জনস্বাস্থ্য
ড. হারুন রশীদ
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৪ ০৯:৩০ এএম
ড. হারুন রশীদ
ভোজনরসিক জাতি হিসেবে বাঙালির জুড়ি নেই। কিন্তু কী খাবেন? যাতে
হাত দেবেন তাতেই সমস্যা। খাদ্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল, ওষুধে ভেজাল, চিকিৎসাসেবার
মান নিম্নমুখী- ত্রিশঙ্কু অবস্থার মধ্যে পড়ে বাঙালির জীবন এখন ওষ্ঠাগত। নিরাপদ খাবার আদৌ আছে
কি? মাছে ও দুধে ফরমালিন,
ফলমূলে কার্বাইডসহ নানান বিষাক্ত কেমিক্যাল, সবজিতে
রাসায়নিক কীটনাশক,
জিলাপি-চানাচুরে মবিল, বিস্কুট, আইসক্রিম, কোল্ডড্রিংস, জুস, সেমাই, আচার,
নুডল্স-মিষ্টিতে টেক্সটাইল ও লেদার রঙ, পানিতে ক্যাডমিয়াম, লেড, ইকোলাই, লবণে
সাদা বালু, চায়ে করাতকলের গুঁড়া,
গুঁড়া মসলায় ভুসি, কাঠ-বালু-ইটের
গুঁড়া ও বিষাক্ত গুঁড়া রঙ। ফলে কোনো খাবারই নিরাপদ নয়। কিন্তু এগুলো দেখার যেন কেউ
নেই। সবকিছু চলছে লাগামহীন,
ফ্রিস্টাইলে। যে যেভাবে পারে করে কেটে খাচ্ছে। এ বিশেষ
দিকগুলো চরম উপেক্ষা করায় জনস্বাস্থ্য দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে।

বাজারে যাবেন, ধবধবে সাদা চাল দেখে মুগ্ধ
হবেন। উঁচু দামে কিনে আনবেন। কিন্তু জানতেও পারবেন না পয়সা দিয়ে কী কিনে আনলেন।
দিনের পর দিন খোদ রাজধানীতে ইউরিয়ামিশ্রিত চাল, মুড়ি বিক্রি হচ্ছে প্রশাসনের
নাকের ডগায়।
শুধু চাল ধবধবেই নয়, সুগন্ধি চালও তৈরি করা হচ্ছে
কৃত্রিমভাবে। অপেক্ষাকৃত মোটা চাল ছেঁটে নানা প্রকার কেমিক্যাল ও কৃত্রিম সুগন্ধি
মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সুগন্ধি চাল। এ চাল খেলে মানুষ নানা রকম জটিল রোগে আক্রান্ত
হবে। পাকস্থলীতে,
ক্ষুদ্রান্তে, বৃহদান্তে ক্যানসার হওয়ার
আশঙ্কা আছে। এ ছাড়া কিডনি ও লিভার বিকল হয়ে যেতে পারে। বাজারে
মিনারেল ওয়াটারের নামে বিক্রি হচ্ছে ওয়াসার পাইপলাইনের পানি দিয়ে ভর্তি বোতলজাত
পানি। ওই পানির অধিকাংশই বিশুদ্ধ নয়। ফলে মিনারেল ওয়াটারের নামে মানুষ মূলত বিষ পান
করছে। পানির আরেক নাম জীবন। কিন্তু বোতলজাত এ দূষিত পানি পান করে মানুষ নানা
রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। বিএসটিআইয়ের আদেশ অনুসারে পানিসহ যেকোনো পণ্য
বাজারজাত করার আগে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ
মিনারেল ওয়াটার কোম্পানি তা মানছে না।
খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচিত হলেও এ
বিষয়ে আইন প্রয়োগে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। মাঝেমধ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা
করা হয়। যৎসামান্য জরিমানা করা হয়। ব্যস, ওই পর্যন্তই। কিছুদিন পরই আবার শুরু হয়
ভেজালের সমারোহ।
১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া এবং ভেজাল
খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত
তা প্রয়োগ করার কোনো নজির নেই। অথচ খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। খাদ্য ও ভোগ্য পণ্যের মান ও বাজার নিয়ন্ত্রণে সাতটি মন্ত্রণালয় কাজ করে। আমলাতান্ত্রিক
জটিলতার কারণে এখানে এক হযবরল অবস্থা বিরাজমান। কার কোন দায়িত্ব, কে কীভাবে
পালন করবে তা নিরূপণ করতেই বেলা বয়ে যায়।
আমাদের ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর আছে। ভোক্তা অধিকার আইনও
আছে। কিন্তু কোথাও এ আইনের তেমন প্রয়োগ হতে দেখা যায় না। মাঝেমধ্যে তাদের তৎপরতা
চোখে পড়লেও পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে আমাদের দেশে দুরারোগ্য রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
এর অন্যতম কারণ ভেজালমিশ্রিত খাবার। এজন্য ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার
কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর লোকজনও এ ভেজালযুক্ত
খাবারের বাইরে নন। কাজেই নিজেদের স্বার্থে হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে
সমন্বয় সাপেক্ষে ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করতে হবে।
রোগব্যাধি হলে ওষুধ খেয়ে জীবন রক্ষা করে মানুষ। কিন্তু সে
ওষুধেও ভেজাল। মানহীন ও ভেজাল ওষুধ খেয়ে রোগ সারার বদলে আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে
অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, দেশে ওষুধের উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত কোনো স্তরেই
সরকারি পরীক্ষাগারে মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতি
বছর ১২ হাজার আইটেম ওষুধ বাজারে আসছে। কিন্তু ঔষধ প্রশাসনের যে লোকবল ও যন্ত্রপাতি
রয়েছে তাতে তারা মাত্র সাড়ে ৩ হাজার আইটেম ওষুধের নমুনা পরীক্ষা করতে পারে। বাকি
৭০ শতাংশ ওষুধের মান যাচাইহীন অবস্থায় রয়ে যায়। বাজারে
যে ভিটামিন পাওয়া যায় তাতে ১৮টি খনিজ সম্পদ আছে বলে উল্লেখ করা হলেও এর ছিটেফোঁটাও
আছে কি না পরীক্ষার অভাবে জানা সম্ভব নয়। এমনকি ২০০৮ সালে রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের
তৈরি যে প্যারাসিটামল সিরাপ সেবন করে অনেক শিশু মৃত্যুবরণ করে, সেই প্যারাসিটামল
পরীক্ষার যন্ত্রপাতিও নেই ঔষধ প্রশাসনের। তখন এ নিয়ে তোলপাড় চললেও এখন পর্যন্ত পরীক্ষাগারের
একমাত্র গ্যাসক্রোমোটোগ্রাফি মেশিনটি নষ্ট।
ঔষধ প্রশাসন পরিদপ্তরকে ২০১০-এর ১৭ জানুয়ারি অধিদপ্তরে
রূপান্তর করা হয়। কিন্তু এর তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। নেই ওষুধের মান যাচাই ও
পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতিও। অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারে আলসারের ওষুধ, ডায়াবেটিস
নিয়ন্ত্রক ওষুধ ও ভিটামিন পরীক্ষা করা যায়। ক্যানসার, হরমোন
জাতীয় ওষুধ এবং স্টেরয়েড পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ
তৈরি ও বাজারজাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-হুর মতে, ওষুধ
উদ্ভাবনকারী ছাড়া বর্গনামে ওষুধ প্রস্তুত করাই হচ্ছে নকল ওষুধ। তৃতীয় বিশ্বের
প্রতিটি দেশেই বর্গনামে ওষুধ প্রস্তুত চলছে। ফলে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না।
অনেক কোম্পানি জেনেশুনে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে
জড়িত।
অথচ বাংলাদেশে ওষুধ একটি বিকাশমান শিল্প।
তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার এক করুণ চিত্র। অধিকাংশ হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়ার অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতি নেই। সেবাদানকারীরা সময়মতো কর্মক্ষেত্রে হাজির হন না। ডাক্তাররা গ্রামে যেতে চান না। ওষুধপত্রের সংকট। চিকিৎসা সরঞ্জামাদির অভাব। দেশের সার্বিক চিকিৎসাব্যবস্থাও আসলে ভালো নয়। ২ হাজার ৭৮৫ জনের জন্য ডাক্তার রয়েছেন মাত্র একজন। এটা কোনো অবস্থায়ই মেনে নেওয়া যায় না। এ ছাড়া চিকিৎসা এখন সেবা নয়, বাণিজ্য। যেখানে সেখানে গজিয়ে উঠছে হাসপাতাল-ক্লিনিক। ডাক্তাররা এখন সরকারি হাসপাতালে সময় দেওয়ার চেয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে অধিক মনোযোগী। এ অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন। লেখাটা শুরু করেছিলাম খাদ্যে ভেজাল নিয়ে। এরপর এলো মানহীন ও ভেজাল ওষুধের প্রসঙ্গ। এখন দেখা যাচ্ছে চিকিৎসা খাতেরও বেহাল দশা। তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যদি মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা না যায় তাহলে তা নিশ্চয় খুব পরিতাপের। দেশের মানুষ এখন অন্তত মোটা কাপড় পরে, মোটা ভাত খেয়ে, রোগে-শোকে চিকিৎসা পেয়ে বেঁচে থাকতে চায়। আর সেই বাঁচাটা যেন আক্ষরিক অর্থেই ভেজালমুক্ত হয়- সে নিশ্চয়তাও চায় তারা।