নুরুল আলম মাসুদ
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২২ ০০:০৫ এএম
সুবর্ণচরের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণে দেখা যায় এখানে ধর্ষণ-নিপীড়নের শিকার নারীদের বেশিরভাই দরিদ্র ছবি : সংগৃহীত
নোয়াখালীর সুবর্ণচরে বারবার ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। গত ৬ নভেম্বর রাতে সুবর্ণচরে বাবা-মাকে বেঁধে কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। পুলিশ এ ঘটনায় ইতোমধ্যে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা এবং ধর্ষণের ঘটনায় নোয়াখালীর এই জনপদটি বারবার সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে।
সুবর্ণচর প্রথম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে ২০১৮ সালে। সে বছর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পছন্দের মার্কায় ভোট দেওয়ায় চর জুবিলি এলাকায় এক নারী ধর্ষণের শিকার হন। এর তিন মাস পর অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া চলতি বছরের আগস্ট মাসে সুবর্ণচর সদরে ছয় বছরের একট শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এগুলো শুধুমাত্র ধর্ষণের ঘটনার বর্ণনা, কিন্তু নারীর প্রতি শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এখানকার বেসুমার ঘটনা, যার খুব সামান্যই পুলিশ বা গণমাধ্যমের গোচরে আসে।
কেন নোয়াখালীতে বারবার ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, এর কার্যকারণ কী, তা নিয়ে কোনো নিবিড় গবেষণা হয়নি। তবে, সুবর্ণচরের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণে দেখা যায় এখানে ধর্ষণ-নিপীড়নের শিকার নারীদের বেশিরভাই দরিদ্র, ভূমিহীন অথবা নতুনভাবে বসতি গড়া নদীভাঙা মানুষ। নতুন জেগে ওঠা নোয়াখালীর দক্ষিণাঞ্চলে গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন জনপদের মানুষ নতুনভাবে বসতি গড়তে শুরু করে, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে, এখানকার ভূমিপুত্রদের সঙ্গে নতুন বসতি স্থাপনকারীদের মাঝে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। এই দ্বান্দ্বিক এবং মিশ্র সংস্কৃতিতে নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনাই বেশি। নারীরা বারবারই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। এটি যে শুধু সুবর্ণচরের ক্ষেত্রেই ঘটছে তা নয়, ইতিহাসে সকল সমাজেই দেখা যায় ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ দেখাতেই টার্গেট করা হয় নারীদের, আর ধর্ষণের মাধ্যমে সেই ক্ষমতার প্রকাশ দেখানো হয়।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় আমাদের যাপিত সমাজ নারী-পুরুষের যে আদর্শ ছাঁচ তৈরি করেছে, তার মধ্যেই ধর্ষণের বীজ রোপিত। সমাজ নারীত্ব হিসেবে নিষ্ক্রিয়তা ও নাজুকতার যে আদর্শ ছাঁচ তৈরি করে, সেখানে নারীর ‘ইজ্জত নষ্ট’ করার মাধ্যমে দরিদ্রদের একঘরে করা এবং প্রতিশোধ গ্রহণের সংস্কৃতি বিদ্যমান, যা পুরুষের ক্ষমতা প্রকাশের মাধ্যম। এ ছাড়া আরেকটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। তা হলো, সুবর্ণচরের অনেক খাসজমি রয়েছে। ওই খাসজমি দখলে রাখতে তৈরি হয়েছে অনেক সন্ত্রাসী গ্রুপ। অভিযোগ রয়েছে এদের অনেকের পেছনেই রয়েছে প্রভাবশালী মহল, রয়েছে রাজনৈতিক ছত্রছায়াও। এই গ্রুপগুলোই খাসজমির দখল নিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বেছে নিচ্ছে ধর্ষণ ও নিপীড়নের মতো জঘন্য বিষয়।
সুবর্ণচরে নারীর প্রতি সহিংসতা মহামারির আকার ধারণ করার পেছনে রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালীদের নির্লিপ্ততা। এমনকি অনেক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধেও সরাসরি অভিযোগ উত্থাপনের মতো ঘটনা রয়েছে। যাতে করে এই এলাকায় নারীর প্রতি সহিংসতায় উদাসিনতার ছাপ খুব স্পষ্ট। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নারী নির্যাতন প্রতিরোধে এবং গ্রাম-আদালতের মাধ্যমে নারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কাজ করবে। কিন্তু বাস্তবে এমনটি অনেক এলাকাতেই হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা যথাযথ সহায়তা পায় না। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগকারীণীকে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়। আর স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালীদের সহায়তায় পার পেয়ে যায় অপরাধী। তৈরি হয় ‘নিজেদের লোক’সর্বস্ব ‘দায়মুক্তি’র সংস্কৃতি, যাতে করে একবারের অপরাধী আবারও উৎসাহী হয়ে ওঠে পরবর্তী অপরাধের বিষয়ে। এমনকি এতে করে ভবিষ্যতের অপরাধও উস্কে দেওয়া হয়। কারণ অপরাধীর বিচার না হওয়া, তার পার পেয়ে যাওয়া, দায়মুক্তির সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে প্রকারান্তে ভবিষ্যতের অপরাধই উৎসাহিত হয়। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে হলে অবশ্যই আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের। সেইসঙ্গে অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সেইসঙ্গে অপরাধপ্রবণ এলাকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেও সচেতন হতে হবে। অপরাধী যেন কোনোভাবেই কারও প্রশ্রয় না পায়, কারও ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যেতে না পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। এ ছাড়া আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, আর তা হলো-ঘটনা যেখানেই ঘটুক, যতটুকুই ঘটুক, তার সবটুকুই স্থানীয় পর্যায়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে, ঘটনাটি নথিবদ্ধ করার মাধ্যমে প্রো-অ্যাক্টিভ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
একটি বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক সংবাদমাধ্যমে পরিবেশিত তথ্যে জানা যায়, ২০১৩ সাল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৯ হাজার ৬৫৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৩৭৯টি। তবে, দেশে যে পরিমাণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, সেই তুলনায় মামলা হয়েছে অনেক কম।
আইনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে অপরাধীর পার পেয়ে যাওয়া, সামাজিকভাবে হেয় হওয়া বা সামাজিক অবস্থান নষ্ট হওয়ার ভয়কেও বিবেচনায় এনে অনেক সময় মানুষ মামলা করতে ভয় পায়, সংঘটিত অপরাধের বিষয়ে অভিযোগ করতে আস্থাহীনতায় ভোগে। এ থেকে সুবিধা আদায় করে অপরাধীচক্র। অপরাধের অভিযোগ দায়ের না হলে, অপরাধীর বিচার না হলে, একই অপরাধী এই ধরনের অপরাধের ঘটনা পুনঃপুন ঘটাতে থাকে। কিন্তু ভুক্তভোগী যদি যথাসময়ে অভিযোগ জানায়, পুলিশের কাছে অপরাধীর তথ্য প্রদান করে, অপরাধী গ্রেফতার হয়ে বিচারের জন্য আদালতে সোপর্দ হয়, অপরাধ বিচার করে আদালতের মাধ্যমে অপরাধীদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়, তাহলে অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে অনেক। কমে আসবে ধর্ষণের মতো বর্বর ও জঘন্য অপরাধও। দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করা কঠিন। আবার অনেকের ধারণা, এই ধরনের অপরাধ করে সহজেই পার পাওয়া যায়। ফলে এ ধরনের অপরাধগুলো বেশি ঘটছে।
এ ছাড়াও নারী নির্যাতন-নিপীড়ন-ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে বিগত সময়ের সকল মামলা এবং অভিযোগের দ্রুত বিচার এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেসকল খাসজমি ভূমিহীনদের দখলে আছে সেখানে তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে বন্দোবস্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং অন্যান্য খাসজমি তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাদের মধ্যে বন্দোবস্ত দিয়ে জোরদারদের হাত থেকে সকল খাসজমি উদ্ধার করতে হবে। নারী নির্যাতনের সকল ঘটনা ইউনিয়ন পরিষদ এবং থানা পুলিশ রেকর্ড করতে হবে এবং প্রতিটি ঘটনা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। ধর্ষণের ঘটনা দ্রুত আমলে আনা, তদন্ত করা এবং অপরাধ উৎপাটনে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। যেকোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয়কে সামনে আনার পরিবর্তে তাদেরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে, সেই সঙ্গে এই ধরনের অপরাধের বিষয়ে রাজনৈতিক দল থেকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। জরুরিভাবে সুবর্ণচরে নারীদের জন্য ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার গঠন করা এবং ইতঃপূর্বে এই জাতীয় ঘটনার শিকার নারীদের জন্য কাউন্সেলিং ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
সারা দেশের মতো সুবর্ণচরেও নানা কারণে সমাজের ভেতর থেকে ক্রমেই কমে আসছে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। কিন্তু, সমাজের সামনে থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এই মহামারি ঠেকানো কঠিন। এখানে ধর্ষণের যে মনস্তত্ত্ব কাজ করছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। এ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের ওপর মামলা-হামলা-নিপীড়ন বন্ধ করা এবং নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এখানে সংঘটিত কোনো ঘটনাই বিক্ষিপ্ত নয়, প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি অপরাধীদের যথাযোগ্য শাস্তি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই ধর্ষণ-নিপীড়নের মতো মহামারির ইতি টানা সম্ভব।
লেখক : উন্নয়নকর্মী