত তাই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে নিচের অর্ধেকেরও বেশিসংখ্যক মানুষের অনুপাত সংকুচিত হয়েছে। জনসংখ্যার ক্ষুদ্র অংশ দুর্নীতিবাজ নীতিনির্ধারক-কর্মকর্তা, ব্যাংকঋণ খেলাপি, চাঁদাবাজ, ভূমি-নদী দখলকারীরা বর্তমান অর্থনৈতিক মডেলের উল্লেখযোগ্য সুবিধাভোগী। প্রকল্প ও চুক্তি থেকে কমিশন, দুর্নীতি ও উচ্চ ব্যয়সহ অবকাঠামো নির্মাণ এবং বহু রকম অবৈধ কার্যকলাপের কারণে তাদের আয় আকাশচুম্বী হয়েছে। জিডিপির ঊর্ধ্বগতিকালে প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষই আয় ও জীবনযাত্রার মানের প্রকৃত বৃদ্ধি দেখেনি। তারা দেখছেন দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আরও ব্যয়বহুল হচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার সুযোগ পাওয়া আরও কঠিন হয়েছে, বারবার প্রয়োজনীয় পরিষেবার বিল বেড়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পরিস্থিতি দেখলে এই প্রশ্নটাই প্রধান হয়ে উঠে যে, একটি দেশের সত্যিকারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মানে কী? কাদের সমৃদ্ধি, কাদের বিপদ?
তাই যখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা আসে, তখন অবশ্যই সেই সঙ্গে জনগণ ও দেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। নতুবা এটি হবে একতরফা প্রতারণামূলক গল্প। জিডিপি যেভাবে গণনা করা হয়, তাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা হয় না; যা একটি দেশের উন্নয়ন তৎপরতার অংশ। রাস্তা ও সেতু, কয়লা প্ল্যান্ট, উঁচু ভবনের মতো বৃহৎ আকারের অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে অতিরিক্ত ব্যয় জিডিপিকে স্ফীত করতে পারে ঠিকই কিন্তু যদি এসব প্রকল্প দুর্নীতি ও অপচয়মুখী হয়, যদি পরিবেশ ধ্বংসের কারণ হয়, তাহলে এটি জনগণের জীবনযাত্রাকে উল্টো সংকটগ্রস্ত করে। জিডিপির পরিমাপগত সমস্যা হলো তা অর্থনীতির লেনদেনই বিবেচনায় নেয়, কিন্তু কোনো প্রকল্পের সামাজিক এবং পরিবেশগত ক্ষতি জিডিপি গণনায় বিবেচনা করা হয় না। তার ফলে জিডিপি সাধারণত একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের পূর্ণ চিত্র দেয় না, দেয় একটি ভুল এবং আংশিক ছবি। যা দেখতে ভালো কিন্তু আড়াল করে অনেক প্রকৃত ছবি।
সেজন্য আর্থিক প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তৈরি করতে পারছে না, বরং তা আরও গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের পথ তৈরি করছে। মেগা প্রকল্প, মানি লন্ডারিং এবং চাঁদাবাজি থেকে মুনাফা অর্জনকারী গোষ্ঠী যারা একই সঙ্গে জমি ও নদীসহ দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে তাদের কারণেই দেশে একটি সুদূরপ্রসারী আর্থিক সংকট তৈরি হচ্ছে। এদের জন্যই রপ্তানি বৃদ্ধি এবং রপ্তানিকারকদের জন্য সরকারি ভর্তুকি সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার দেশের প্রভাবশালী ধনী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এখন একটি প্রধান প্রবণতা এবং তা প্রতিরোধে সরকারের দিক থেকে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব খুবই স্পষ্ট। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত গোষ্ঠীগুলোর জবাবদিহি থেকে রক্ষা করার জন্য খুবই সুবিধাজনক। প্রবৃদ্ধির সরকারি হিসাব তাই আসন্ন আর্থিক সংকটকে আড়াল করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একপেশে চিত্র তাই চোরাবালির মতো। যেখানে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকরা ক্রমবর্ধমান খাদ্যমূল্য, বাড়িভাড়া, ইউটিলিটি এবং অনিশ্চয়তার নিচে ক্রমশ আটকা পড়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারক এবং অন্যান্য যারা বর্তমান পরিস্থিতির সুবিধাভোগী তারা সম্ভাব্য ভয়াবহ সংকট সম্পর্কে উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে না। কারণ তাদের জীবন ও সম্পদ বিদেশে সুরক্ষিত। এটি অনেকাংশে ঔপনিবেশিক শাসকদের অনুরূপ, যারা উপনিবেশের মানুষদের ভবিষ্যৎ থেকে বিচ্ছিন্ন। তাদের লক্ষ্য অন্য কোথাও নিজেদের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য এই দেশ এবং জনগণ থেকে শুষে নেওয়া। সুবিধাভোগী এসব ব্যক্তি/গোষ্ঠী তাই বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় খুবই খুশি, যা তাদের স্বার্থ রক্ষা করছে।
প্রকৃত চিত্র মানুষের সামনে উপস্থিত করতে অর্থনীতিবিদদের বিদ্যমান ঘোর থেকে বের হওয়া দরকার। প্রশ্ন তোলা দরকার যে- কার প্রবৃদ্ধি, কার সংকট? এই প্রবৃদ্ধি থেকে কে সত্যিকার অর্থে উপকৃত হয় এবং এটি কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যাকে প্রভাবিত করছে? এই বৃদ্ধির সামাজিক পরিবেশগত ক্ষতি কী, এর চেয়ে ভালো বিকল্প কী হতে পারে? দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য, সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তৃত বোঝার জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সন্ধান ও তার সমাধান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়