× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আঞ্চলিক সম্পর্ক

পররাষ্ট্রনীতির আলোকে কৌশলী হতে হবে

ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফী

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৪ ০৯:১১ এএম

ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফী

ড. আব্দুল্লাহ হেল কাফী

টানা তৃতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। এবারের লোকসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় মোদির বিজেপিকে জোট সরকার গঠন করতে হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২০ বছর পর আবার জোট সরকার ফিরে এলো ভারতে। জোট সরকার গঠন করলেও মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে মোদি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তিনি তার দলের কাছেই রেখেছেন। স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়ে গেছে পুরোনো মন্ত্রীদের হাতে। যদিও লোকসভা নির্বাচনে মোদির হিন্দুধর্মবাদী রাজনীতি কার্যকর হয়নি। মোদির নেতৃত্বে ভারতের অর্থনীতি বড় আকার ধারণ করলেও দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বৈষম্য বাড়তে শুরু করেছে। বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ভারতে আয়বৈষম্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং জাতিভিত্তিক বৈষম্য বাড়ায় দেশটির মানুষ বিজেপির ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, এবার হয়তো মোদি সরকার গঠন করতে পারবেন না। তার বিরোধী পক্ষ ‘ইন্ডিয়া’ও ভালো লড়াই করেছে। লোকসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসের পুনর্জাগরণও ইতিবাচক।

তবে সব মিলিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ২১ জুন নয়াদিল্লি পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ভারতের উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকড় এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সফরে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী সমঝোতা স্মারক এবং চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানও প্রত্যক্ষ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সফরে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের নতুন সরকারের সম্পর্ক এবং মুসলিমদের বিষয়ে বিজেপি সরকারের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তাতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। ভারতে সরকার পরিবর্তন হলেও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের পরিবর্তন হয় না। সেক্ষেত্রে শুধু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর বিষয়ে ভারত সরকারের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনার সূচনা করবে, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই।

বাংলাদেশ বিষয়ে নয়াদিল্লিতে এখন যে ধারণা রয়েছে তাতে বড় পরিবর্তন আসারও কোনো কারণ নেই। লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল দেশটির অভ্যন্তরীণ ইস্যু। প্রসঙ্গত, প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। নিজেদের প্রয়োজনেই উভয় দেশ ও সরকারের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকবে। কারণ আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকার সব সময় সচেতন থাকবে। একটি বিষয় বলে নেওয়া ভালো, মোদি টিডিপি ও জেডিইউর সঙ্গে মিলে জোট সরকার গঠন করেছেন। এ দুটি দলেরই পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে খুব বেশি মাথাব্যথা নেই। বরং দুটি দলই রাজ্যকেন্দ্রিক চিন্তা করে বেশি। তাই পররাষ্ট্রনীতিতে এবারও বড় কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে হচ্ছে না। এমনকি কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া সরকার গঠন করলেও দেশটির প্রতিবেশী নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হতো না।

ভারতের এবারের নির্বাচন থেকে একটি বার্তা বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদি পেয়েছেন, তা হলো ধর্মীয় ও সামাজিক সংখ্যালঘুদের জন্য তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তবে জোট সরকারের শরিকদের কোনো আঞ্চলিক বিষয়ে তুষ্ট করার জন্য কিছু কিছু নীতির বিষয়ে আপস করতে হতে পারে। বাংলাদেশের মতো ইনক্লুসিভ প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। সেটাই বিজেপির ভবিষ্যতের জন্য ভালো। আবার বাংলাদেশের ওপরও তার একটি প্রভাব পড়বেভারতে ধর্মীয় ও সামাজিক সংখ্যালঘুদের নিয়ে বিজেপি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এলে তার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও। এতে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা আরও কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গত তিন বছরের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায় যে, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি কৌশলগত লাভের দিক থেকে খুব কমই অর্জন করেছে। ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ ‘নেইবারহুড লস্ট’ নীতিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভারত বিচ্ছিন্ন এবং ‘বিশ্বাস না করতে পারা’ প্রতিবেশী হয়ে উঠেছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পররাষ্ট্রনীতি মূলত নির্বাহী বিভাগের আওতায় থাকে এবং খুব কম ক্ষেত্রেই বিরোধীরা সে পথ পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু বিরোধী দলগুলো জবাবদিহির জন্য চাপ দিতে এবং নীতিমালার পেছনের মূল উদ্দেশ্যগুলো প্রকাশ করতে পারে। কংগ্রেস ও তাদের জোট নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে মোদির আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পর্যালোচনা করতে ইচ্ছুক কি না তা এখনই আমরা বলতে পারছি না। তবে এর বড় প্রভাব বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে যে পড়বে না তা অনেকটাই নিশ্চিত। নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক আরও গভীরতা পেয়েছে। এমন বিশ্বস্ত সহযোগী ভারত হারাতে চাইবে না।

