জন্মদিন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৪ ১৪:৩৮ পিএম
তাঁর সাত দশকের বেশি সময়ের জীবন যেমন বর্ণাঢ্য, তেমন বিগত আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর হৃৎপিণ্ডে ঘটে চলেছে নিরন্তর রক্তক্ষরণও। কিন্তু কি বিস্ময়কর শক্তি তাঁর! এ রক্তক্ষরণও তাঁকে দমাতে পারেনি সৃষ্টি থেকে। তাঁর দ্বিতীয় সন্তান প্রশিক্ষণরত বৈমানিক ফারিয়া লারার বিমান দুর্ঘটনায় জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার পর সেলিনা হোসেন পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। সেই পাথর ভেঙে নিজেই আবার ভাঙতে চেয়েছেন, শোক শক্তিতে রূপান্তর করে সৃজনশীলতার, সৃষ্টিশীলতার উর্বর জমি চষে সাহিত্যের সোনালি ফসল ফলাতে। তাঁর এ রক্তক্ষরণের তীব্রতা খুব করে টের পাই ২০০০ সালে ‘লারা’ বইটি প্রকাশের পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পাঠ করে। যত দূর মনে পড়ে অসাধারণ এই বইটি শেষ করেছিলাম প্রায় বিরতিহীনভাবে অভ্যাসের বৃত্ত ভেঙে। সেলিনা হোসেনের সঙ্গে আমার শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্ক প্রায় তিন দশকের। তাঁর ঘরে মমত্বের আলাদা একটুখানি জায়গা যেন পৃথক করা আছে। সেখানে গেলে খুব বেশি পরিতৃপ্ত হই। সেখানে যতবারই গিয়েছি কিংবা যাই ততবারই নতমস্তকে সেলিনা হোসেনকে পাঠ করার চেষ্টা করেছি এবং করি। কিন্তু গভীর সমুদ্রের মতো সেলিনা হোসেনের ভান্ডার এত বেশি সমৃদ্ধ যে, ওখানে সাঁতরিয়ে কূলকিনারা পাওয়া দুরূহ।

১৯৪৭ সালের ১৪ জুন পিতার কর্মস্থল রাজশাহীতে তিনি ভূমিষ্ঠ হন। তখন কে জানত এই সেলিনা হোসেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সম্পদরূপে একদিন সমাদৃত হবেন। মূল পৈতৃকনিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজীরপাড়া গ্রাম হলেও পিতা এ কে এম মোশাররফ হোসেন কর্মসূত্রে তখন রাজশাহীতে (পরিচালক, রাজশাহী রেশম কারখানা)। এ কে এম মোশাররফ হোসেন ও মরিয়ম নেসা বকুলের চতুর্থ সন্তান সেলিনা হোসেন বহু আগেই খ্যাতির ভুবনে নাম লিখিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকেও শুরু করেন লেখালেখি। তখনকার লেখা নিয়ে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। এর পর থেকে বিরামহীন সেলিনা আপা।
এপার-ওপার বাংলার কথাসাহিত্যিকদের অন্যতম ষাটের দশকের শেষার্ধে ছোটগল্প দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও উপন্যাস-অনুবাদসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও তিনি স্বাক্ষর রাখেন কৃতিত্বের। তবে উপন্যাস তাঁর খ্যাতির সীমানা বিস্তৃত করে দেয়। হাঙর নদী গ্রেনেড, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, মগ্ন চৈতন্যে শিষ, যাপিত জীবন, চাঁদবেনে, নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি, গায়ত্রীসন্ধ্যা, ঘূমকেতুর ঈশ্বর, পূর্ণ ছবির মগ্নতা, ভূমি ও কুসুম, যমুনা নদীর মুশায়রা ইত্যাদি বিখ্যাত আরও উপন্যাসের নাম বলে দেওয়া যাবে এক নিঃশ্বাসে। এ কিংবদন্তিতুল্য কথাশিল্পীর সৃষ্টির খতিয়ান আজ অনেক বেশি স্ফীত। যত দূর জানি (সংখ্যাচিত্র আরও বেশি হতে পারে) এ পর্যন্ত তাঁর (সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর বিচরণ প্রায় সাড়ে চার দশক) ৪১টি উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ ১০৪টি, প্রবন্ধগ্রন্থ ১২টি, ছোটদের বই ৩০টি, অনুবাদগ্রন্থ ৮টিসহ একক ও যৌথ সম্পাদনায় আরও অন্য গ্রন্থ রয়েছে ১৩টি।
২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে অবসরের পর দুই বছর (২০১৪ থেকে) শিশু একাডেমির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে বাংলা
একাডেমির সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত। তিনি তাঁর সৃষ্টিশীলতা-সৃজনশীলতার জন্য ইতোমধ্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদকসহ দেশবিদেশে আরও অনেক সম্মাননা ও পদক অর্জন করেছেন। লেখালেখি ছাড়াও তাঁর আরও একটি জগৎ আছে, যা হয়তো তাঁর অনেক মনোযোগী একনিষ্ঠ পাঠক জানেন না। তিনি সামাজিক ক্ষেত্রেও অনেক সক্রিয় এবং নানা রকম সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত। ‘লারা ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে তিনি অনেক কাজ করে চলেছেন। তাঁর পুরো বাড়ির কক্ষগুলো শিল্পসংস্কৃতির অসংখ্য উপকরণ আর দুর্লভ বস্তুতে ঠাসা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ঘুরে ভ্রমণপিপাসু (ভ্রমণ তাঁর নেশা) সেলিনা হোসেন এসব সংগ্রহ করে সঞ্চয়ের ভান্ডার স্ফীত করেছেন।
সেলিনা আপার লেখার জগৎ মানুষ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি তাঁর কাছে বরাবরই প্রাধান্য পেয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী-সম্প্রদায়ও এসেছে গুরুত্বপূর্ণভাবে। লোকপুরাণের নানা অধ্যায়ের রূপদানেও তিনি সার্থক। তাঁর উপন্যাসে সমকালের সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংকটের সামগ্রিকতা এবং বাঙালির অহংকার ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এসেছে নতুন মাত্রায়। জীবনের গভীর উপলব্ধির প্রকাশকে তিনি শুধু কথাসাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, শানিত ও শক্তিশালী গদ্যের নির্মাণে প্রবন্ধের আকারেও উপস্থাপন করে চলেছেন। তাঁর নির্ভীক কণ্ঠের প্রতিফলন ঘটেছে কথাসাহিত্য-প্রবন্ধ-কলামে। বিশ্বটা তাঁর কাছে যেন ‘বাউন্ডলেস ইউনিভার্স’। দেশবিদেশের অসংখ্য সাহিত্যসভায় তিনি উপস্থাপন করেছেন বহুবিধ মূল্যবান গবেষণাসমৃদ্ধ তথ্যচিত্র। ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি, রুশ, মালে, ফরাসি ভাষায় তাঁর অনেক রচনা অনূদিত হয়েছে। তাঁর হাঙর নদী গ্রেনেড ও পোকামাকড়ের ঘরবসতি উপন্যাস দুটি সিনেমার শ্রেষ্ঠ কাহিনী হিসেবে পুরস্কার অর্জন করেছে।
ওই যে শুরুতেই লিখেছি তাঁর হৃৎপিণ্ডে রক্তক্ষরণের কথা, এর সাক্ষ্য বহন করছে ‘লারা’ গ্রন্থটি অত্যন্ত জলজ্যান্তভাবে। ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর মর্মান্তিকভাবে ফারিয়া লারার জীবনাবসান ঘটে আর তাকে নিয়ে ২০০০ সালের মধ্যেই ২০৮ পৃষ্ঠার ‘লারা’ নামক বেদনাভরা গ্রন্থটি রচনা করেন তিনি। এয়ার পারাবাতের শিক্ষানবিশ বৈমানিক হিসেবে একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে যে লারার জীবনাবসান ঘটল, অত্যন্ত মর্মন্তুদভাবে সেই লারাকে মমতাময়ী মা সেলিনা হোসেন বইয়ের পাতায় পাতায় জীবন্ত করে রেখেছেন। তিনি কত বড় দুঃসাহসী ও দ্বিধাহীন লেখক এর বহু প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর অনেক রচনায়ই। চর্যাপদের আশ্রয়ে তিনি আমাদের জাতিসত্তা নতুনভাবে উন্মোচনের পাশাপাশি আরও অনেক অক্ষয় কাজই করেছেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে যে রক্তাক্ত ইতিহাস তা তাঁর তিন খণ্ডে প্রকাশিত ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে ঐতিহাসিকতার নিরিখে।
