× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্পাদকীয়

নিশ্চিত হোক নিরাপদ ‘স্ট্রিট ফুড’

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৪ ০৯:৫৮ এএম

নিশ্চিত হোক নিরাপদ ‘স্ট্রিট ফুড’

‘কত কিছু খাই ভস্ম আর ছাই’ ডি এল রায়ের (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়) কাব্যগীতির এই স্বরলিপি কোন প্রেক্ষাপটে কবে লেখা হয়েছিল, তা অজানা হলেও আমাদের দেশে বিদ্যমান বাস্তবতায় তা এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বনই শুধু নয়, নিরাপদ খাদ্য মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য একেবারেই অপরিহার্য। কিন্তু খাদ্যে ভেজাল দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের বাস্তবতায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। ১০ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি এরই সাক্ষ্যবহ। স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার অর্থাৎ ফুটপাথের খাবার আমাদের সংস্কৃতি বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতের আমাদের নিকটতম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ করে কলকাতা শহরে স্ট্রিট ফুড অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। খাবারের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এমন নজির সেখানে বিরল বলা যায়। হাল আমলে আমাদের দেশে বিশেষ করে নগর-মহানগরে স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবারের প্রতি মানুষের ঝোঁক বেড়েছে। এর মুখ্যত কারণ, সুলভ মূল্যে একদিকে মিলছে মুখরোচক খাবার; অন্যদিকে এই খাবারের বহুমাত্রিকতা অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের জন্য তা কতটা নিরাপদ, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে বিস্তর।

বিএফএসএর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ফুটপাথে বিক্রি হয় এমন হরেক রকম পানীয়সহ মুখরোচক কয়েকটি খাবারে মাত্রাতিরিক্ত তিন ধরনের জীবাণুর সন্ধান মিলেছে। ই-কোলাই, এসপিপি ও ভিরিও এসপিপি এই জীবাণু ডায়েরিয়া ও পেটের পীড়াসহ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধির অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে বিএফএসএর গবেষণাটি পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড নিউট্রিশন অ্যান্ড এগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান ও তার সহযোগীরা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ করপোরেশনকে ৩৭টি অঞ্চলে ভাগ করে গবেষণাটি চলে। ওই ৩৭টি অঞ্চলে চটপটি, ছোলামুড়ি, স্যান্ডউইচ, আখের রস, অ্যালোভেরা শরবত ও মিক্সড সালাদের ওপর গবেষণা করা হয়। এ ৬টি খাদ্যপণ্যের ৪৫০টি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব স্ট্রিট ফুড খেয়ে অনেকেই ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে অসুস্থ হয়েছে। তা ছাড়া এ খাবার পণ্যগুলোর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দোকানের পরিবেশ এবং খাদ্যপণ্য বিক্রির প্রক্রিয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়।

স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলো নগর-মহানগরে সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো ঘিরে গড়ে উঠেছে। এই খাবারগুলো সুলভ মূল্যে কেনা যায় বিধায় শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের অনেকেই খেয়ে থাকে। এসব খাবারের বৈচিত্র্যও আছে বটে কিন্তু গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা দায়িত্বশীল নন, এ অভিযোগও আছে। দেশে নিরাপদ খাদ্যপণ্যের দাবিতে ইতোমধ্যে জনস্বার্থে সরকারের তরফে অভিযান যেমন কম পরিচালিত হয়নি, তেমনি সংবাদমাধ্যমও এ ব্যাপারে কম ভূমিকা পালন করেনি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষেরই গাফিলতি রয়েছে। আমরা স্ট্রিট ফুড কিংবা রাস্তার খাবারের দোকানগুলোর ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করি না কিন্তু ভেজালহীন কিংবা মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করার তাগিদ অবশ্যই দিই। কারণ নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। আমাদের স্মরণে আছে, ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস ২০২২’ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে বলেছিলেন, ‘মানুষের এ অধিকার পূরণকল্পে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এবং খাদ্য উৎপাদন ও পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করছে।’ কার্যক্ষেত্রেও আমরা তা-ই দেখছি। কিন্তু ভেজাল ও দূষণমুক্ত নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির জন্য ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ প্রণিত হলেও এ আইনের সুফল আমরা পুরোমাত্রায় ভোগ করতে পারছি না বিএফএসএর গবেষণা এ সাক্ষ্য দিচ্ছে। আমরা দেখছি, শিশুখাদ্যও ভেজালমুক্ত নয়। এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধও ভেজালমুক্ত রাখা যাচ্ছে না। আমরা আরও জানি, কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকাতে গিয়ে এবং পচন থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে নানা রকম প্রক্রিয়া অনেক ব্যবসায়ীই করে থাকেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিমুক্ত নয়।

