বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৪ ০৯:১৫ এএম
ড. ফরিদুল আলম
বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অব্যাহত গতিতে
এগিয়ে চলছে। একসময় গঙ্গার পানি বণ্টন, তিন বিঘা করিডোর, সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান ইত্যাকার
বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অব্যাহত টানাপড়েন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। আজ এসব তিক্ত
অতীতকে পাশে ঠেলে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত
হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যে, ‘ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার
ও বিশ্বস্ত প্রতিবেশী।’ এই অংশীদারত্বের মূলে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি কাজ করছে তা হচ্ছে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং গত ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের
রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা। আর এর জেরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু অনুসৃত ‘সকলের সাথে
বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরীতা নয়’ উপজীব্যকে মুখ্য করে বর্তমান সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পরিচিত করেছেন বিশ্বময়। প্রতিবেশী দেশের সাথে সুসম্পর্ক
রক্ষার বাইরেও জাতীয় স্বার্থের আলোকে কীভাবে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শকেও আমাদের জাতীয়
উন্নয়নে কাজে লাগিয়ে কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন করা যায় এর দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

গত ২১-২২ জুন ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার শীর্ষ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয়
সফরকে একটি নিতান্ত দ্বিপাক্ষিক সফর বললে ভুল হবে। গুরুত্বের বিচারে এটি যেকোনো দেশের
জন্যই ঈর্ষণীয়। টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র ১১ দিনের
মাথায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ের শীর্ষ বৈঠকের জন্য বেছে
নেন বাংলাদেশকে। যখন কোনো নতুন সরকার গঠন হয়, তখন প্রতিবেশী দেশগুলোর একটা আকাঙ্ক্ষা
থাকে সেই সরকারের সাথে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করার। আর সরকারটি যদি হয় ভারতের মতো বিশ্বের
অন্যতম বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ, তাহলে সে প্রত্যাশা একটু বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। সেই দৃষ্টিকোণ
থেকে আমরা দেখলাম নরেন্দ্র মোদি সরকার বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের গভীরতার বার্তাই
যেন দিলেন। যেন তিনি নিজ থেকেই তার উপলব্ধিকে সকলের কাছে জানান দিতে চাইলেন যে, ভারতের
উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক চেতনাকে উজ্জ্বল করতে হলে এবং জাতীয় রাজনীতিতে তাকে আরও ভালো
করতে হলে সর্বাগ্রে বাংলাদেশের আস্থা জরুরি।
উল্লেখ্য, এ বছরের শুরুতে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে
দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে যাওয়া। এতদিন ধরে কূটনীতি বিশ্লেষকদের
আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল চীন নাকি ভারতÑকোথায় তার প্রথম সফরটি অনুষ্ঠিত হবে। ধারণা করা
যাচ্ছিল, ভারতের সরকার গঠনের পর কিছু আনুষ্ঠানিকতা গুছিয়ে উঠতে সময় লাগবে বিধায় চীনের
অনুরোধের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সেদেশ আগে সফর করবেন। সেদিক দিয়ে মোদির এই মেয়াদে
সরকার গঠনের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে
রাষ্ট্র পরিচালনায় দুই সরকারপ্রধানের মধ্যকার রসায়নটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। অর্থাৎ,
ভারতের কাছে বাংলাদেশ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশের কাছেও ভারতের গুরুত্ব এর চেয়ে
কোনো অংশে কম নয়। এই সফরের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর না হলেও
৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে এবং ৩টি স্মারক নবায়ন করা হয়েছে। এর বাইরে আমাদের
জন্য গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা চুক্তির বিষয়ে নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে এই মর্মে আস্থা পাওয়া
গেছে যে, এটির গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করছেন এবং খুব দ্রুতই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য
ভারত থেকে একটি কারিগরি দল বাংলাদেশ সফর করে প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে প্রতিবেদন জমা
দেবে। দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব
বিনয় কোয়াত্রা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে ওই বিশেষজ্ঞ দল গঠিত হয়েছে। তিস্তা
নিয়ে এ উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনারই
অংশ।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সফরটি ২১-২২ জুন এই দুদিনের
হলেও মূলত ২২ জুন তারিখে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার মধ্য দিয়ে সফরের সামগ্রিক দিকটি
উঠে আসে। এই সফরে দুই দেশের মধ্যকার কোনো স্পর্শকাতর বিষয় আলোচনায় না থাকায় কার্যত
দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণতা এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখাই ছিল
উভয় পক্ষের মূল উদ্দেশ্য। সফরের শেষদিন ২২ জুন হায়দরাবাদ হাউসে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বেশ
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হয়। তিস্তার পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা ছাড়াও ওই ঘোষণাগুলোর
মধ্যে রয়েছে ই-মেডিকেল ভিসার প্রবর্তন। বাংলাদেশ থেকে মানুষ যাতে সহজে চিকিৎসার প্রয়োজনে
ভারতে আসতে পারেন, সে জন্য দেশটি ই-মেডিকেল ভিসা চালু করবে। বাংলাদেশের রংপুরে ভারত
একটি নতুন সহকারী হাইকমিশনারের দপ্তরও খুলবে বলে জানিয়েছে। রাজশাহী ও কলকাতার মধ্যে
নতুন এক যাত্রীবাহী ট্রেন চালানো হবে। কলকাতা ও চট্টগ্রামের মধ্যে চালানো হবে নতুন
এক বাস পরিষেবা। গেদে-দর্শনা ও হলদিবাড়ী-চিলাহাটির দলগাঁও পর্যন্ত মালগাড়ি চালানো হবে।
ভারতের সহায়তায় সিরাজগঞ্জে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ডিপো তৈরি করা হবে। ভারতীয় গ্রিডের
সাহায্যে নেপাল থেকে বাংলাদেশের মধ্যে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি শুরু হবে। বাংলাদেশের
৩৫০ পুলিশ কর্মকর্তার জন্য প্রশিক্ষণশিবির এবং গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে
যৌথ কারিগরি কমিটি আলোচনা শুরু করবে। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে উপরোক্ত বিষয়গুলোও
নতুন চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারকের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হবে। আলোচনায় এসব গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়ের অবতারণা এবং এগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে
দুই দেশের মধ্যে ভিসামুক্ত চলাচলের বিষয়টিও সামনে চলে আসতে পারে।
এ লক্ষ্যে যে নতুন সমঝোতা স্মারকগুলো স্বাক্ষরিত হয়েছে এর মধ্য দিয়ে
বাংলাদেশের বহু প্রতীক্ষিত কিছু চাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে এবং এসবের ধারাবাহিকতায় আগামী
দিনে এই সম্পর্ক আরও উন্নততর পর্যায়ে উপনীত হতে পারে। নতুন সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে
রয়েছে ডিজিটাল অংশীদারত্ব এবং টেকসই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সবুজ অংশীদারত্ব। এ ছাড়া
রয়েছে সমুদ্র সহযোগিতার অন্তর্গত সুনীল অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’। ভারত মহাসাগরের
ওশানোগ্রাফির ওপর যৌথ গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে বাংলাদেশের বিওআরআই এবং ভারতের
সিএসআইআরের মধ্যে সমঝোতা স্মারক; বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগের ওপর সমঝোতা
স্মারক; যৌথ ছোট স্যাটেলাইট প্রকল্পে সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ
ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভারতের ন্যাশনাল স্পেস প্রমোশন অ্যান্ড অথরাইজেশন
সেন্টারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক এবং ডিফেন্স স্টাফ কলেজের মধ্যে একাডেমিক সহযোগিতা বিষয়ে
সমঝোতা স্মারক। দুই দেশের রেল সংযোগের জন্যও এক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। উল্লেখ্য,
ইতোমধ্যে ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় দেশই নিজ নিজ সমুদ্র অঞ্চলে নিরাপত্তা, সক্ষমতা এবং
সমুদ্র সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নবায়নকৃত তিন সমঝোতা স্মারক
হলোÑ মৎস্যসম্পদ সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক
এবং স্বাস্থ্য ও ওষুধ খাতে সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা বিশ্লেষণ করতে গেলে এই
সফরকে কাগজ-কলমের বাইরে বিচার করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যতটা আন্তরিক,
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিও এই সম্পর্ক নিয়ে এগুনোর ক্ষেত্রে গভীর আগ্রহ পোষণ করেছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়Ñ দুই দেশের সম্পর্ক যে কতটা গভীর
এর প্রমাণ হচ্ছে ২০১৯ সালের পর থেকে বিভিন্ন ফোরামে এই দুই শীর্ষ নেতার ১০ বার সাক্ষাৎ।
শেখ হাসিনা তার সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক সফরে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত গিয়েছিলেন। এর
পরের বছর ভারতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সরকারপ্রধান হিসেবে
শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ভারতের পক্ষ থেকে। এ সবকিছুই ভারতের কাছে শেখ হাসিনার
গুরুত্বকে তুলে ধরে। এর আগে এ মাসের ৯ তারিখে নরেন্দ্র মোদির শপথগ্রহণকে
কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার ভারত সফরে আমরা দেখেছি কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী তার দুই
সন্তান রাহুল এবং প্রিয়াংকা গান্ধীকে সাথে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার হোটেলে সাক্ষাৎ
করেন। সবকিছু মিলে কেবল নরেন্দ্র মোদির কাছেই নয়, ভারতের সকল রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেই
শেখ হাসিনার এক অন্যরকম গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি আজ সর্বজনবিদিত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ভারত সফরের মধ্য দিয়ে তিস্তা পানিবণ্টন
নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আগামী মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার
বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কোনো চুক্তিতে উপনীত
হওয়ার পূর্বেই এ বিষয়ে ভারত রাজনৈতিকভাবে কৃতিত্ব নিতে চাইবে। এতদিন ধরে বাংলাদেশ তিস্তার
পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিল,
চীনের তরফ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব এবং এর মাধ্যমে ভারতের সাথে কোনো
চুক্তি ব্যতিরেকেই তিস্তা ড্রেজিং এবং নদী শাসনের মতো ব্যাপক কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে
এর একটি স্থায়ী সমাধানের পথ যখন খুলতে বসেছে, এর মধ্য দিয়ে ভারতের জন্যও বাংলাদেশের
সাথে দ্রুত একটি চুক্তি সম্পাদনের তাগিদ অনুভূত হচ্ছে। তা ছাড়া সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে
যাওয়া লোকসভা নির্বাচনের উপলব্ধি থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই তিস্তা পানিবণ্টন
নিয়ে মোদি যে ফায়দা নিতে চেয়েছিলেন, প্রকারান্তরে এর ফলভোগী হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী
মমতা ব্যানার্জী। সুতরাং, কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে এই মুহূর্তে এই চুক্তি সম্পাদনের
মাধ্যমে মমতার বিরুদ্ধে মোদি এটিকে একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
পরিশেষে, দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাক এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে উভয় দেশ আরও এগিয়ে যাকÑ এটাই সকলের প্রত্যাশা।