মহান একুশকে কেন্দ্র করে রচিত তাঁর ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাস ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে আমাদের সাহিত্যে; যা ইতিহাসের অনন্য দলিল হিসেবে স্থান দখল করেছে। যাপিত জীবনে তিনি সীমিত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। অর্জনের জন্য যে নিরন্তর সাধনার প্রয়োজন সে ক্ষেত্রে তিনি একজন সার্থক সাধক। সেলিনা হোসেনের খ্যাতির সীমানা তাঁর কর্মের কারণেই অনেক অনেক বেশি বিস্তৃত। ‘নীল ময়ূরের যৌবন’ পাঠকের কাছে তাঁর অন্যরকম সন্ধান দিয়েছিল এবং তাঁর নতুন পাঠকদের সে পথে টেনে নেবে। গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-কিশোর রচনা-কলাম ইত্যাদি যে ক্ষেত্রেই হাত দিয়েছেন সেগুলোই হয়ে গেছে অনবদ্য সৃষ্টি এবং সেগুলো সাহিত্যের অতি উচ্চ পর্যায়ে স্থান পেয়েছে এবং পেয়ে চলেছে। তাঁর সম্পাদনাগ্রন্থের মধ্যে ‘জেন্ডারকোষ’ অন্যতম একটি সৃষ্টি।
তাঁর ‘পূর্ণ ছবি মগ্নতা’ উপন্যাসটিতে যে দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে, চরিত্র নির্ণীত হয়েছে, একজন বোদ্ধা পাঠকের কাছে তা ধরা দেবে একেবারে জীবন্ত হয়ে। ছিটমহলবাসীকে নিয়ে রচিত তাঁর উপন্যাস ‘ভূমি ও কুসুম’ একটি অসাধারণ ঐতিহাসিক দলিল। ‘গেরিলা ও বীরাঙ্গনা’ উপন্যাসটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনন্য আরেকটি রচনা। পাকিস্তানি হানাদারদের হত্যাযজ্ঞ, পাশবিকতাসহ নানা মর্মন্তুদ চিত্র চিত্রিত হয়েছে এ উপন্যাসে যা পাঠে চোখের পাতা ভিজে উঠতে বাধ্য। পৃথকভাবে কতই না বর্ণনা দেওয়া যায় তাঁর রচনাগুলো নিয়ে। তাঁর আয়ুষ্কাল কত তা শুধু জানেন বিধাতা কিন্তু তাঁর রচনাগুলো যে দীর্ঘায়ু লাভ করেছে তাতে সন্দেহ কি!
তাঁর উপন্যাস বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে এও প্রমাণিত, তিনি কত মহান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। অবিশ্রাম লিখে চলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ডুবে থাকা সেলিনা হোসেনের কাছে তাঁর জন্যই আমরা ঋণী। তিনি তাঁর শিল্প-সাহিত্য কর্মের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির ভূমিকা যেভাবে তুলে ধরেছেন তা আমাদের কাছে অপরিহার্য হয়েই থাকবে। তিনি আমাদের ভাবনার সীমারেখা ঘুচিয়ে দিয়েছেন, উদাম করে দিয়েছেন শব্দের সামাজিক উৎপাদনশীল ভূমিকাগুলো। শব্দের অন্তরঙ্গ ভুবন থেকে তিনি চিন্তা, আবেগ ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে অনবরত বিস্তার করেছেন জনসমাজের ক্ষেত্র। তিনি শব্দগুলোকে উৎপাদনশীল করে নান্দনিক, সামাজিক, ধর্মজ, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দিকে ধাবিত করেছেন।
রক্তস্নাত বাংলাদেশে উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ-সন্ত্রাসের পুনরুত্থানের বৈরী সময়েও চেতনা এবং মূল্যবোধ সঙ্গী করেই তখনও তিনি কলম চালিয়েছেন বীরদর্পে। অন্ধকারের বিরুদ্ধে সেলিনা হোসেনের যে লড়াই তা আমাদের অন্য রকম প্রেরণা জোগায়। সেলিনা হোসেন পঁচাত্তর-উর্ধ্ব বয়সেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন সহিষ্ণু বৃক্ষের মতো আমাদের ছায়া দিয়ে। সদাহাস্যময়ী (হৃৎপিণ্ডে এত রক্ষণ সত্ত্বেও) অসম্ভব বিনয়ী, প্রকৃত কর্মিষ্ঠ ও নিবেদিত চিত্তের ব্যক্তিদের মাঝে অন্যতম একজন হিসেবে সেলিনা আপা যে প্রদীপ অসীম ধৈর্য ও অপরাজেয় নিষ্ঠার সঙ্গে অন্তর্লোকে জ্বালিয়ে রেখেছেন, এর আলো আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সেলিনা হোসেনের ভেতরকার যে সম্পদ তা বোঝার শক্তি-সাধ্যি আমাদের অনেকেরই যে নেই তা স্থির বলতে পারি। দ্বিধাহীন চিত্তে এও বলতে পারি, তাঁর স্বভাবের কোমলতায়, সংকল্পের দৃঢ়তায়, রচনাশৈলীর পরিপুষ্টতায়, ভাবনা-চিন্তার উদারতায় আমরা স্নাত।
বিনম্র শ্রদ্ধায় উচ্চারণ করি শুভ জন্মদিন।