বিশ্লেষণ
ড. আতিউর রহমান
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৪ ১২:০৬ পিএম
আপডেট : ০৭ জুন ২০২৪ ১২:৫৯ পিএম
অলংকরণ প্রবা
প্রস্তাবিত বাজেটটি প্রাথমিকভাবে দেখে একে বাস্তবতার প্রতি অনেকটাই সংবেদনশীল মনে হচ্ছে। একই সঙ্গে এই বাজেটটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরেকটু কল্যাণমুখী হওয়ার সুযোগ যে ছিল সেটিও মানতে হবে। ২০১৯-২০-এ বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪-এ এসে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৭ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ এ সময়কালে গড়ে বছরে বাজেটের আকার বেড়েছে ৭.৬ শতাংশ হারে। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও চলতি বছরের প্রস্তাবিতর চেয়ে বাজেট বেড়েছে। তবে আগের হারে বাড়েনি। মাত্র ৪.৬ শতাংশ বেড়ে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। ফলে বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীল বাজেট-প্রণেতারা সঙ্কোচনের পথেই এগুতে চাইছেন- তা দৃশ্যমান।
মুদ্রানীতির সাথে সমন্বয় করে রাজস্বনীতিকে সংযত রাখার অংশ হিসেবে বাজেট ঘাটতি ৪.৫ শতাংশ রাখার আকাঙ্ক্ষাও বাস্তবতার নিরিখে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি। তবে ৬.৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী মনে হয়। মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে তিন শতাংশের মতো কমিয়ে সাড়ে ছয় শতাংশে নামিয়ে আনা মোটেও সহজ হবে না। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বাজেট ঘাটতি আরও কমিয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের পরিমাণ কমানোর কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন যাবত বড় উপসর্গ হয়ে আছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি এবং বড় চ্যালেঞ্জও বটে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সামাজিক খাতে বরাদ্দ, কৃষির জন্য বরাদ্দ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সহায়ক খাতে/ কর্মসূচিতে/ প্রকল্পে বরাদ্দে এই কাটছাঁটের প্রভাব যতটা সম্ভব কম ফেলা যায় ততই কল্যাণকর হবে বলে মনে হয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বরাদ্দ প্রসঙ্গে বলতে হয়, প্রায় এক দশক ধরেই আমাদের মোট জাতীয় বাজেটের ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ যাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাবদ। বরাদ্দের এই ধারাবাহিকতার প্রভাবেই দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্যের হার নাটকীয় মাত্রায় কমিয়ে আনা গেছে। এবারও বাজেটের ১৭ শতাংশের বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি খাতে। তবে লাগামহীন মূল্যস্ফীতির হাত থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে এখানেও বরাদ্দের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রবৃদ্ধি আশা করেছিলাম। মূল্যস্ফীতি যেহেতু ১০ শতাংশের আশপাশে, তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ালে কার্যক্রমের উপকারভোগীরা মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট জোর পেতেন বলেও মনে করি।
মোট রাজস্ব আদায়ের ৫ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেটিকে সময়োচিত মনে করলেও এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন খুবই চ্যালেঞ্জিং তা নিয়ে সংশয় নেই। সব মিলিয়ে প্রাথমিক বিচারে এবারের বাজেটটিকে অনেকটাই বাস্তবমুখী ও সময়োচিত হিসেবেই দেখতে হবে। তবে যেহেতু অনেকখানি কাটছাঁট করতে হয়েছে, তাই এই সঙ্কুচিত বাজেট বাস্তবায়নে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দক্ষতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে। জাতীয় সংসদে আলোচনাক্রমে প্রস্তাবিত বাজেট সংশোধনের সুযোগ রয়েছে এবং একই সঙ্গে ন্যায়ানুগ করারও অবকাশ আছে।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, উন্নয়ন সমন্বয় ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক