ফিলিস্তিন সঙ্কট
ইয়োসি মেকেলবার্গ
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৪ ০৯:২৬ এএম
ইয়োসি মেকেলবার্গ
আন্তর্জাতিক অপরাধ
আদালতের (আইসিসির) প্রধান বিচারপতি করিম খান ইসরায়েল ও হামাসের নেতাদের ওপর গ্রেপ্তারি
পরোয়ানা জারির পাশাপাশি গাজায় দীর্ঘমেয়াদি আগ্রাসন বন্ধের কথা জানান। ইসরায়েল যেন আইসিসির
হুঁশিয়ারির কোনো তোয়াক্কাই করছে না। পরে ইসরায়েল ‘সীমিত অভিযান’-এর নামে রাফায় ভয়াবহ
ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। রাফার সাধারণ মানুষের ওপর চালানো ধ্বংসযজ্ঞ এখনও চালু রয়েছে। অন্য
যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার কিছুটা ব্যতিক্রম। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সেনা পরিচালিত
হামলার দায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে
এজন্য তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করেননি। ঘটনাটিকে ‘মর্মন্তুদ দুর্ঘটনা’ বলেই অভিহিত করার
বিষয়ে তার ঝোঁক বেশি। এত দিনে নেতানিয়াহুর এসব বোলচালের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়
অনেকাংশেই রুষ্ট হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় তাদের মনোযোগে ব্যাপক ঘাটতি
রয়েছে- এমনটি স্পষ্ট।

পরিস্থিতির এখনও
কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটেনি। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক সদস্য জানিয়েছেন, রাফায় তারা
আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেই অভিযান চালিয়েছে। অর্থাৎ এই যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ এখনও
দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালু রয়েছে। সম্প্রতি ইসরায়েলের
ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার যাচি হানেগবি বলেন, ‘আমরা আরও সাত মাস যুদ্ধের প্রস্তুতি
মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজিয়ে চলেছি। হামাসের প্রশাসনিক ও সামরিক সক্ষমতা বন্ধের আগ
পর্যন্ত আমাদের এই যুদ্ধ চালু থাকবে।’ অর্থাৎ ইসরায়েল গাজায় নারকীয় তাণ্ডব চালু রাখবে
আগামী মাসগুলোতেও।
রাফায় ইসরায়েলি
সামরিক বাহিনীর অভিযানকে আলাদা আলাদা ঘটনা বলে অভিহিত করার সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে আইসিজিতে
দক্ষিণ আফ্রিকার আবেদনে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গাজায় যুদ্ধ বন্ধের এই আবেদন অবশ্য
এখনও বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ নেই। গাজা যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রস্তাবনা
দিলেও নেতানিয়াহু তাকে অনেকাংশে নাকচ করে দিয়েছেন। তার দলের রক্ষণশীল নেতারাই বরং চাপ
দিচ্ছেন। তারা যুদ্ধ প্রলম্বিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাই পরিস্থিতি অনেকটা জটিলতার
দিকে এগোচ্ছে। এই যুদ্ধ বন্ধে তাদের এখনও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। বরং যুদ্ধকে আরও
গতিশীল করার প্রস্তুতি তারা নানাভাবে সম্পন্ন করেছে।
অবশ্য আইসিজি
এখনও ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধে কোনো নির্দেশনা দেননি। বরং তারা গণহত্যা বন্ধে যা কিছু
করণীয় তা নেওয়ার আদেশ দিয়েছে মাত্র। গাজায় ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষের জীবনে বড় কোনো
পরিবর্তন এখনও আসেনি। অনেকেই তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছেন। অনেকে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ
করেছেন। নিজেদের যা কিছু ছিল তার সবটুকুই হারিয়ে ফেলেছেন। তবে আইসিসি সম্প্রতি যাদের
বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন, তাদের বিচারের আওতায় আনার বিষয়টি একেবারে
বন্ধÑ এমনটিও বলা যাবে না। ইসরায়েল প্রশাসন পুরোপুরি ধ্বংসের পথে হাঁটছে।
গাজায় তাদের অভিযানের
বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলেই তাকে এন্টিসেমিটিজম অভিধা দেওয়া হচ্ছে। তাদের এই দৃষ্টিকোণের
কারণে নেতানিয়াহু আর তার অনুসারীরা যেকোনো অভিযোগকে পাত্তা না দেওয়ার প্রবণতায় ভুগছে।
বাস্তবে ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে যত দিন সহযোগিতা করবে, তত দিন পর্যন্ত দেশটি এই যুদ্ধের
ভয়াবহতা থেকে পিছু হটবে নাÑ এটুকু নিশ্চিত। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট
অনেকের বিরুদ্ধেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক মনোভাবও এরই প্রমাণ। যুদ্ধবিরতির
বিষয়ে ইসরায়েলি সেনারা সবসময় অনমনীয় অবস্থানে থাকবেÑ এমনটি প্রায় নিশ্চিত।
সম্ভবত আন্তর্জাতিক
অপরাধ আদালতের প্রধান বিচারপতি শুধু হামাস ও ইসরায়েলের নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি
পরোয়ানার আবেদন করে কৌশলগত ভুল করেছেন। মানবিক বিপর্যয়ের অভিযোগ এনে তাদের বিরুদ্ধে
কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পথে হাঁটলে এই সংকট থেকে অনেকাংশে দূরে থাকা যেত। মূলত
হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলকে একীভূত করার কাজটিই তাদের ভুল হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ হামাসকে
সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। এই সংগঠনকে সার্বভৌমত্ব থাকা একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে
গুলিয়ে ফেলা তাদের ভুল হয়েছে। বাইরে থেকে যা-ই মনে হোক না কেন, ইসরায়েল প্রশাসন এ মুহূর্তে
বড় চাপের মুখে রয়েছে। মনে রাখা জরুরি, অতীতেও ইসরায়েলের বিচার বিভাগ এমন বিপর্যয় থেকে
নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছে।
আন্তর্জাতিক আইন
অনুযায়ী ইসরায়েলের কেউই অবশ্য এমন বিপর্যয় থেকে মুক্ত
হতে পারেনি। আইসিসি এবং আইসিজির নেওয়া সিদ্ধান্ত যে এই যুদ্ধ বন্ধে তেমন প্রভাব ফেলবে
না, তা অনেকটাই স্পষ্ট। তবে সম্প্রতি গোটা বিশ্বে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গর্জে
উঠতে শুরু করেছে। এমন সময়ে তাদের কৃতকর্মের বৈধতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উত্থাপিত হবে।
এই বৈধতার প্রশ্ন ফিলিস্তিনি এবং গাজা যুদ্ধের বাকপরিধি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলবে।
ইসরায়েল অবশ্য দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক আইন সব দেশকে সমান সুযোগ দিচ্ছে না। তবে এ কথাও
মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক আইনের নানা সুযোগ-সুবিধা তারা এত দিন ধরে ভোগ করছে। সচেতন
যে কারও প্রত্যাশা, এই সময় অবলম্বন করে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে
সম্পন্ন হবে।
বিশেষত ইসরায়েলের নেতাদের রক্ষণশীল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থাও নেওয়া
হবে। ইসরায়েলের জন্য আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে যুদ্ধবিষয়ক সমাধানে পৌঁছতে হবে। যদিও
একটি রাষ্ট্রের জন্য কাজটি কঠিন। একটি রাষ্ট্রের যেকোনো কাজের খতিয়ান খুঁজে বের করা
এবং এর বিরুদ্ধে গোটা দেশকে বিচারের আওতায় আনাও কঠিন একটি কাজ। ইসরায়েলের সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর
ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ইসরায়েলের একপেশে সিদ্ধান্ত
এখন যে কারও মনোযোগ আকর্ষণ করবে।
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন