× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট

আম গেলেও ছালা থাকবে কি?

ড. মইনুল হাসান

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৪ ১৩:৩২ পিএম

অলঙ্করণ প্রবা

অলঙ্করণ প্রবা

গত ৬ থেকে ৯ জুন, পৃথিবীর একমাত্র মহাদেশীয় সংসদ, ইউরোপীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ফ্রান্সে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় রবিবার, ৯ জুন। সে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট মাখোঁর দল ১৫ শতাংশের কম ভোটে উগ্র ডানপন্থিদের কাছে হেরে যায়। ফ্রান্সের উগ্র ডানপন্থি ন্যাশনাল র‍্যালি দল মারিন ল্যু পেনের নেতৃত্বে ৩১ দশমিক ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলতে সক্ষম হয়। এ দলটি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ৩০টি আসন নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে। সেখানে মাখোঁর দল থেকে পার্লামেন্টে মাত্র ১৩ জন সদস্য প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবেন। বিপুল ভোটের ব্যবধানে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের এমন বিজয় ফ্রান্সের ইতিহাসে প্রথম। এ বছর ইইউ নির্বাচনে ফ্রান্সের ৫১ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। নির্বাচনে জনগণের বড় একটি অংশ মাখোঁর প্রতি তাদের অনাস্থা প্রকাশ করেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের প্রধান এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইমানুয়েল মাখোঁর জন্য এমন শোচনীয় পরাজয় চরম অস্বস্তিকর।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই উগ্র ডানপন্থি নেতা ২৮ বছর বয়সের জর্ডান বারডেলা কট্টর উচ্চারণে মাখোঁকে ফরাসি জাতীয় পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। বারডেলার এমন বক্তব্যের মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ইমানুয়েল মাখোঁ নিজ দেশের পার্লামেন্ট বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং আগাম নির্বাচনের তারিখ সবাইকে জানিয়ে দেন। প্রথম দফায় ৩০ জুন এবং দ্বিতীয় দফায় ৭ জুলাই নির্বাচন হবে। অথচ বর্তমান জাতীয় সংসদ এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাখোঁর মেয়াদ আরও তিন বছর বাকি। পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালে।

ইউরোপের ২৭ সদস্যরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪৫ কোটি এবং ৭২০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে ভোটার ৩৬ কোটি। ইউরোপীয় সংসদ নির্বাচনে বিশেষত্ব হলো, এ নির্বাচনে কোনো দল থেকে ব্যক্তিবিশেষ সরাসরি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। শুধু দলভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দল ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য তালিকা তৈরি করে। যেকোনো দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদ লাভ করে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সংসদ সদস্য কোটা নির্ধারিত হয় দেশটির লোকসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী। সে হিসেবে সাড়ে ৮ কোটি মানুষের দেশ জার্মানির লোকসংখ্যার অনুপাতে সর্বোচ্চ আসনসংখ্যা ৯৬। জনসংখ্যার ভিত্তিতে জার্মানির পরই ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ফ্রান্সের জনসংখ্যা প্রায় ৭ কোটি। ফ্রান্সের হয়ে ইইউতে প্রতিনিধিত্ব করবেন ৮১ জন। ইতালির জন্য বরাদ্দ আসন ৭৬। মালটা, লুক্সেমবার্গ, সাইপ্রাসÑইউরোপের ক্ষুদ্র জনসংখ্যার এ তিনটি দেশ থেকে ছয়জন করে সংসদ সদস্য থাকছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে সংসদ সদস্যদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে প্রধানত সাত গ্ৰুপে ভাগ করা হয়। সুবিশাল এবং দৃষ্টিনন্দন পার্লামেন্ট ভবনটি জার্মান সীমান্তের অদূরে ফ্রান্সের স্ত্রাসবুর শহরে অবস্থিত। শান্তি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার অনুপ্রেরণায় মহাদেশীয় সংসদের প্রথম ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল আজ থেকে ৪৫ বছর আগে, ১৯৭৯ সালে। সে সময় ইইউর সদস্যরাষ্ট্র ছিল ৯টি এবং পার্লামেন্ট ছিল ৪১০ আসন বিশিষ্ট। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। পাঁচ বছর আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালে।