বিশ্বমঞ্চে ভারতকে আরও সামনে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফের পাঁচ বছরের সুযোগ পেয়েছে বিজেপি। এক্ষেত্রে ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা ছাড়াও বহির্বিশ্বের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক ঠিক রেখে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসা মোদি সরকারকে একই সময়ে প্রতিবেশী পারমাণবিক ক্ষমতাধর চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু জোট সরকারের ফলে বিষয়টি মোদি ও তার দলের জন্য চ্যালেঞ্জিং মনে করা হচ্ছে। তবে মোদির নতুন মেয়াদে দিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের যে সম্পর্ক রয়েছে তাতে কোনো ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বড় অংশীদার হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে ভারতের। চীনের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার যে কোয়াড গঠন করা হয়েছে তারও অন্যতম সদস্য ভারত। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। যদিও মোদি মার্কিন আধিপত্যের বাইরে গিয়ে বা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কিছু ইস্যুতে কাজ করছেন। যেমন ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা সত্ত্বেও পশ্চিমাদের চাপ উপেক্ষা করে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে দিল্লি। এমনকি এ ব্যাপারে সতর্ক করা হলেও পিছু হটেননি মোদি।

মোদি সরকার পাকিস্তান ইস্যুতে সব সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পারলেও এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। এবার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থ জোটের কাছে উপস্থাপন করতে হবে বা অনুমতি নিতে হবে। একই সঙ্গে তীব্র বিরোধিতার মুখেও পড়তে হবে। ভারতে সম্প্রতি বিরোধীদের ওপর দমনপীড়নের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রেরও উদ্বেগ রয়েছে। তবে ৩.০-এর সঙ্গে বিগত এক দশকে নরেন্দ্র মোদির প্রথম দুই মেয়াদের অবশ্যই একটা বড় পার্থক্য আছে। সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে সরকার গড়ার জন্য তাদের নির্ভর করতে হয়েছে জোটের অন্য শরিকদের ওপর। মোদির ৩.০ আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা দুর্বল হবে বলেই পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। পার্লামেন্টে সংখ্যার দিক থেকে নরেন্দ্র মোদির এখন যে সামান্য দুর্বলতা আছে তা খুব শিগগিরই কাটিয়ে উঠতে পারবেন।

আমরা দেখছি, তিস্তা চুক্তি নিয়ে জটিলতা চলছে এক যুগের ওপর। ২০১১ সালে চুক্তি সম্পাদনের সব প্রস্তুতি সেরে ফেলার পরও শেষ মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জির আপত্তিতে তা সই করা যায়নি, এ কথাও সুবিদিত। এক বছর আগেই তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে একটি সমঝোতা হলেও এর বাস্তবায়ন হয়নি। তবে একটি মহল বলছে, খুব শিগগিরই একটি সমাধান আসতে চলেছে। শেখ হাসিনা নরেন্দ্র মোদির শপথগ্রহণে অংশ নিয়েছেন। ভারত সরকারের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে আবারও তিনি দিল্লিতে। ঘন ঘন দিল্লি সফরে কূটনৈতিক উদ্দেশ্য যে নেই তা বলা যাবে না। এ সফরের আগে উভয় দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত বিষয়ে কথা বলতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগ্রহের কথা ব্যক্ত হয়। এ ক্ষেত্রে দুই দেশই চাইবে তাদের নির্দিষ্ট কিছু এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও অর্জনের জন্য। তিস্তার মতো ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পূর্বের আলোচনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছার সম্ভবনাও দেখছেন বিশ্লেষকরা। চীন সফরের আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সমস্যাগুলো সমাধানের পথে আশার আলো তৈরি করছে। চীনের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক-কূটনৈতিক সম্পর্ক। এ সম্পর্ক কৌশলগতও বটে। ফলে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে ভারত অত চিন্তিত নয়। নরেন্দ্র মোদির সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন সময়ে অধিকাংশ দেশই আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নানা সমঝোতা কিংবা চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটাতে চায়। কূটনৈতিক তৎপরতা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য একটি চমকও হয়ে দাঁড়ায়। নরেন্দ্র মোদিও কি এমন কোনো চমক দেখাবেন? তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সামনেই তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

  • কূটনীতি-বিশ্লেষক ও অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা