× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জননিরাপত্তা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বহুমাত্রিক সঙ্কট প্রকট হচ্ছে

মোহাম্মদ আলী শিকদার

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৪ ০৯:২৯ এএম

মোহাম্মদ আলী শিকদার

মোহাম্মদ আলী শিকদার

বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলে নানা কারণে শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। শরণার্থী সমস্যা দেখা দিলে অভ্যন্তরীণ সংকট যেমন বাড়ে, তেমনি নিরাপত্তা সংকটও দেখা দেয়। ১ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩১ মে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের নিয়ে আশঙ্কার আলামত দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিশেষত ক্যাম্পের ভেতরে অস্থিরতার কারণে এই জায়গাটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি হয়ে উঠতে পারে। বাড়তে পারে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানিও। স্থানীয় বাংলাদেশিদের উদার সমর্থন এবং বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে বহুজাতিক সহায়তা প্রচেষ্টার কারণে রোহিঙ্গাবিষয়ক মানবিক সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প স্থাপনের পর থেকেই নানামুখী সমস্যা দেখা দিতে শুরু করেরোহিঙ্গা ক্যাম্পে যারা সংগঠক তাদের অনেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে অভ্যন্তরীণভাবে চাপ তৈরি করতেন। কিন্তু বিপথগামীরা বিভিন্ন সময়ে তাদের হত্যা করার পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ের সংগঠক বা কাজ করার মানুষ কমে গিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের সংগঠিত করার কাজে নিয়োজিতরা হত্যা ও হামলার শিকার হওয়ায় আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো আশ্রয় নিয়েছে, এমন অভিযোগও নতুন নয়। সংগত কারণেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমতের অবকাশ নেই। দিনদিন অস্থির হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। কক্সবাজারে ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন কয়েক দিন পরপরই। ক্যাম্পে বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, অপহরণের মতো ঘটনা। রোহিঙ্গাদের মধ্যে গ্রুপে-গ্রুপে গোলাগুলি, আধিপত্য বিস্তার, মাদক, অস্ত্রসহ নানা সহিংসতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যারা রয়েছেন তারা এমন এক নিপীড়িত-অধিকারবঞ্চিত জাতি- যারা বিভিন্নভাবে হতাশার মধ্যে থাকেন। এর ফলে সাধারণ বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিবাদ তৈরি হয়। রোহিঙ্গারা এমন একটি জাতিগোষ্ঠী, যাদের কোনো রাষ্ট্র নেই। তাদের নেই কোনো নাগরিকত্ব। এখন পর্যন্ত কোনো দেশ তাদের আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি। কোনো জাতি যখন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে চাপের মধ্যে থাকে; তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেছেমূলত রোহিঙ্গা তরুণদের মধ্যে একধরনের হতাশাবোধ জন্মেছে।

আইনত তাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো কাজে যেহেতু যুক্ত হওয়ার সুযোগ কম, তাই তারা নানা ধরনের অপরধে যুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। এই সুযোগটি দেশের একটি অশুভ মহল নিচ্ছে, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কক্সবাজার অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ এবং ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’-এর মাঝে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশের উল্লিখিত এলাকা অস্ত্র, মাদক ও মানব পাচারের একটা আদর্শ রুট। এই অঞ্চল ক্ষুদ্রাস্ত্র পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চক্র প্রান্তিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মাদক ও ক্ষুদ্রাস্ত্র পাচারের বাহক হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অনেক পরিবারে কোনো পুরুষ সদস্য নেই। এসব পরিবারের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। বহুদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী গোষ্ঠীর অপতৎপরতার ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্প নানাবিধ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে, স্থানীয় মাদকচক্র এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর শক্তি সঞ্চয়ের ফলে মাদক ও অস্ত্র আরও সহজলভ্য হয়ে উঠবে, যা নিরাপত্তাকে আরও হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে আছে এইডস আক্রান্ত মানুষও। তদুপরি, আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বিভিন্ন মানবিক নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, জীবিকার নিরাপত্তা এবং মানব পাচারসংক্রান্ত নিরাপত্তার ঝুঁকি প্রধান। রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশে শুধু যে নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে তা নয়, বেড়েছে অর্থনৈতিক ব্যয় ও অন্য ঝুঁকিও। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে (মিয়ানমার) নিরাপদ প্রত্যাবাসনে জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহে অস্ত্র ও মাদকের অনুপ্রবেশের পাশাপাশি মানব পাচার, যৌন ব্যবসা এবং রোহিঙ্গা-স্থানীয়দের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয় ক্রমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পুষ্টি ও সুরক্ষাসহ মৌলিক নিরাপত্তা সেবাগুলোতে ক্রমেই চাপ পড়ছেশরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ায় বনাঞ্চল উজাড়ের মাধ্যমে সামাজিক ও পরিবেশগত বিপদ তীব্রতর হচ্ছে। রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য শুধু নিরাপত্তা সংকটই তীব্র করছে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অর্থনৈতিক ঝুঁকিও। রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশে শুধু যে নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়েছে তা নয়, বেড়েছে অর্থনৈতিক ব্যয় ও অন্য ঝুঁকি।

