প্রেক্ষাপট
মো. খসরু চৌধুরী
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৪ ১৩:৪০ পিএম
১৯৭১ সালে মহান
মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে পেয়েছি এ দেশ। তবে বাঙালির স্বাধীনতার
যুদ্ধ শুরু হয়েছে অনেক আগে। ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন,
১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবিÑসবই বাঙালির শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার একেকটি ধাপ। ৭ জুন ছিল ঐতিহাসিক
ছয় দফা দিবস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত বাঙালি জাতির মুক্তিসনদ
ছয় দফার পক্ষে দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলনের সূচনার দিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বাংলার
স্বাধিকার আন্দোলন স্পষ্টত নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়। এর মধ্য দিয়ে রচিত হয় স্বাধীনতার
রূপরেখা। ছয় দফা ভিত্তিক আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন
স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়, যা হয়ে আছে ইতিহাসের অক্ষয় অধ্যায়।

দুঃশাসন থেকে
মুক্তির দিশারিরূপে ছয় দফা প্রণয়ন করে জনগণের সামনে বাংলার মানুষের মুক্তিসনদ হিসেবে
উপস্থাপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এর মধ্য দিয়েই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামে
রূপ নেয়। ছয় দফা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ১১ দফা আন্দোলন,
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ
বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের
৫ ফেব্রুয়ারি তাশখন্দ চুক্তি কেন্দ্র করে লাহোরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের সাবজেক্ট কমিটিতে
ছয় দফা উত্থাপন করেন এবং পর দিন সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে ছয় দফাকে স্থান দিতে সংশ্লিষ্টদের
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন। সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধ উপেক্ষা করে ছয় দফার
প্রতি আয়োজক পক্ষ গুরুত্ব না দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ওই
সম্মেলনে আর যোগ দেননি। তবে লাহোরে অবস্থানকালেই ছয় দফা উত্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু। এর
মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের খবরের কাগজে বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আখ্যা
দিয়ে সংবাদ ছাপানো হয়। পরে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে ১৩ মার্চ ছয় দফা এবং অন্যান্য বিস্তারিত
কর্মসূচি দলের কার্যনির্বাহী সংসদে পাস করিয়ে নেন।
ছয় দফা আদায়ের
লক্ষ্যে শুরু হয় আওয়ামী লীগের আন্দোলন। হরতালও ডাকা হয়। হরতাল চলাকালে নিরস্ত্র জনতার
ওপর পুলিশ ও তৎকালীন ইপিআর গুলিবর্ষণ করে। এতে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে মনু মিয়া, সফিক,
শামসুল হকসহ ১১ জন শহীদ হন। ক্রমেই ছয় দফার প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়। জনপ্রিয়তা
বেড়ে যায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের। বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে সামরিক জান্তা আইয়ুব
খানের নেতৃত্বাধীন স্বৈরাচারী সরকার ১৯৬৬ সালের ৮ মে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে
পাঠায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলন ১৯৬৬ সালের ৭
জুন নতুন মাত্রা পায়।
ছয় দফা ভিত্তিক
১১ দফা আন্দোলনের পথপরিক্রমায় শুরু হয় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। সর্বোপরি ১৯৭০-এর সাধারণ
নির্বাচনে বাংলার মানুষ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের একচেটিয়া রায় প্রদান করে। জনগণ
বিজয়ী করলেও স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসকরা বিজয়ী দলকে সরকার গঠন করতে না দিলে বঙ্গবন্ধু
জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলন শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর
নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।
বাংলাদেশের ইতিহাসে
৭ জুন এক অবিস্মরণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলন ১৯৬৬ সালের ৭ জুন নতুন মাত্রা পায়।
সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক
অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার বদ্ধপরিকর।