প্রতিবেশী
গৌতম রায়
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৪ ১৫:৪০ পিএম
ভারতে লোকসভা নির্বাচনে বামেরা পেয়েছে সারা দেশে মোট আটটি আসন। এখনও যে বাম নেতা ও কর্মীরা সংসদীয় পথে ক্ষমতা দখলের তত্ত্বে বিশ্বাসীÑএ ফল থেকে তারা নিশ্চিন্ত হতে পারেন পরবর্তী ২০০ বছরেও সেই সাধ পূরণ হওয়ার নয়। সমস্যা হলো, যারা এর বিপরীত তত্ত্বে আস্থাশীলÑদেশে তাদের পরিচিতি উগ্রপন্থি হিসেবে, মাওবাদী ও নকশালপন্থি হিসেবে। অন্তত তারা বাম বা কমিউনিস্ট নন। প্রকৃত কমিউনিস্ট হলেন তারা, যারা কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল বা তেলুগু দেশমের মতো ধনী, বুর্জোয়া দলগুলোর সঙ্গে মঞ্চ পাল্টাপাল্টি করে সংসদে মন্ত্রিত্ব অর্জনের লড়াই করে এবং পরাজিত হন। অতএব বলা যায়, পরিস্থিতি এখন এমন, বামেদের এবার পেছন ফিরে তাকানোর সময় এসেছে।
অথচ এ সংসদীয় রাজনীতিতেই ভালো ফল
করার সুবর্ণ সুযোগ বামেদের এবার ছিল। মনে রাখতে হবে, অতীতে লোকসভা নির্বাচনে
বামেদের ৫০-৬০টি আসন প্রাপ্তি ছিল বাঁধা। দক্ষিণের দু-তিনটি রাজ্য এবং পশ্চিমবঙ্গ
ও ত্রিপুরায় বামেদের নিরঙ্কুশ জয় ছিল নিশ্চিত। বাম রাজনীতির একটি সর্বভারতীয়
চরিত্র ছিল। সেই স্বর্ণযুগ এখন আর নেই এবং কবে ও কীভাবে তা উধাও হলো বাম নেতারা
নিজেরাও জানেন না। এবারের নির্বাচনে নজরকাড়া ফল করেছে কংগ্রেস তথা ইন্ডিয়া গাঁটবন্ধন।
কংগ্রেসের আসনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে এবং মোট ২৩৫ আসন পেয়ে প্রায় বিজেপির
ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ‘ইডিয়া’। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হলো, মোদি ও বিজেপি
অপরাজেয়Ñএ দেশে প্রচলিত এমন একটি মিথ ভেঙে দেওয়া গেছে। এমনকি স্বয়ং নরেন্দ্র
মোদিও বেনারস কেন্দ্রে প্রথম পাঁচ রাউন্ড গণনায় অনেকটা পেছনে পড়ে যান। কী করে
এটা সম্ভব হলো! সবাই জানেন, এবারের নির্বাচনে চাকা ঘুরিয়েছে রাহুল গান্ধীর ‘ভারত
জোড়ো’ যাত্রা। প্রসঙ্গত, কেরলের কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর এআইসিসির বৈঠকে এবারের
নির্বাচনে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হলেন রাহুল গান্ধী বলে যে মন্তব্য করেন তা
যুক্তিহীন নয়।
এ প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, কেন বামেরা
রাহুলের ভারত জোড়ো যাত্রায় শামিল হলো না! যদি দলগতভাবে যোগ দেওয়ার বাধাও থাকে
তা হলেও বিভিন্ন রাজ্যের বড়, ছোট বা মাঝারি নেতাদের তো এ যাত্রায় দেখা যেতে
পারত। বামেরা কি ভারত জোড়োর তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়? এ দীর্ঘ যাত্রাপথে রাহুল
গান্ধী একশর বেশি জনসভা করেছেন, তার মধ্যে কয়েকটিতে রেকর্ড জনসমাগম হয়েছিল।
বামেরাও সেই মঞ্চ ব্যবহার করে তাদের বার্তা পৌঁছে দিতে পারতেন দেশবাসীর কাছে।
অন্তত বাম নেতারা হয়ে উঠতে পারতেন মানুষের কাছে পরিচিত মুখ। এটা অসম্ভব ছিল না এ
কারণে, এ বামেরাই পরে বাতানুকূল ঘরে বসে দীর্ঘ আলোচনা করে কংগ্রেসের সঙ্গে ‘ইন্ডিয়া’
তৈরি করেন। এর বহুলপ্রচলিত নাম হলো আর্মড চেয়ার পলিটিক্স। মাঠের রাজনীতিটা করে এলো
কংগ্রেস, যা করার কথা ছিল বামপন্থিদের এবং তারা ঘরে বসে কেবল লম্বা লম্বা বিবৃতি
দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের এ সুবর্ণ সুযোগটি হারালেন। প্রত্যাশিত হলো,
বামেরা যখন দলের নির্বাচনী বিপর্যয় নিয়ে পর্যালোচনায় বসবেন, তখন এ গুরুতর
ভ্রান্তিটি আলোচনায় উঠবেই না। বরং অন্যদের কূটকৌশলগুলোকেই পরাজয়ের কারণ হিসেবে
দেখানো হবে।
এগুলো অংশত ঠিক, কিন্তু ভারত জোড়ো
যাত্রার বিশাল তাৎপর্য যে তারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন তা কখনই স্বীকার করা
হবে না। লক্ষ করার মতো, দক্ষিণ ভারত বাদে কংগ্রেস প্রায় সর্বত্রই শুরু করেছে
শূন্য থেকে এবং কেবল সঠিক সিদ্ধান্তের জোরে তারা পেয়েছে আশাতীত সাফল্য। সাধারণভাবে
রাজ্যে রাজ্যে বামেদের রণকৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে এ রকমÑকয়েকজন ভ্রাম্যমাণ বক্তা
গোটা রাজ্যে রুটিন করে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেনÑসংখ্যায় এরা প্রায় কুড়িজনÑমাঝে
মাঝে কয়েকজন টিভি সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাও জুড়ে যাচ্ছেন তাদের সঙ্গে। রাজনীতি
যে কত দ্রুত বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে এ নায়ক-নায়িকাদের আবির্ভাবই তার প্রমাণ। এরা
সবাই ‘ডেডিকেটেড’ বামপন্থি। এখন আর সারা দিন রোদে, জলে ঘুরে ঘুরে পার্টির কাজ করে
বেড়ানো কমরেডদের কোনো মূল্য নেই। কদর না থাকায় এ সম্প্রদায়টি প্রায় বিরল হয়ে
গেছে। সেই বক্তারা যখন জনসভার আয়োজন করলে বক্তৃতা দিতে আসেন তখন কর্মীরা এসে সে
সভায় জড়ো হন, মাঝে মাঝে হাততালি দেন। সভা শেষ হয়ে গেলে তারা আবার অপেক্ষা করতে
থাকেন দু-তিন দিন পরে পরবর্তী সভাটির জন্য।
অনেকে বলছেন, পাড়ায় পাড়ায় পার্টির
সংগঠন নেই তাই এ হার। মনে রাখতে হবে, কোনো একটি এলাকায় সংগঠন গড়ে তোলা সহজ
নয়। মানুষ সংগঠনে কেন আসবে? দরিদ্র মানুষকে সংগঠিত করতে গেলে দীর্ঘস্থায়ী
আন্দোলনের প্রয়োজন। রাজ্যে বহু দরিদ্র আছে, শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্ব আছে কিন্তু
কোথাও কোনো আন্দোলন নেই। আন্দোলন করার মতো উপযুক্ত লোকেরও অভাব। দরিদ্র
ছেলেমেয়েদের বুনিয়াদি শিক্ষাদানও একটা আন্দোলন হতে পারে। বাংলার গ্রামে
গ্রামে বহুলপ্রচলিত পণপ্রথার বিরুদ্ধেও গড়ে উঠতে পারে নারী আন্দোলন। কিন্তু এগুলোতে
পার্টির ঘোর অনীহা। কারণ এসব আন্দোলনের প্রতিফলন শেষমেশ ভোটের বাক্সে পড়ত কি না
তা অনিশ্চিত। অর্থাৎ গোটা পার্টির রাজনীতিটিই তৈরি হবে ভোটের দিকে তাকিয়েÑএই হলো
এখন দলের নীতি। তাই ভোট বৃদ্ধির জন্য নির্বাচিত ও জনমোহিনী ভাষণ দিতে সমর্থ এমন এক
বক্তা টিম তৈরি করা হয়েছে। তারা গোটা রাজ্যে অসংখ্য টুর্নামেন্টে খেলে বেড়াচ্ছেন
কিন্তু জয় অধরা থেকে যাচ্ছে।
রাজ্যের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী কিংবদন্তি অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র একবার বলেছিলেন, ‘এ দেশের বাম রাজনীতিকে আবার পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে ফিরে যেতে হবে।’ নিন্দুকের অভাব নেই, তাই তিনি আর এ বিষয়ে বিস্তারিত বলেননি, কিন্তু তার এ এক লাইনের উক্তির মানেই অনেক। যত দূর মনে পড়ে, পঞ্চাশের দশকে দেখা যেত শহরের রাস্তায় আঁকাবাঁকা দীর্ঘ মিছিল। দেখা যেত বন্ধ কারখানার মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে, লাল পতাকা টাঙিয়ে বিড়িখোর শ্রমিকরা স্লোগান দিচ্ছে। সত্যিই সেই সময়টাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। তাতে ভোটের বাক্সে এখনই কোনো পরিবর্তন প্রতিফলিত হবে কি না বলা যায় না কিন্তু অন্তত দরিদ্র শ্রেণি উপলব্ধি করতে শুরু করবে এ পার্টি তাদের সম্পত্তি। কমিউনিস্ট পার্টি তাদের পার্টি, তাদের সংসার।