বস্তুত বাজার তদারকির দায়িত্ব যথাযথভাবে না হওয়ায় একশ্রেণির ব্যবসায়ী নিজেদের লাভালাভের অঙ্ক কষে জনস্বাস্থ্যের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও ছিনিমিনি খেলার সুযোগ নেন। নিকট অতীতে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বলেছিলাম, খাদ্যপণ্যে ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য দেখে বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা দায়িত্বশীলদের দায়বদ্ধতা-স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য আমরা সুশাসনের তাগিদও দিয়েছিলাম। বলা বাঞ্ছনীয়, সুস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ খাদ্যপণ্যের কোনো বিকল্প নেই। সম্প্রতি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রতি দশজনের একজন খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। ভেজাল ও দূষিত খাবার যে শুধু জনস্বাস্থ্যেরই হানি ঘটায় তা-ই নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বিনষ্ট করে। প্রকৃতপক্ষে খাদ্যপণ্যে যখন ভেজাল দেওয়া হয় কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রি করা হয়, তখন সরাসরি হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আগেই বলেছি, নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে নাগরিকের অধিকার। যে কোনো সভ্য কিংবা মানবিক সমাজ এ বিষয়ে আপসহীন হলেও আমাদের মতো উন্নয়নশীল কিংবা অনুন্নত অনেক দেশেই যেহেতু মানবতার সংকট বিরাজমান সেহেতু সাধারণ মানুষও নিরাপদ খাদ্যপণ্য থেকে বঞ্চিত।

এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আসে। আমরা বিশ্বাস করি, নীতিমান যেকোনো ব্যবসায়ী হোন তিনি অভিজাত রেস্তোরাঁর মালিক কিংবা রাস্তার খাবারের ব্যবসায়ী তাদের পক্ষে কোনোভাবেই জনস্বাস্থ্যের জন্য হিতকর নয় তারা এমন কোনো কাজ গর্হিত মনে করেন এই বিশ্বাস আমাদের রয়েছে। স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবারের দোকান শুধু জীবনযাত্রার ক্ষেত্রেই সহায়ক ভূমিকা পালন করছে না অর্থনীতিতেও কমবেশি ভূমিকা রাখছে। জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। আমরা দেখছি হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি বিকলাঙ্গসহ আরও কিছু জীবনঝুঁকির ব্যাধির মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এর পেছনে অনিরাপদ খাদ্যপণ্য দায়ী। আমরা মনে করি, অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রত্যয় ধারণ করে সবাইকে কাজ করতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে মানসিকতায়। বাজারে নজরদারি-তদারকি বাড়াতে হবে একই সঙ্গে ভেজাল খাদ্যপণ্যের অভিশাপ মোচনে সরকারকে কঠোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশে যে আইন রয়েছে এর প্রতিপালনে দায়িত্বশীলদের নিষ্ঠও হতে হবে। তবে আমরা বিশ্বাস করি, শাণিত নীতি-নৈতিকতা এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য খাদ্যপণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বিপণন প্রতিটি পর্যায়েই সচেতনতাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা