মিয়ানমার
ড. রাহমান নাসির উদ্দিন
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৪ ০৯:৪২ এএম
ড. রাহমান নাসির উদ্দিন
সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে ক্রেডিবল (গ্রহণযোগ্য) গণমাধ্যম রয়টার্সের বরাত দিয়ে মিয়ানমারের স্বাধীন পরামর্শক গোষ্ঠী স্পেশাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল ফর মিয়ানমার (এসএসি-এম)-এর একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে গরম খবর হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের কথিত সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপগুলো, যাদের আমি বলি রেজিস্ট্যান্ট গ্রুপ, বর্তমানে মিয়ানমারের ৮৬% অঞ্চলের শহরগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব শহরে মিয়ানমার জান্তার আর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। শতাংশের বিচারে বিবেচনা করলে মনে হতে পারে, মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যে জান্তাবিরোধী যে বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী লড়াই করছে মিয়ানমার মোটামুটি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।

রয়টার্সের সংবাদ এবং শতাংশ ‘ট্যাকেন ফর
গ্রান্টেড’ নিলে, মনে হচ্ছে মিয়ানমার
সেনা বা জান্তা সরকার রাজধানী ইয়াঙ্গুনে কোনোরকমে ‘নিজের জান’টা হাতে নিয়ে বেঁচে আছে, নিজেদের কোনোরকমে রক্ষা
করছে এবং এক দিন এক দিন করে দিন গুনছে কীভাবে এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়! এখানে
মুক্তি মানে এই নয় যে, তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা রয়টার্স-কথিত
৮৬ শতাংশ এলাকায় নতুন করে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। বরং মুক্তি মানে কীভাবে মান-ইজ্জত নিয়ে সসম্মানে ‘জামাকাপড়’ ঠিক রেখে ক্ষমতা বিদ্রোহীদের হাতে বা ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের হাতে
ছেড়ে দিয়ে কোনোরকম জীবনটা রক্ষা করা যায়! আমাদের সংবাদমাধ্যমের সংবাদগুলো পড়লে এবং বিবেচনায় নিলে মনে হতে পারে,
মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং জান্তার এখন ত্রাহি অবস্থা। হতে পারে বিভিন্ন রাজ্যে
লড়াইরত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো মিয়ানমার মোটামুটি দখল করে ফেলেছে।
সেনাবাহিনীর এবং জান্তার আনুষ্ঠানিক পরাজয়
কেবলই সময়ের ব্যাপার। সেটা যেকোনো সময় হতে পারে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা দখল
করে নতুন সরকার গঠন করতে পারে! কিন্তু প্রকৃত সত্য ও বাস্তবতা হচ্ছে, বিষয়টি একেবারেই সে রকম কোনো কিছু নয়। মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং জান্তা
সমর্থিত বাহিনী সাতটি রাজ্যে লড়াইরত সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হাতে নিয়মিতভাবে
পরাজিত হচ্ছে; তাদের বিভিন্ন বেইজ, ক্যাম্প,
চৌকি, গ্যারিসন এবং সামরিক স্থাপনাগুলো
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নিয়মিতভাবে দখল করছে, সামরিক সেনারা
সেগুলো ফেলে পালাচ্ছে এ কথা সত্য। কিন্তু এজন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী একেবারেই
আত্মসমর্পণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছে এবং ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে ‘জান নিয়ে পালানোর জন্য’ প্রস্তুত হয়ে আছে, এ কথা একেবারে সত্যের কাছাকাছিও নয়। অনেক কারণে আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং জান্তা সরকার অত সহজে বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীর
হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে পালাবে এটা খানিকটা অতি উচ্চাভিলাষী প্রাককল্পনা (হাইলি
এমভিশার্স হাইপোথেসিস)। যারা রয়টার্সের বরাত দিয়ে এসএসি-এমের দেওয়া শতাংশ
বিবেচনা করে এটা ধরে বসে আছেন, তারা খানিকটা অতীত অভিজ্ঞতার
অন্ধকারে বাস করেন।
বিভিন্ন রাজ্যে জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহী
গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে লড়াই করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার দীর্ঘ
অভিজ্ঞতা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আছে। কেননা জাতিগত বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এ লড়াই নতুন কিছু নয়; বরং ১৯৬২ সালে সেনাবাহিনী
রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর থেকে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ নিজেদের
সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক বা জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে
লড়াই করে আসছে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীও এসব বিভিন্ন আঞ্চলিক জাতিগত বিদ্রোহী
সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মোকাবিলা করে, নিয়ন্ত্রণ করে এবং
নিয়ন্ত্রণে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে। এমনকি ২০১১ থেকে ২০২১ সালে তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেও। ফলে
মিয়ানমার সেনাবাহিনী এসব জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অত্যন্ত
অভিজ্ঞ এবং সিদ্ধহস্ত। কাজেই এত সহজে সামরিক বাহিনী ও জান্তা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর
হাতে আত্মসমর্পণ করবে, পরাজয় বরণ করবে এবং রাষ্ট্রক্ষমতা
ছেড়ে দিয়ে পালাবে- এটা অত্যন্ত সরলীকরণ ও সাধারণীকরণ
রাজনৈতিক প্রেডিকশন।
আরও একটি বিষয় মনে রাখার জরুরি যে, সামরিক
বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট পরাজিত হচ্ছে সেটা মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যের সীমান্তবর্তী
অঞ্চলে; কিন্তু এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানী এবং বড় শহরগুলো বিশেষ করে
রেঙ্গুন, নেপিডো, মান্দালে, মুলমেইন, সিত্তয়ে প্রভৃতি বিদ্রোহী সশস্ত্র
গোষ্ঠীগুলোর ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটকে পরাজিত করার
সবচেয়ে বাহাদুর বাহিনী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আরাকান আর্মিও আরাকানের বিভিন্ন
সীমান্তবর্তী অঞ্চল দখল করলেও এর রাজধানী চিত্তয়ে এখনও স্পর্শ করতে পারেনি। এ বক্তব্য
একইভাবে অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং রয়টার্সের খবর ধরে ৮৬% শতাংশ
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এবং জান্তা
সরকার একেবারে কাঁদায় পড়ে গেছে, এটা মনে করবার যুক্তিসঙ্গত
কোনো কারণ নেই।
এও মনে রাখা দরকার যে, জান্তা
সরকার পরাজয় বরণ করবে কি করবে না তা আরও একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তা হচ্ছে মিয়ানমারের পাঁচটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সমর্থন তাদের ওপর আছে
নাকি নেইÑতার ওপর। মিয়ানমারের পাঁচ প্রতিবেশী রাষ্ট্র হচ্ছে লাওস, চীন, থাইল্যান্ড, ভারত ও
বাংলাদেশ। এখানে বাংলাদেশের অবস্থান স্বাভাবিক কারণেই সরকারের বিরোধী কোনো
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পক্ষে যাওয়ার কথা নয়। কেননা বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের যে
ডিপ্লোম্যাটিক সম্পর্ক সেখানে সরকারবিরোধী কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে বাংলাদেশ সমর্থন
দিতে পারে না। থাইল্যান্ড এবং লাওসেরও জান্তা সরকারের সঙ্গে বিদ্যমান কূটনৈতিক
সম্পর্কের কাঠামোয় এবং আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে
গিয়ে বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন করবার কোনো রাজনৈতিক, আইনি ও কূটনৈতিক যৌক্তিকতা নই।
মিয়ানমার ইস্যুতে চীনের পলিসি আমরা অনেকেই
জানি যে, তারা জান্তা সরকারের সরাসরি এবং উন্মুক্ত সমর্থক; আবার
বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও পরোক্ষভাবে একটা যোগাযোগ রক্ষা করে এবং
পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। এর মধ্য দিয়ে চীন একদিকে জান্তা সরকারের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব আরোপ
করে; আবার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কাছেও খানিকটা গ্রহণযোগ্যতা
নিয়ে উল্টো মিয়ানমারকে চাপের মুখে রাখে। ফলে সামরিক সরকারের পতনের জন্য বিদ্রোহী
সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সরাসরি চীন সমর্থন দেবে এটাও তাদের মিয়ানমারসংক্রান্ত
দীর্ঘদিনের রাজনীতি, নীতি ও ভূরাজনীতির সঙ্গে যায় না। বাকি
থাকে কে? ভারত। যে মিয়ানমারসংক্রান্ত রাজনীতি, কূটনীতি এবং
ভূরাজনীতি পুরোটাই নির্ধারণ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
ভারতের সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের সম্পর্কের কাঠামো বিবেচনায় রেখে। কেননা
বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বিপ্রতীপ অবস্থানে থাকলেও ভারত ও চীন
একেবারেই বিপরীতমুখী নয়।
এশিয়া ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে চীন এবং ভারত একে
অন্যের একেবারেই বিরোধী অবস্থানে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির জায়গা থেকে চীন
ভারতের খানিকটা কাছাকাছি, কিন্তু এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতির জায়গায় তারা পারস্পর
মুখোমুখি। সুতরাং চীনের সঙ্গে ভারতের আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের কাঠামোর
ভেতর দিয়েই নির্ধারিত হয় মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক
সম্পর্ক। সার্বিক বিবেচনায় আমার মনে হয় না এ মুহূর্তে ভারত মিয়ানমারের সশস্ত্র
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে উন্মুক্তভাবে সরাসরি সমর্থন দিয়ে জান্তা সরকারের পতনে
ভূমিকা রাখবে। তাহলে বর্ডার লাইন দাঁড়াচ্ছেÑপ্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন
বিভিন্ন রাজ্যের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে
পেলেও জান্তা সরকারের পতনের জন্য যে সরাসরি এবং উন্মুক্ত সমর্থন প্রয়োজন, সেটা পাঁচটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কোনোটির পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয় বা সশস্ত্র
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে জান্তা সরকারের পতন খুব
দ্রুততম সময়ে হচ্ছে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া ৮৬ শতাংশের যে সংখ্যাতাত্ত্বিক
উপস্থাপনা তা মূলত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রতিভাত করে না।
রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তাই অগ্রিম উচ্চাভিলাষী প্রাককল্পনার বাইরে গিয়ে আমাদের আসলে অপেক্ষা করতে হবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামরিক নীতি কোন দিকে যায়, সেদিকে। একটি কথা মনে রাখা জরুরি যে, যদি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো সত্যিকার অর্থে বিজয়ী হয় এবং ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট গঠন করার সুযোগ পায়, তাহলে মূলত পতন হবে ‘জান্তা সরকারের’; মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নয়। কোনো রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কখনও পরাজিত হয় না। পরাজিত হয় জান্তা সরকার।