শ্রদ্ধাঞ্জলি
ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৪ ১৩:২০ পিএম
মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ
মেজর জেনারেল
(অব.) আব্দুর রশীদের সঙ্গে আমার বহুদিনের সখ্য। সাভার সেনানিবাসে দুজনই একসঙ্গে দায়িত্ব
পালন করেছি। দুজনই মেজর র্যাংকের অফিসার ছিলাম। সৌভাগ্যবশত তিনি আর আমি একই ভবনে পাশাপাশি
ফ্ল্যাটে থাকতাম। তাই পারিবারিকভাবেও আমাদের সখ্য গড়ে উঠেছিল। মেজর রশীদ প্রচুর পড়তেন।
তার কাছে অনেক বই ছিল। আমি প্রায়ই তার থেকে বই ধার করে পড়তাম। সাভার সেনানিবাসে তাকে
দক্ষ ও চৌকশ অফিসার হিসেবেই আমরা চিনতাম। সেনাবাহিনীর সব প্রশিক্ষণেই তিনি দারুণ করতেন।
এমনকি বিদেশি প্রশিক্ষণের সময়ও তাকে সবার সামনে উপস্থাপন করা হতো চৌকশ অফিসার হিসেবে।
পরে কর্নেল পদোন্নতি পেয়ে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে চলে যান। আর আমি মেজর
হিসেবে সেনা সদর দপ্তরের গোয়েন্দা বিভাগে চলে যাই। ওই সময় তিনি জেনারেল মুস্তাফিজুর
রহমানের সহকারীর দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর
আধুনিকায়ন ও রূপ বদলে জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমানের অবদান অনস্বীকার্য। নারী সেনা অন্তর্ভুক্তিকরণ,
আর্মি ইনস্টিটিউট, নার্সিং ইনস্টিটিউট, মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মতো কিছু সিদ্ধান্ত
তিনি নিয়েছিলেন। তখন এর বিপক্ষে যুক্তি উঠেছিল। জেনারেল মুস্তাফিজ সব প্রতিবন্ধকতা
সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। পুরোটা সময় তাকে সহযোগিতা করেছেন
মেজর জেনারেল রশীদ। তিনিই কাগজপত্র তৈরি করতেন। বিভিন্ন পরিকল্পনা বিষয়ে নীতিমালা,
রূপকল্প এবং প্রস্তাবের যুক্তি সাজাতেন। সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নে জেনারেল মুস্তাফিজের
ভাবনার বাস্তব আদল দিয়েছিলেন মেজর রশীদ।
রশীদ ছিলেন সুবক্তা।
যেকোনো বিষয় তিনি যুক্তিসহকারে উপস্থাপন করতে জানতেন। বাংলা আর ইংরেজিÑদুই ভাষাতেই
তার পারদর্শিতা ছিল এবং সমান হাতে দুই ভাষাতেই লিখতে জানতেন। এমন গুণ থাকা বিরলই বটে।
অবসরগ্রহণের পর মেজর রশীদকে আমরা ভিন্নরূপে পেলাম। দেশে নিরাপত্তা বিষয়ে বৈজ্ঞানিক
ও সামরিক বিদ্যার ভিত্তিতে আলোচনার অভাব ছিল বহুদিন। মেজর জেনারেল (অব.) রশীদ যেন সেই
শূন্যস্থান পূরণ করতে শুরু করলেন। সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত তিনি মূল্যবান বিষয়ে লিখেছেন।
আধুনিক বিশ্বে জ্ঞানই হচ্ছে নিরাপত্তা। আধুনিকায়নই সব সময় আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত
করতে পারে না। আধুনিক বিশ্ব অনেক বদলে গেছে। বদলে গেছে সামরিক নিয়ম। কোনো একটি ক্ষমতাধর
রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের মারপ্যাঁচ হিসাব করে আর সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে না। বরং
শুরু হয় প্রক্সি ওয়ার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা সুদানে সহিংসতায় আমরা দেখছি বড় শক্তিগুলো
এখানে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে না পড়লেও তৃতীয় একটি পক্ষের মাধ্যমে যুদ্ধের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ
করছে। এ বিষয়গুলোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতি।
নিরাপত্তা বিষয়ে
আমরা যারা গবেষণা করি তাদের জন্য এ প্রজন্মের একজন আইকন ছিলেন মেজর জেনারেল রশীদ। সংবাদমাধ্যম
তো বটেই, টেলিভিশনের টকশোতেও তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছেন। আমি নিজেও তার সঙ্গে টকশোয়
অংশ নিয়েছি। সব সময় যে তার সঙ্গে আমার মতের মিল হতো এমনটি নয়। কিন্তু মতের মিল না হলেও
তিনি কখনও আমাকে কটাক্ষ করেননি কিংবা জুনিয়র অফিসার হওয়ার পরও তার সঙ্গে তর্ক করায়
ক্ষুব্ধ হননি। তিনি যুক্তিনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। মনোযোগ দিয়ে মন্তব্য শুনতেন এবং যদি মনে
করতেন তা যুক্তিসঙ্গত তাহলে দ্বিধা ছাড়াই মেনে নিতেন। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ তিনি নিয়মিত
সমসাময়িক নিরাপত্তা ইস্যুতে লিখেছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতা, মিয়ানমারে গৃহদাহ,
সমতলে জঙ্গি তৎপরতা ইত্যাদি বহুমাত্রিক বিষয়ে তার লেখা পড়েছি এবং চমৎকৃত হয়েছি। আমাদের
প্রজন্মের কাছে তার মৃত্যু বেদনাকাতর। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।