রাজীব নন্দী
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২২ ০০:৩৫ এএম
অলঙ্করন : জয়ন্ত জন
আমাদের ‘জীবন’ একটা ‘ক্রিকেট খেলার মাঠ’! আপনি ক্রিজে দাঁড়ানো ব্যাটসম্যান। প্রতিটি ‘সমস্যা’ হলো বোলারের ছুড়ে দেওয়া বল। আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, বন্ধুরা হয় ফিল্ডার, নয়তো স্টেডিয়ামের দর্শক। আপনার লাইফ পার্টনার ক্রিজের অপর পাশের ব্যাটসম্যান, যিনি আপনাকে সেঞ্চুরি করাবে বা রানআউট! আর দুই পাশে আম্পায়ার হলেন পাপপুণ্যের হিসাবরক্ষক, ঘাড়ে চেপে বসা নন্দীভৃঙ্গি বা মুনকার-নাকির! তৃতীয় আম্পায়ার হলেন আপনার ভাগ্যলিপিকার; যিনি থাকেন সবকিছুর আড়ালে। আর ম্যাচ রেফারি হলেন স্বয়ং চিত্রগুপ্ত! পুরো খেলা যে সরাসরি সম্প্রচার করছে, তিনি আর কেউ নন, গীতার ভাষ্যকার দিব্যচক্ষুপ্রাপ্ত সঞ্জয়; অর্থাৎ টেলিভিশন। একটি ক্রিকেট খেলার মধ্যে এভাবেই জীবনকে দেখি!
কিন্তু যে ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার সাদা-শ্বেতশুভ্র পবিত্র ক্রীড়া হিসেবে ক্রিকেটের প্রচলন, তা কি আর পবিত্র আছে? নেই। ক্রিকেট যে তার কথিত ভদ্র চরিত্র হারিয়ে ‘নষ্ট’ হতে যাচ্ছে, সেই ভবিষ্যৎবাণী ২০০৯ সালেই করা হয়েছে। জন মার্শাল বুকানন (অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক বিশ্বকাপজয়ী কোচ) তার ‘দ্য ফিউচার অব ক্রিকেট : রাইজ অব টি-টোয়েন্টি’তে লিখেছে- হোয়েন মানি টকস, ক্রিকেট লিসেন্স। হাউ বিগ মানি, অ্যাডমিনিস্ট্রেটরস এন্ড প্লেয়ারস্ আর পাওয়ারিং আ নিউ ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড : এন ইনসাইড একাউন্ট। সত্যিই আজ ক্রিকেট শুধু ২২ গজের খেলা নয়। এই খেলার ভয়াবহ প্রতীকী অর্থ খাড়া হয়ে গেছে। খেলা এখন জাতীয় মর্যাদার প্রতীক, খেলা এখন ছদ্ম জাতীয়তাবাদ, খেলা এখন জাতির পরিচয় নির্মাণের হাতিয়ার। ক্রিকেট পুঁজিবাদের সবচেয়ে রমরমা ব্যবসা, ক্রিকেট এখন ছদ্ম জাতীয়তাবাদ, ক্রিকেট আজ অক্ষম আত্মতৃপ্তিতে ভোগা হুজুগে জনতার স্বল্পায়ু গৌরব! ষড়ঋতুর দেশে ফুটবলকে কোণঠাঁসা করার ভিক্টোরিয়ান অতিথি এই মহামান্য ক্রিকেট! ক্রিকেট এই জাতির রাজনীতি, ক্রিকেটই আজ জাতির জীয়নকাঠি। তাই ক্রিকেটকে ঘিরে দেখি পুঁজিতান্ত্রিক ছকের রাজনীতি আর রাজনীতির মাঠে শুনি খেলার ময়দানের মতো হুঙ্কার ‘খেলা হবে’!
জাতীয়তাবাদ এমন একটি আবেগে মোড়ানো, যা আমাকে আপনাকে ‘জাতীয় পরিচয়’ নিয়ে স্টেডিয়ামে হাজির করায়। ঔপনিবেশিক শক্তির যাঁতাকলে দীর্ঘদিন শোষণের শিকার হওয়ায় আজ ক্রিকেট দিয়ে আমরা সেই বকেয়া আনন্দ উদযাপন করতে চাই। যেভাবে ১৯৭২ সালে ববি ফিসার ও বরিস স্প্যাসকির বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ হয়ে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সমতুল্য একটা কিছু। এখন ক্রিকেট সেভাবেই বিনোদনের ঊর্ধ্বে গিয়ে জাতীয় পরিচয়ের জীয়নকাঠি হয়ে উঠছে। একটি দল, একজন ক্যাপ্টেন, ১১ জন খেলোয়াড় মিলে গড়া ‘ন্যাশনালিস্টিক ক্রিকেট সিন্ডিকেট’ পুরো জাতির আশা-আকাক্সক্ষার মান-মন্দিরের মূর্তি হয়ে উঠছে। জনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলে সেই দল, ক্যাপ্টেন আর ১১ জন হয়ে ওঠেন মন্দিরের পূজনীয় দুর্গা, হেরে গেলে হয়ে যান মন্দিরের নিন্দনীয় ভিলেন-অসুর!
যে ক্রিকেট আগে ছিল কেবল ইংরেজ জাতির সত্তার প্রতীক, সেটি হয়ে গেল উত্তর ঔপনিবেশিক স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর দেশপ্রেমের চূড়ান্ত প্রতীক। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা আর দেশের প্রতি ভালোবাসা একই পাটাতনে তুল্যমূল্য হয়ে পড়া দেখে বাংলাদেশের ক্রিকেটে জাতীয় পুরুষ দলের ক্যাপ্টেন মাশরাফি ঠিকই আমাদের চোখের সামনের পর্দা তুলে ধরে বলেন-বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হয়েও বলছি, ক্রিকেট আমাদের দেশের জীবন-মরণ সমস্যা না। ক্রিকেট যদি কাল থেকে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কিছু মানুষ নিশ্চয় কষ্ট পাবেন, কেউ মারা যাবেন না। কিন্তু কৃষক যদি মাঠে না যায়, আমি-আপনি মরে যাব। এটাই বাস্তবতা।’
সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে রাজতন্ত্র-সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে শিল্পবিপ্লবের ঝান্ডা নিয়ে পুঁজিবাদ হাজির হয়েছিল ত্রাতা হিসেবে। আজ সেই পুঁজিবাদ তার নিজের নিয়মেই ইনভেস্টমেন্ট আর মুনাফার জন্য হাজির হয়ে গেল নির্মল বিনোদনের খেলার মাঠেও। আজ খেলাও বদলে গেছে, এখনকার খেলায় দর্শক পাওয়া কঠিন। খেলার মাঠে অনেক দর্শকের শরীর খসে ভেসে ওঠে উগ্র জাতীয়তাবাদী কঙ্কাল। বৈশ্বিক পুঁজিতে পরিণত করতে হয়, জাতীয়তাবাদের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বায়নের রূপ দেওয়া যায়, তা রংঢংয়ের বাহারি আয়োজন আইপিএল দেখলেই বোঝা যায়।
আমরা বর্তমান সমাজকে করোনা পূর্ববর্তী ও করোনা পরবর্তী এই দুটি বিভাজনে ব্যাখ্যা করব। এর আগেও গত শতাব্দীর তিরিশের দশককে মন্দার যুগ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সময়কে স্নায়ুযুদ্ধের সময়, সত্তরের দশককে মহাকাশ যুগ বা স্পেস এজ হিসেবে ভেবেছি আমরা। ঠিক একই কায়দায় ক্রিকেটের উন্মাদনার সঙ্গে পুঁজির মেলবন্ধন আমাদেরকে ক্রিকেট বিশে^র নতুন একটি বিভাজনরেখা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ক্রিকেট এখন ‘আইপিএল-পূর্ব ও আইপিএল-পরবর্তী’ বিভাজন রেখায় অবস্থান করছে। শ্বেতশুভ্র ভিক্টোরিয়ান যে রাজকীয় খেলাটির প্রচলন হয়েছিল, তার গভীর প্রতীক আম্প্যায়ার হলেন মাঠের লর্ড, তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সেই আম্প্যায়ার সিস্টেমেও পরিবর্তন এসেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। এমনকি ক্রিকেট আর দিনে-রাতের নির্ভেজাল উত্তেজনার ম্যাচ নেই, ক্রিকেট এখন আর নিছক ইংল্যান্ডের বৈকালিক বিনোদনের টি-টোয়েন্টি নয়, পুঁজিবাদ ক্রিকেটকে আমূল বদলে দিয়েছে। সেই বদলে দেওয়ার কৃতিত্ব সিংহভাগই বিজ্ঞাপনের।
ক্রিকেট খেলার সঙ্গে ‘ছদ্ম জাতীয়তাবাদ’ মিশিয়ে বহু শরবত অনেক বাঙালি গিলেছে। খেলারও ‘শেষ খেলা’ আছে। ক্রিকেট ক্যাপিটালিজম ক্রিকেটারদের কেবল ‘শ্রমের বিনিময়ে মজুরি’র কথাই বলছে না। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে এই খেলাটিও সমাজের বাকি সব লেনদেনের মতো ভাবগত বিনিময়ের সম্পদ, পণ্য ও সেবার মূল্য নির্ধারণ করছে। ক্রিকেট যখন গ্রামের মাঠে খেলা হয়, তখন সেটি ওয়েলফেয়ার ক্যাপিটালিজমের অনুসরণে হয়। শীতকালের বিনোদনধর্মী সমাজকল্যাণমুখী বিনোদন। আর ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের ছকে যখন ক্রিকেট খেলা হয়, তখন সেটি অর্থনীতির ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভরতার মতো ব্যবসায়ী জনগোষ্ঠী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। যেমন : জাতীয় বা বিভাগীয় ক্রিকেট আসর। এরপর দেশের সীমানা পেরিয়ে ক্রিকেট যখন বৈশ্বিক বিনোদনে পরিণত হচ্ছে, তখন সেটা স্টেট ক্যাপিটালিজম বা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদকে প্রতিনিধিত্ব করছে। যেখানে খেলার দর্শক, খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সরকার-সবাই মিলে উৎপাদনের উপায় ও ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতে সামিল হয়, একেবারে পুঁজিবাদী কায়দায়। বিশ্বায়নের সাম্রাজ্যবাদী প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাদকে ব্যবহার করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। ক্রিকেটের চাইতে আরও বড় মুনাফার খেলা এই উপমহাদেশে না আসা পর্যন্ত ক্রিকেটই যেন এই ভূমির সর্বশক্তিমান। এভাবেই খেলা পরিণত হচ্ছে যুদ্ধে, আর সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধগুলো পরিণত হয়েছে খেলায়। ময়দানের ক্রিকেটকে যুদ্ধ আর যুদ্ধের ময়দানকে খেলা হিসেবে দেখা অস্বাভাবিকতা বৈকি!
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়