পাঁচ বছর আগের পৃথিবী এবং আজকের পৃথিবীর মধ্যে অনেক পার্থক্য। তখনও মহামারি কোভিড-১৯-এর বীভৎস চেহারা মানুষ দেখেনি। রাশিয়া সে সময়ে ইউরোপের দোরগোড়ায় ইউক্রেনের টুঁটি চেপে ধরেনি। জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে ইসরায়েলকে গাজায় ‘গণহত্যা’র অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়নি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের স্নায়বিক বিরোধ তখনও অতটা তুঙ্গে ওঠেনি। আজ পৃথিবী একটি রাসায়নিক, জৈব অস্ত্রসহ পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকিতে ধুঁকছে। সমগ্র বিশ্ব একটি অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আজকের পৃথিবীর সঙ্গে পাঁচ বছর আগের পৃথিবী মেলানো যায় না।

ঠিক এমন দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হলো ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। এ নির্বাচনে গণতন্ত্রের সূতিকাগার ইউরোপের দেশে দেশে চরমপন্থিদের উত্থান ঘটছে। মধ্যপন্থি, উদারপন্থি ও সমাজতন্ত্রীরা অধিকাংশ আসনে এগিয়ে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। পাল্লা দিয়ে ইউরোপের জনগণ কট্টরপন্থিদের পাল্লা ভারী করেছে। মাখোঁর মতো জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের জন্যও এ নির্বাচন দুঃসংবাদ হয়ে এসেছে। জার্মানিতে ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে এযাবৎকালের ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে ফলের মুখোমুখি। বিপরীতে দেশটির রক্ষণশীল ও গোঁড়া ডানপন্থি রাজনৈতিক দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি ভালো করেছে। অস্ট্রিয়ায় অতি ডানপন্থি ফ্রিডম পার্টি প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল পিপলস পার্টি ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রোর দলের ভরাডুবি হলে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

রাজনীতি-বিশ্লেষকরা মনে করেন, জার্মানি, ইতালি, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস অর্থাৎ ইইউভুক্ত প্রধান দেশগুলোয় কট্টর জাতীয়তাবাদীদের উত্থান এ মহাদেশের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ঐক্যের অন্তরায় হবে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামষ্টিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত নীতিমালায় প্রভাব পড়বে। সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শিল্প প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের দূরত্ব বাড়বে। রাজনীতিতে আবেগ, খামখেয়ালি বা অহেতুক উচ্ছ্বাসের কোনো স্থান নেই। প্রথম মেয়াদের পাঁচ বছর এবং দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছর পার করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ সাত বছর ধরে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নির্বাহীর পদে আসীন আছেন। সে হিসেবে তিনি একজন ঝানু রাজনীতিবিদ। তিনি যে অন্ধকারে ঢিল ছুড়েছেন, তা বলা যাবে না। ফ্রান্সের জাতীয় সংসদের আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে মাখোঁ উগ্র ডানপন্থিদের ক্ষমতায় আসীন হওয়ার সাধ বিস্বাদে পরিণত করার কৌশল নিয়েছেন। রাজনীতির রীতিনীতি নিয়ে যারা ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তারা মনে করেন মাখোঁ তার নিজের জনপ্রিয়তা তলানিতে পৌঁছানোর আগেই শেষরক্ষার উপায় হিসেবে জনগণের দ্বারস্থ হয়ে বেশ বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছেন। এখন আমজনতা যে প্রশ্নটির উত্তর জানার অপেক্ষা করছে তা জানা যাবে ৭ জুলাই, স্থানীয় সময় রাত ৮টায়। আর প্রশ্নটি হলোÑইমানুয়েল মাখোঁর ‘আম’ গেলেও ছালা থাকবে কি?

ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক ও গবেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা