বাজেট পর্যবেক্ষণ
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৪ ১৪:৪৩ পিএম
৬ জুন বেলা ৩টায় জাতীয়
সংসদে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছেন
অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। প্রস্তাবিত বাজেটের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী
জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন সহজ করবে এই বাজেট। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যের শিরোনাম ‘সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার’। তবে সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে এই বাজেট কতটা
বাস্তবিক হবে, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জিডিপির অনুপাতে ঘাটতি কমিয়ে
আনা হচ্ছে। এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকট। সঙ্গে রয়েছে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আয়ের চ্যালেঞ্জ। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার নিয়ে অভিযোগের কিছু নেই। বরং বাজেটের আকারটি বাস্তবসম্মত
হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা ছিল, রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বাজেটের আকার বড় করা
হবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ কমছে।
আগামী অর্থবছর চার হাজার ৪০০ কোটি টাকা অনুদান পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার
৫০০ কোটি টাকা। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৪১ হাজার কোটি
টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা চার লাখ ৮০ হাজার কোটি
টাকা। এনবিআরবহির্ভূত কর ধরা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। কর ব্যতীত প্রাপ্তির
লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, এনবিআরকে চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা আয় করতে হবে।
আমার ধারণা, এ কাজটি কঠিন হবে।
আমরা দেখছি, বাজেটে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার
ঘাটতি রয়েছে। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা
হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা
হবে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নেওয়া হবে এক লাখ ৬০ হাজার
কোটি টাকা। ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ নেওয়া হবে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ব্যাংক থেকে
যদি বাজেটের ঘাটতি মেটানোর জন্য ঋণ নেওয়া হয় তাহলে বেসরকারি খাতে ক্রেডিট ফ্লো কমে
যাবে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেলে তা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু হবে
না। বেসরকারি খাতের ওপর নানা ধরনের করারোপও করা হয়েছে। এসব কর জোর করে হয়তো আদায় করা
হবে, কিন্তু তাতে বেসরকারি খাতের ব্যবস্থাপনার পথ অমসৃণ হবে।
অর্থনীতি এখন স্থবির অবস্থায় রয়েছে। এমন সময়
আমাদের বৈদেশিক ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। কিন্তু এর বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
কমে যাচ্ছে। ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে রিজার্ভের সহায়তা নেওয়ার সুযোগও তাই কম। ঋণনির্ভর
বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা করা মোটেও ঠিক নয়। বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় দুই
লাখ ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে সময়মতো এ ধরনের উন্নয়ন
পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয় না সেখানে এত বড় বরাদ্দ দেওয়ার প্রয়োজন কতটা রয়েছে। বার্ষিক
উন্নয়ন পরিকল্পনার অনেক উদ্যোগ সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অতটাও কাজে আসে না, এ অভিযোগও
রয়েছে। এই পরিকল্পনার অধীনে নতুন স্কুল, হাসপাতাল কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।
কিন্তু এসব স্কুল কিংবা হাসপাতালে জনবল সংকট থাকায় পুরোপুরি চালু করা যায় না। বার্ষিক
উন্নয়ন পরিকল্পনার বরাদ্দ কমিয়ে আনতে পারলে বাজেট ঘাটতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যাবে। এমনকি
বিদেশি ঋণের বোঝাও কমবে।
আমরা দেখছি, রাজস্ব বাজেটের ৪০ শতাংশ চলে যাচ্ছে
প্রশাসনে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বেতনভাতা এবং অন্যান্য খাতে ব্যয় হবে। রাজস্ব ব্যয়
ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে দুর্বলতা নতুন কিছু নয়। অর্থনৈতিক খাতে প্রশাসন
যদি সবল ব্যবস্থাপনার সাক্ষর রাখতে না পারে তাহলে প্রশাসনের ব্যয় বাড়িয়ে লাভ কী, এ
প্রশ্নও সংগত। তাই প্রশাসনিক খাতে ব্যয় কমিয়ে বেসরকারি ও ব্যক্তি খাতে ব্যয় বাড়ানো
যেতে পারে সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যয়
দেখানো হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কতটা কার্যকর, এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকার
প্রান্তিক, পিছিয়ে পড়া মানুষ, বিধবা ও বৃদ্ধদের নানা ভাতা দিয়ে থাকে। ব্যক্তি হিসেবে
এই ভাতার পরিমাণ আহামরি কিছু নয়। পেনশনের পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রে সুদের কথাও রয়েছে। আমাদের
দেশে সামাজিক নিরাপত্তা অনেকাংশে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। আন্তর্জাতিকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা
বলতে প্রতিবন্ধী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা পিছিয়ে পড়া মানুষদের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা
ও জীবনযাপনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে বোঝায়। ৫০০-৮০০ টাকা ভাতা দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা
নিশ্চিত হয় না। তাছাড়া বয়স্ক, প্রতিবন্ধী কিংবা বিধবা ভাতা অনেকে পান না, এমন অভিযোগও
রয়েছে। একই সঙ্গে এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল অনেকের বিরুদ্ধেই অস্বচ্ছতার অভিযোগও কম নয়।
স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা
কর্মসূচির মাধ্যমে বাজেট ব্যয় বাড়িয়ে লাভ কী?
প্রস্তাবিত বাজেটে আরেকটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ
করা গেছে। ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বৈধ বা সাদা করা যাবে। একইভাবে জমি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট কিনেও এলাকাভেদে নির্দিষ্ট
হারে কর দিয়ে টাকা সাদা করার সুযোগও রাখা হয়েছে। একেক এলাকার জন্য বর্গমিটার অনুসারে নির্দিষ্ট কর দিতে হবে। বৈধভাবে
যারা আয় করেন তাদের ওপর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর আদায় করা হয়। মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ
থেকে ৩০ শতাংশ কর আদায় করা হচ্ছে আর ওদিকে কেউ অবৈধভাবে আয় করছেন তিনি ১৫ শতাংশ কর
দিয়েই ছাড় পেয়ে যাবেন? এমনটি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। বরং যারা কালো টাকার মালিক
তাদের ওপর বেশি করারোপ করা উচিত। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। অবৈধ
পন্থায় যারা আয় করেছেন তাদের চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে শূন্যসহিষ্ণু
অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই। বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগের বিষয়টি নতুন কিছু নয়।
তবে বিষয়টিকে যৌক্তিক বলে মনে করি না। এভাবে কালো টাকার পরিমাণ কমবে বলে মনে হয় না।
প্রস্তাবিত বাজেটের একটি ইতিবাচক দিক হলো কৃষি
খাতে ভর্তুকি বাড়ানো। কৃষি উপকরণের দাম কমার আভাসও পাওয়া গেছে। কৃষি ও জ্বালানি খাতে
ভর্তুকি বাড়ানোর বিষয়টিকে সব সময় সমর্থন করি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই দুটি খাত
ব্যক্তি, বাণিজ্য এবং সার্বিকভাবে রাষ্ট্রের গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রিত ও সুসংহত করে। আইএমএফের
পরামর্শ অনুসারে এই দুটি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে গতিশীল করার মতো সক্ষমতা
এখনও হয়নি। প্রত্যক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হওয়া জরুরি ছিল। মূল্যস্ফীতি
যেখানে বাড়ছে সেখানে ভ্যাটনির্ভরতা ইতিবাচক কিছু নয়। এ ব্যাপারে আলোচনাক্রমে সংশোধনের
অবকাশ রয়েছে।
সব মিলিয়ে মনে হয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেট অনেকটা
গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা। এই বাজেট সামাজিক নিরাপত্তাবান্ধব এমনটি বলা যাবে না। আবার
এই বাজেটকে বাণিজ্যবান্ধবও বলা চলে না। এনবিআর ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের বিষয়টিকে
বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। আর্থিক খাতে যে বিশৃঙ্খলা জিইয়ে আছে তা আমাদের অর্থনীতির
বড় উপসর্গ।
লেখক : বাংলাদেশ
ব্যাংকের সাবেক গভর্নর