২০২১ সালে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের হিসাবে দেখা গেছে, ১০ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গার জন্য মোট সহায়তা প্রয়োজন ছিল ৯৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২৬৯ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি ছিল। অর্থাৎ ২০২১ সালে রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণে যে পরিমাণ সহায়তার প্রয়োজন ছিল, দাতাদের (বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা) কাছ থেকে তার থেকে ২৬৯ মিলিয়ন ডলার কম সহায়তা মেলে। প্রতিবছরই এমন ঘাটতি রয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আমরা জানি, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি নানা ঘাত-প্রতিঘাতে ক্রমেই স্থবির হয়ে পড়ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমেই কমতে শুরু করেছে। এমন সময়ে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা ও শরণার্থী সুবিধা দেওয়ার জন্য যে খরচ তা বহন করতে গেলে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ছোট-বড় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দলগত সন্ত্রাসী তৎপরতা বাড়ছে। চাঁদাবাজি, অপহরণ বাণিজ্য ও দোকান দখল থেকে শুরু করে তুচ্ছ ঘটনায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। গত ৪ বছরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে শতাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সন্ত্রাসীদের দমন ও ক্যাম্পগুলো শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যৌথ অভিযান শুরু করা হলেও সংঘর্ষ থেমে নেই। অভিযোগ আছে, পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীসহ সমতলের অনেক সন্ত্রাসী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। যখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো অভিযান পরিচালনা করতে চায়, তখন এই সন্ত্রাসীরা দুর্গম জঙ্গলের পাহাড়ি আস্তানায় অবস্থান করে। সন্ত্রাসী দলের অস্ত্রের মহড়ায় খুন-জখম, মাদকব্যবসা, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, অপহরণ, দোকান বাণিজ্য এবং আধিপত্য বিস্তারের সন্ত্রস্ত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে প্রায়ই।

স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, সমুদ্র, উপকূল, সীমান্ত-পাহাড়ি জনপদ দিয়ে অস্ত্র আসছে। পাশাপাশি অস্ত্র তৈরির কারিগর এনে ক্যাম্পসংলগ্ন পাহাড়ি জনপদে অস্ত্র তৈরি করছে সন্ত্রাসীরা। সীমান্তের সব রুট দিয়ে মাদক চালানের সঙ্গে অস্ত্রও ঢুকছে। চলছে অপহরণ ও মানব পাচার। রোহিঙ্গাদের নিয়ে এসব শঙ্কা বহু আগে থেকেই ছিল। দীর্ঘদিনে তা বিস্তৃত হয়েছে। এ বিষয়গুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবনায় রয়েছে। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় এখনও জুতসই কৌশল গড়ে তোলা যায়নি। এ বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। মিয়ানমার একটি অস্থিতিশীল দেশ। দেশটিতে বিরাজ করছে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি দেশটির ক্ষমতাসীন জান্তা সরকার বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর যুদ্ধ চলমান রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংকটের মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশ এ বিষয়ে কূটনৈতিক তোড়জোড় চালাচ্ছে বটে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্বের অনেক দেশে এবার নির্বাচনী আয়োজন চলমান। অনেক দেশ তাদের নির্বাচনের প্রস্তুতিও সারছে। ফলে নানা কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারছে না। তবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে নিরাপত্তা সংকট বহু আগে থেকেই ছিল।

আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কারণে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। যেহেতু এই মুহূর্তে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো অগ্রগতি নেই, তাই ক্যাম্প স্থানান্তরে কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধে এখনও একটি অশুভ মহল সক্রিয়Ñ এমন অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কক্সবাজার-টেকনাফে এই প্রেক্ষাপটে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি। রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যারা অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে তাদের বিষয়ে খতিয়ে দেখা জরুরি। আপাতত বাংলাদেশকে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে স্বতন্ত্র কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। নয়তো দিনে দিনে বাড়বে সংকট, যা আমাদের জন্য অধিকতর হুমকির দীর্ঘমেয়াদী কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

  • অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা