সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৪ ১৩:৩২ পিএম
বাজার কোনোভাবেই
স্থিতিশীল করা যাচ্ছে না। একেক সময় একেক অজুহাতে পণ্যমূল্যের দাম বাড়ছে। ৩১ মে প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডলারের দাম বাড়ার অজুহাতে গমের বাজার ফের ঊর্ধ্বমুখী।
এর ফলে সঙ্গতই বেড়ে গেছে আটার দামও। শুধু আটা নয়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিম-আলু-ব্রয়লার
মুরগি ও পেঁয়াজের দাম আরেক দফা বেড়েছে। সহযোগী একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
ডিমের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ডজনে কুড়ি টাকারও বেশি। একইভাবে অন্যান্য নিত্যপণ্যের
দামও ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু হয়েছে। আমরা জানি, যেকোনো উৎসব উপলক্ষে আগে থেকেই বাজারে
বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করে। পবিত্র ঈদুল আজহা যতই এগিয়ে আসছে, বাজারে অস্থিতিশীলতাও
পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা আগেও বলেছি, বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে
সর্বাগ্রে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধে অনমনীয় অবস্থান নিতে হবে। কিন্তু আমরা দেখছি,
বাজার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলোর তরফে কথা হয় যত কাজ হয় না তার কিয়দংশও।
চলমান বহুমুখী সংকটে নিত্যপণ্যের দামে কারসাজি সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি বিড়ম্বনার
কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষক অনেকেই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন, ঈদুল আজহা সামনে
রেখে ‘সিন্ডিকেট’ ফের তৎপর হয়ে উঠতে পারে। তাদের এই আশঙ্কা যে অমূলক নয়, এর প্রতিফলন
ইতোমধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দৃশ্যমানও হয়ে উঠেছে।
‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি
বাজারের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত হয়ে পড়েছে। আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে
এই প্রশ্নও বহুবার রেখেছি, সিন্ডিকেটের হোতাদের হাত কি আইনের হাতের চেয়েও লম্বা? ডলার
সংকট আছে, তা অসত্য নয়। কিন্তু এই সংকটকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে গমের বাজারে যে
তুঘলকি কাণ্ড শুরু হয়েছে, তা বিস্ময়কর যুগপৎ প্রশ্নবোধক। কারণ সরকারের দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন
অনেকেই বলেছেন, বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই, মজুদেও নেই সংকট। যদি তাই
হয়, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের উদর পূর্তির পাঁয়তারার সুযোগ
পান কী করে। একদিকে মূল্যস্ফীতির অভিঘাত অন্যদিকে খাদ্যপণ্যে ভেজালের ছড়াছড়িÑ এই দুই-ই
স্বাভাবিক-সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের
কারসাজি নতুন কিছু নয়। মজুদদারি কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা
কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেও বারবার কী করে পার পেয়ে যান, এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়
সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই এড়ানোর অবকাশ নেই।
আমাদের স্মরণে
আছে, গত ৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জেলা প্রশাসকদের চার দিনব্যাপী বার্ষিক সম্মেলন
উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের মজুদদারি কিংবা সরবরাহব্যবস্থার
বিঘ্ন করে রমজান মাসে বাজারে কোনো মহল অস্থিরতা সৃষ্টি করলে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর
আইনানুগ ব্যবস্থার নির্দেশ দেন। বাজার তদারকি নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অতি মুনাফালোভী
সিন্ডিকেটের হোতাদের প্রতি কোনো রকম অনুকম্পা না দেখানোর কথাও তিনি জেলা প্রশাসকদের
বলেছিলেন। কিন্তু আমরা দেখেছি, এরপরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসাধু ব্যক্তিরা তাদের আখের
গোছানোর অপচেষ্টায় ক্ষান্ত দেয়নি। জেলা প্রশাসকরা বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে
প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু আমরা দেখছি
মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে বাজারে আবার কালোহাতের কারসাজি শুরু হয়েছে। আমরা নিশ্চয়ই
আশা করব, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ প্রতিপালনে জেলা প্রশাসকদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের
প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা দায়িত্বপালনে নিষ্ঠ হবেন এবং অকারণে সৃষ্ট বাজারের
চাপে-তাপে নাকাল ভোক্তাদের স্বস্তি জোগাবেন।
সীমিত ও নিম্ন
আয়ের মানুষ সঙ্গত কারণেই তাদের খাদ্যতালিকায় কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছেন। বাজারে প্রায়
ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতার কারণে এখন আর শুধু ওই দুই শ্রেণিভুক্তরাই নন, নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত
শ্রেণির মানুষও একই পথ অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে কারসাজি চালিয়ে
অসাধু ব্যবসায়ীরা দফায় দফায় কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা। অথচ এর কোনো স্থায়ী
প্রতিবিধান নিশ্চিত হচ্ছে না, তা বিস্ময়কর বৈকি। আমরা দেখছি কিছু কিছু পণ্য নিয়ে দফায়
দফায় হীনস্বার্থবাদীরা যেসব অজুহাত দাঁড় করিয়ে বাজার অস্থির করে তোলে, অনেক ক্ষেত্রেই
ওই কারণগুলো যাচাই করে দেখা হয়নি। দেশে প্রায় সব নিত্যপণ্যই কমবেশি উৎপাদিত হয়। যা
চাহিদার তুলনায় একেবারে কম নয়। এ অবস্থায় সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী সময়মতো নিত্যপণ্য
আমদানি করা হলে বাজারে কোনো পণ্যর বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা থাকার কথা নয়। আমরা আবারও
জোর দিয়ে বলি, বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে অসাধু ব্যবসায়ীদের শক্তির উৎস খুঁজে বের
করে তা ধ্বংস করতে হবে। এসব বিষয়ে কথা হয়েছে বিস্তর কিন্তু কাজের কাজ কতটা কী হয়েছে,
এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
নিত্যপণ্যের বাজার
মনিটরিং করতে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, বাংলাদেশ
স্টান্ডার্ড এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ,
ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন ছাড়াও রয়েছে র্যাব ও জেলা প্রশাসনের একাধিক টিম।
বাজার নিয়ন্ত্রণে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজের সুবিধার জন্য করা হয়েছে আলাদা আইনও। তারপরও
বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কেন কঠিন হয়ে পড়েছে, এই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের
অবশ্যই রয়েছে।
দেশের বাজার চলে
না ধ্রুপদি নিয়মে। অর্থনীতির বিশ্লেষকদের এই বক্তব্য মোটেও যে অমূলক নয়, বিদ্যমান পরিস্থিতি
এরও সাক্ষ্যবহ। বস্তুত চাহিদা ও সরবরাহে ধ্রুপদি নিয়মের কারণে নয় বরং আড়তদার-আমদানিকারক-পাইকারি
ও খুচরা অসাধু ব্যবসায়ীরা কীভাবে পণ্যমূল্য নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড চালাতে পারেন, তা আমাদের
অভিজ্ঞতায় মূর্ত। আমরা মনে করি, বাজার অস্থিতিশীল করে যারা ভোক্তার নাভিশ্বাস তুলে
নিজেদের আখের গোছান, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থা নির্বিঘ্ন করার পাশাপাশি বাজারের নজরদারি-তদারকি দুই-ই সমানতালে
চালাতে হবে। বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে সরকারের দায়িত্বশীল পক্ষগুলোকেই। বাজারের নিয়ন্ত্রণ
সরকার নিতে না পারলে কোনোভাবেই পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে না এবং স্বেচ্ছাচারী
ব্যক্তিদের আস্ফালনও বন্ধ করা যাবে না। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেটের হোতারা
যাতে সক্রিয় হয়ে উঠতে না পারে, এজন্য এখনই সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।