সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০২৪ ০৯:৩১ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের
২০তম প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট জুনিয়র বলেছিলেন, ‘একটি জাতি হিসেবে টিকে থাকতে, একটি রাষ্ট্র
হিসেবে সমৃদ্ধ হতে, মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে আমাদের কাছে অবশ্যই গাছ থাকতে হবে।’ গাছ
নিয়ে এমন জীবনঘনিষ্ঠ ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট মন্তব্য বিশ্বের আরও অনেক মনীষীই করেছেন, যা
বিদ্যমান বাস্তবতায় আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আমাদের তো বটেই বর্তমান বৈশ্বিক
প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি মানুষের সুস্থভাবে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বড় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন ও বহুমাত্রিক দূষণ থেকে মুক্তি বড় চ্যালেঞ্জ
হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রাক্কালে অবশেষে বৃক্ষ
নিয়ে দেশ সাজানোর ডাক এসেছে, এ বার্তা মিলেছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে। একই
দিন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পরিবেশ ও বৃক্ষমেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে গাছ কাটলে তিনগুণ লাগাতে
হবে। সে অনুযায়ী কাজ করছে সরকার।’ একই সঙ্গে তিনি এ-ও বলেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে
ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ
প্রভাব থেকে আমরা দেশকে রক্ষা করতে চাই। আর তাই যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়ার সময়
পরিবেশ রক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।’ এ সময় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের
ব্যাপক কর্মসূচির কথাও জানান।

২০২৪ সালের বিশ্ব
পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলার প্রতিপাদ্য ছিল, ‘কর্মভূমি পুনরুদ্ধার, রুখব মরুময়তা; অর্জন
করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর অনলাইন সংস্করণে ওই দিন বলা
হয়েছে, ‘বৃক্ষ দিয়ে সাজাই দেশ, সমৃদ্ধ করি বাংলাদেশ’Ñ প্রতিপাদ্য ধারণ করে চলবে জাতীয়
বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা। আমরা মনে করি, বিদ্যমান বাস্তবতায় এর গুরুত্ব সর্বাংশে
অপরিসীম। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না, যখন দেখছি ওই প্রতিবেদনেই
উঠে এসেছে, এক বছরে কাটা পড়েছে সাড়ে এগারো লাখ গাছ। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮৮ হাজার
১৯০টি গাছ সংহারের তথ্য আমাদের বাস্তবতায় কতটা ভয়াবহ হুমকি এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন
করে বলা নিষ্প্রয়োজন। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় রেমালের অভিঘাতে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল ফের তছনছ
হয়। সিডর-আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহ ছোবলে সৃষ্ট ক্ষত এখনও উপশম করা যায়নি। এর পর
আরও কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, যেগুলো কমবেশি ক্ষত সৃষ্টি করে। আমরা দেখেছি, ঘূর্ণিঝড়
রেমালের আগ্রাসী থাবা থেকে প্রাকৃতিক সুরক্ষাপ্রাচীর বলে খ্যাত সুন্দরবন ফের বুক আগলে
দাঁড়িয়েছে। দেশের সামাজিক ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বলবানদের ক্রমাগত থাবার বার্তা সংবাদমাধ্যমেই
উঠে আসছে। শুধু তা-ই নয়, সরকারি-বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে
গাছ সংহারের অপপ্রক্রিয়া থেমে নেই। এ অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড দেশ-জাতির জন্য ভয়াবহ
হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষায় নিঃস্বার্থ
উপকারী বন্ধু গাছের মূলে যে কুঠারাঘাত চলছে, এর পরিণাম আরও ভয়াবহ হতে বাধ্য। আমরা জানি,
পরিবেশের দূষণ, বিপর্যয়সহ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দিক দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম
সারির দেশগুলোর একটি। উষ্ণায়ন বৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিক জীবন-যাপন ব্যাহত হওয়ার অনেক নজির
রয়েছে এবং সম্প্রতি দাবদাহের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির তিক্ত অভিজ্ঞতাও আমাদের রয়েছে। এমতাবস্থায়
গাছ দিয়ে দেশ সাজানোর ডাক নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য এবং সার্বিক প্রেক্ষাপটে এর কোনো
বিকল্পও নেই।
অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার
আলোকে এ কথাও আমরা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, গাছ রোপণ করেই দায় শেষ করার কোনো অবকাশ নেই।
এর পরিচর্যা কিংবা প্রতিপালনে যথাযথভাবে মনোযোগী হতে না পারলে বিপদাশঙ্কা তো কাটবেই
না, উপরন্তু সরকারি কোষাগারের অর্থ গচ্চার পথও রুদ্ধ হবে না। দেশে অনেক বৃক্ষপ্রেমী
আছেন, যারা নিজ উদ্যোগে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির পরিসর ইতোমধ্যে অনেক বিস্তৃত করেছেন।
প্রকৃতি-পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে তাদের এই ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমরা মনে করি, বৃক্ষরোপণ
কর্মসূচিতে ব্যক্তি পর্যায়ে তাদের শুধু পুরস্কৃত করার মধ্য দিয়েই দায় শেষ করার অবকাশ
নেই। বরং তাদের লাগাতার পৃষ্ঠপোষকতা করে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। গাছ না থাকলে মানুষের
অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে, তা নতুন কোনো বার্তা নয়। স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন
স্তরের জনপ্রতিনিধিদের তো বটেই এর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও
এক্ষেত্রে সম্পৃক্ত করে সবুজায়নের কর্মসূচি ব্যাপৃত করার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে সাফল্যজনক
নজির সৃষ্টির অবকাশ যেখানে রয়েছে, সেখানে গাছ টিকিয়ে না রাখতে পারার ব্যর্থতা কোনোভাবেই
মেনে নেওয়া যায় না।
যেকোনো সামাজিক
উদ্যোগে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা যদি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মেলে তাহলে এর সুফল যেমন দৃশ্যমান
হতে বাধ্য তেমনি সরকারি পরিকল্পনায়ও নাগরিক সমাজের সম্পৃক্ততা ব্যাপক সুফল এনে দিতে
পারে, তা আমরা বিশ্বাস করি। নিকট অতীতে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছি, গাছ লাগানোর
কর্মসূচি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বারবার সুবজায়নের গুরুত্বই
শুধু তুলে ধরছেন না, এর পরিসর বৃদ্ধিরও তাগিদ দিচ্ছেন। আমরা জানি, মহানগর-নগরে ছাদবাগান
কর্মসূচির ব্যাপারেও সরকার উৎসাহিত করছে এবং হোল্ডিং ট্যাক্স ১০ শতাংশ ছাড় পাওয়ার বিধানও
প্রবর্তন করেছে। আমাদের সমাজে প্রচলিত প্রবাদ, ‘নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে হৃৎপিণ্ড হয়ে উঠছে
বিষের ভান্ড’। বহুমাত্রিক দূষণে আমরা কতটা বিপন্ন এবং নীরব ঘাতক মানবদেহে কীভাবে সংক্রমণ
ঘটাচ্ছে, এরও অনেক নজির রয়েছে।
জীবনের স্বার্থে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ আন্দোলন ক্রমেই বেগবান হয়ে উঠেছে। আমাদের সৌভাগ্য, প্রকৃতি নিজেই তার অপরা দানে আমাদের সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছুসংখ্যক অপরিণামদর্শীর অপঘাতে প্রকৃতিপ্রদত্ত সম্পদ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, এর সুরক্ষার দায় শুধু সরকারেরই নয়; অবশ্যই নাগরিক সমাজেরও। মানুষ প্রকৃতি থেকে অক্সিজেন নেয়, আর মানুষেরই নির্গত কার্বন-ডাই অক্সাইড গাছ গ্রহণ করে আমাদের পরিত্রাণ দিচ্ছে। সবুজে বাঁচার এবং সবুজেই প্রকৃতির সুরক্ষার যারা বিরুদ্ধাচরণ করছে, অর্থাৎ লুটপাট করে নিজেদের উদর ভরছে তারাও তো বিপদাশঙ্কার বাইরে নয়। প্রবাদ আছে, ‘নগরে আগুন লাগলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না।’ আমরা আশা করি, সরকার এবং নাগরিক সমাজের যূথবদ্ধ প্রচেষ্টায় জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ জয় করা মোটেও দুরূহ নয়, যদি সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্বপালনে নিষ্ঠার পরিচয় দিতে সক্ষম হন।