ভূরাজনীতি
ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৪ ০৯:৫৬ এএম
ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ
সম্প্রতি ১৪ দলের
এক সমন্বয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের পার্বত্য
চট্টগ্রাম এবং প্রতিবেশী মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে পূর্ব তিমুরের মতো একটি খ্রিস্টান
রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা চলছে।’ তার কথার সারমর্ম, বঙ্গোপসাগরে একটি শক্তিশালী দেশ তাদের
সামরিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের
পরিকল্পনায় রয়েছে। এমন বক্তব্য দিয়ে সাহসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের বর্তমান
পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এবং তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে কিছু আশঙ্কা ও সম্ভাবনার
দিকে ইঙ্গিত করেছেন এবং কিছু রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। স্বল্পপরিসরে ও সীমিত শব্দে
এ কথাগুলো উচ্চারিত হলেও তার ব্যাপ্তি ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে।

প্রধানমন্ত্রীর
আশঙ্কা একটি মহল বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে দুই দেশের সীমান্ত
এলাকায় পূর্ব তিমুরের মতো একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর পরিকল্পনা করছে। বাংলাদেশ
মুসলমান অধ্যুষিত। প্রতিবেশী মিয়ামনমারের আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গাদের অধিকাংশও মুসলমান।
অন্যদিকে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনের পার্বত্য অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা
ব্যাপক সংখ্যায় বসবাস করছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে দুটি দেশের খণ্ডিত অংশ নিয়ে খ্রিস্টান
রাষ্ট্র যে পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে, তা সহজেই
অনুমেয়। আর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতেই নিজের উদ্দেশ্য হাসিল
করে স্বার্থান্বেষী মহল। এ ছাড়া এ অঞ্চলে ভারতের মিজোরাম রাজ্যে রয়েছে বেশ কিছু ইহুদি
পরিবার। ইহুদিদের একটি বড় অংশ ১৯৪৭ সালে মুসলমান ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে
ভারত ও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের উদ্ভবের ফলে এ উপমহাদেশ ছেড়ে ইসরায়েল চলে যায়। তাদের
বংশধরদের অনেকেই আবার ফিরে আসতে চায় এ অঞ্চলে। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে পারস্পরিক
বোঝাপড়া বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত। তাই এমন খ্রিস্টান
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি অশনিসংকেত।
দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ায় খ্রিস্টান অধ্যুষিত দুটি দেশ হলো পূর্ব তিমুর ও ফিলিপাইন।
পূর্ব তিমুর অঞ্চলটি
১৯৭৫ সাল পর্যন্ত পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিল। এরপর ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ২৩ বছর এ
অঞ্চল শাসন করেছে মুসলমানপ্রধান ইন্দোনেশিয়া। ১৯৯৯ সালে শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা।
এরপর ১৯৯৯ সালের ৩০ আগস্ট জাতিসংঘের অধীনে পরিচালিত গণভোটে অধিকাংশ তিমুরবাসী ইন্দোনেশিয়ার
শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। এ ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালের ১৪
এপ্রিল প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয় পূর্ব তিমুরে। স্বাধীনতার পর পূর্ব
তিমুরের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক চুক্তি সম্পাদন করে যুক্তরাষ্ট্র, যার শিরোনাম
‘স্ট্যাটাস অব ফোর্সেস অ্যাগ্রিমেন্ট (এসওএফএ)’। এ ছাড়া ইউএস সাপোর্ট গ্রুপ ফর ইস্ট
তিমুর (ইউএসএসজিই) নামে একটি কর্মসূচির অধীনে মার্কিন সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা
নানা প্রকার সামরিক, মানবিক ও উন্নয়নমূলক কাজে ইস্ট তিমুরের নিজস্ব সেনাবাহিনীর সঙ্গে
যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান প্রায় নিয়মিত
যাতায়াত করে পূর্ব তিমুরে। এর মধ্যে ২০০২ সালের ২৩ আগস্ট পূর্ব তিমুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
প্রণীত আর্টিকেল ৯৮ স্বাক্ষর করে, যার আলোকে মার্কিন সেনা বা সরকারি কর্মকর্তারা পূর্ব
তিমরে মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মানবতাবিরোধী অপরাধ করলেও পূর্ব তিমুর আন্তর্জাতিক আদালতে
তার জন্য বিচার দাবি করবে না মর্মে অঙ্গীকার প্রদান করে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা বাংলাদেশ সীমান্তে একটি মহল পূর্ব তিমুরের মতো রাষ্ট্র বানাতে চায় বলার কারণে
অনুমান করা যায় যে, এ অঞ্চলে আসলে কে কী চায়।
বিশ্বের বৃহত্তম
রূপে স্বীকৃত প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমে চীন অবস্থিত।
বর্তমানে বিশ্বমোড়লের প্রশ্নে এ দুটি দেশের দ্বৈরথ আলোচিত হচ্ছে সব মহলে। নিজস্ব অর্থনৈতিক
ও সামরিক শক্তির ওপর ভর করে চীন বর্তমানে পৃথিবীময় নিজের প্রভাব বিস্তারে অগ্রসরমান
এবং অনেক ক্ষেত্রেই সফল।
‘রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামক উদ্যোগের মধ্য
দিয়ে প্রায় অর্ধেক পৃথিবীর সঙ্গে সড়ক ও রেল পথে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে
চলেছে চীন। অন্যদিকে সমুদ্রপথে নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশে বন্দর ও সংযোগসড়ক
নির্মাণের পরিকল্পনা আগামীতে চীনকে বাড়তি শক্তি জোগাবে। প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন
আধিপত্য থাকলে বা যুদ্ধ চলাকালে চীনের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার নৌ অবরোধ সৃষ্টি হলে চীন
সমুদ্রপথে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ফলে সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি
জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের স্বার্থে চীন সমুদ্রতীরবর্তী অন্যান্য দেশের
বন্দর ব্যবহারের লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে চীনের
প্রাথমিক নজর ভারত মহাসাগর-তীরবর্তী পাকিস্তানের গোয়াদার ও করাচি বন্দর এবং মিয়ানমারের
কাইয়াউকফাইয়ু ও সিতওয়ে বন্দরের ওপর। এসব বন্দর থেকে সড়কপথে চীনের ভূখণ্ডে যাওয়ার
সুযোগ রয়েছে। মিয়ানমারের সমুদ্রবন্দর থেকে নিজ দেশের সীমান্ত পর্যন্ত তেল ও গ্যাস
সঞ্চালন লাইনও নির্মাণ করেছে চীন। চীনের এ অগ্রযাত্রা যেকোন মূল্যে রুখতে চায় মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্র। তারই অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছে চীনবিরোধী কোয়ার্ড বা চার দেশের সংগঠন।
ভবিষ্যতে এ সংগঠন আরও সম্প্রসারিত করে চীনের বিরুদ্ধে একটি মোর্চা গঠনের চিন্তাভাবনাও
রয়েছে এ চারটি দেশের, যেখানে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা চালানোর যৌক্তিক কারণ
রয়েছে।
২০২২ সালে মার্কিন
সিনেটে পাস হয়েছে ‘বার্মা উনিফায়েড থ্রু রিগোরাস মিলিটারি অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যাক্ট
অব ২০২২ (বার্মা অ্যাক্ট অব ২০২২)’। চায়না সমর্থিত মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে চাপে
রাখতেই আইন প্রণীত হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ভারত মহাসাগর অঞ্চলের
দেশগুলো এক সুতায় গাঁথতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে ইন্দো প্যাসিফিক কৌশল। এতকি
ছুর পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তির সার্বক্ষণিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে
চায় সার্বিকভাবে ভারত মহাসাগরে এবং সুনির্দিষ্টভাবে বঙ্গোপসাগরের জলভাগে ও বাংলাদেশ,
মিয়ানমার, ভারত- এ তিন দেশের স্থলসীমান্তে বা ট্রায়াঙ্গেলে। বিশেষত চীন থেকে বাংলাদেশের
সাবমেরিন সংগ্রহ এবং চীনের সহায়তায় কক্সবাজারের পেকুয়ায় সাবমেরিন ঘাঁটি নির্মাণ
নিঃসন্দেহে ভারতীয় ও মার্কিনিদের চিন্তায় ফেলেছে। এত দিন বিষয়টি লুকোচুরির মধ্যে
থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না থাকলেও মার্কিনিরাই
যে এ অঞ্চলে নতুন খ্রিস্টান দেশ বানাতে ও সামরিক ঘাঁটি গড়তে চায়, তা সহজেই অনুমেয়।
পর্যটনের জন্য
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ যেমন আকর্ষণীয়, সামরিক গুরুত্বের বিচারে তথা রণকৌশলগত দিক থেকেও
সেন্ট মার্টিনের অবস্থান অনন্য উচ্চতায়। সেন্ট মার্টিনে জনসংখ্যা কম থাকায় সেখানে
সামরিক ঘাঁটি গড়তে জনপদ উচ্ছেদ করতে হবে না বা জনবসতির তেমন ক্ষতি হবে না। চারদিকে
পানি থাকায় কোনো শত্রু স্থলপথে সেন্ট মার্টিন আক্রমণ করতে পারবে না। আবার চারদিকে
সমুদ্র থাকায় ভবিষ্যতে রানওয়ে নির্মাণ করে এবং বাতাসের গতি ও বায়ুপ্রবাহের দিক বিবেচনা
করে সহজেই সামরিক বিমানগুলো ওঠানামা করতে পারবে এ দ্বীপটিতে। সমুদ্রের গভীরতা থাকায়
নানা আকৃতির যুদ্ধজাহাজও নোঙর করতে পারবে সেন্ট মার্টিনের কাছে। সেন্ট মার্টিন থেকে
যদি উত্তর দিকে চীনের ভূখণ্ডে মিসাইল নিক্ষেপ করা হয় আর পুব দিকের প্রশান্ত মহাসাগরে
থাকা যুদ্ধজাহাজ থেকে একই সময় যদি চীনের ওপর আক্রমণ চালানো হয়, তবে সামরিক বিচারে
তা চীনের জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে বিবেচিত হবে। কারণ চীনকে লড়তে হবে দুটি ফ্রন্টে।
একইভাবে ভারত, মিয়ানমার এমনকি উত্তর কোরিয়াকে ঘায়েল করতে গেলেও সেন্ট মার্টিনে থাকা
মিসাইলের মজুদ একটি বড় ফ্যাক্টর বলে বিবেচিত হবে। সার্বিক বিচারে বলা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চাওয়া দূরবর্তী যেকোনো দেশের জন্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে
নিজের অধীনে রাখার স্বপ্ন, চাহিদা ও চক্রান্ত থাকা স্বাভাবিক। এ ব্যাপারে আমাদের অধিকতর
সতর্কতার বিকল্প নেই।
নির্ভীক প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা স্থলে খ্রিস্টান রাষ্ট্র ও জলে সামরিক ঘাঁটি বানানোর চক্রান্তের পাশাপাশি
গণতন্ত্র আস্তাকুঁড়ে ফেলার নীলনকশার কথাও প্রকাশ করেছেন। দেশে গণতন্ত্র বিঘ্নিত হলে
যারা অবরোধের হুমকি দেন, তারা সবাই সাদা চামড়ার। প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, সাদা চামড়ার একজন
বিগত নির্বাচনের আগে এমন কথাও বলেছেন, সামরিক ঘাঁটি বানানোর বিষয়ে একমত হলে তার দেশ
পরবর্তী নির্বাচনে শেখ হাসিনার ঝুঁকিমুক্ত জয় নিশ্চিত করবে এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বা মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করবে না। এর প্রমাণ আমরা
দেখেছি পাকিস্তানে। ইমরান খানকে বন্দি রেখে করা নির্বাচন প্রশবিদ্ধ নয় বলে উল্টো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ
ও অংশগ্রহণমূলক বলে রায় দিয়েছে সাদা চামড়ার গণতন্ত্রসেবীরা। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আজ সুকান্তের
কথা মনে পড়ে–‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী/অবাক তাকিয়ে রয়:/জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/তবু
মাথা নোয়াবার নয়।’