সমাজ
ড. হারুন রশীদ
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৪ ১৩:২৫ পিএম
ড. হারুন রশীদ
স্মার্ট বাংলাদেশে সবকিছু হতে হবে আধুনিক ও যুগোপযোগী। বিশেষ করে জনসাধারণকে হতে হবে স্মার্ট। উন্নত দেশ গড়তে মাদকমুক্ত সমাজ বড় নির্ণায়ক। মাদক থেকে দেশ-জাতিকে রক্ষায় মাদক অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকারের রয়েছে জিরো টলারেন্স নীতি। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানকে যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে ‘চলো যাই যুদ্ধে মাদকের বিরুদ্ধে’ স্লোগানে চিরুনি অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু মাদক থেকে এখনও পরিত্রাণ মেলেনি। নিষিদ্ধ জগতে অস্ত্রের পর মাদকই সবচেয়ে লাভবান ব্যবসা। বিশেষ করে ফেনসিডিল-ইয়াবার বিস্তার দেশজুড়ে। সত্যি বলতে কি, দেশের এমন এলাকা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে মাদকের থাবা নেই। দেশজুড়ে বিশাল জাল বিস্তার করে আছে মারণ নেশার ভয়াবহ সিন্ডিকেট। আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের সঙ্গে রয়েছে এদের শক্ত ও গভীর যোগাযোগ।

মাদক চোরাচালানের জন্য রয়েছে বিভিন্ন রুট। বিমানবন্দর থেকে স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর, সীমান্ত এলাকায় মাদকের ছড়াছড়ি। এর কিছু ধরা পড়ে। বাকিটা চলে যায় মাদক সেবী ও ব্যবসায়ীদের কাছে। সম্প্রতি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ বিভিন্ন কারাগারে অভিনব কায়দায় মাদক ও নিষিদ্ধ পণ্য পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কারাগার কর্তৃপক্ষ এ ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও অনেক সময় চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক ঢোকে কারাগারে। মোবাইল ফোন দিয়ে কারাগারে বসে শীর্ষস্থানীয় অপরাধীদের মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণের খবরও অজানা নয়।
নিষিদ্ধ বস্তু হওয়ায় মাদক পাচারকারীরা অভিনব সব পন্থা অবলম্বন করে পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য। কারাগারেও ঢুকছে মাদকদ্রব্য। টিফিন ক্যারিয়ারের ভেতর বিশেষ কায়দায় মোবাইল পাচার, জুতার সোল ও শুকনো খাবারের ভেতর দিয়ে মাদক পাচার হচ্ছে কারাগারে। এ ছাড়া পরিধেয় শার্টের কলার ও হাতা, প্যান্টের কোমরের অংশ এবং টিফিনবক্সের ভেতরে মোবাইল, গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ নিষিদ্ধ পণ্য কারাভ্যন্তরে নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের অপতৎপরতা বন্ধে কারা কর্তৃপক্ষকে নজরদারি বাড়াতে হবে। কারাগার হচ্ছে সংশোধনাগার। সেখানে যদি মাদক ঢোকে তাহলে অবস্থা কী হবে একবার ভাবা যায়! মাদক পাচারকারীরা আশ্রয় নেয় বিভিন্ন পন্থা ও কৌশলের। মানবশরীরের ভেতর, গোপনাঙ্গে মাদক পাচারের পন্থা পুরোনো হয়ে গেছে। এমনকি কফিনের ভেতরে মাদক পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সাপুড়েদের সাপ রাখার বাক্স থেকে, বড় মিষ্টিকুমড়ার ভেতর, মিষ্টির বাক্স, দরজার চৌকাঠের ভেতর বাক্স করে ফেনসিডিল বহনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তা ধরা পড়ে।
অ্যাম্বুলেন্স বা কফিনে মাদক বহন করা অনেক সুবিধার। এতে অনেকের চোখ ফাঁকি দেওয়া যায়। যানজটে পড়লে সাইরেন বাজিয়ে উল্টো পথেও চলে যাওয়া যায়। র্যাব-পুলিশের চেকপোস্টে তল্লাশিতেও পড়তে হয় না। কারণ কফিনবাহী একটি অ্যাম্বুলেন্সকে সাধারণ কেউ সন্দেহের চোখে দেখে না। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয় যে, মাদক ব্যবসায়ীরা মাদক পাচারের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের মতো একটি জরুরি এবং স্পর্শকাতর পরিবহন ব্যবহার করছে। এতে কোনো অ্যাম্বুলেন্সে সত্যিকারের রোগী বা কফিনের ভেতরে আসলে লাশ না অন্য কিছু আছে, এ নিয়ে সন্দেহ দেখা দেওয়াটা স্বাভাবিক। এ নিয়ে অর্থাৎ পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারকারী উভয় পক্ষকেই বিড়ম্বনায় পড়তে হবে। আর এ সুযোগটিই নেয় মাদক ব্যবসায়ীরা। এজন্য অবশ্যই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্সের মালিককেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে মাদক পরিবহনের মতো গর্হিত কাজ যাতে আর কেউ করতে সাহস না পায় সেজন্য এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবেই।
এটা খুবই আশঙ্কার বিষয় যে, বাংলাদেশে দিন দিন মাদকসেবীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদক ব্যবসার ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করতে হবে। মাদকদ্রব্য কোনো অবস্থায়ই যাতে দেশের ত্রিসীমায় ঢুকতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে যেকোনো মূল্যে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ৫০ লাখ। এর মধ্যে শিক্ষিত, অশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত, উচ্চবিত্ত, নারী-পুরুষ এবং শিশু-কিশোর থেকে সব বয়সি লোকই রয়েছে। এভাবে নেশায় দিনে অপচয় হয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা। সমাজে দেখা দিচ্ছে মারাত্মক অবক্ষয়। তরুণ প্রজন্মের বিরাট অংশ মাদকের ছোবলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বছরে মাদকের ২৫ হাজার মামলা হয়। কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অধিকাংশেরই ফাইনাল রিপোর্ট দিতে পারে না পুলিশ। ফলে অপরাধীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। তার বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও অমিত সম্ভাবনা।
মাদকমুক্ত সমাজ
গড়তে হলে মাদকদ্রব্যের প্রাপ্তি সহজলভ্য যাতে না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
যেকোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে মাদকের অনুপ্রবেশ।
দেশেও যাতে মাদকদ্রব্য উৎপাদন হতে না পারে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে।
দুঃখজনক হচ্ছে,
মাঝেমধ্যে মাদকের চালান ধরা পড়লেও তাদের মূল কুশীলবরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযোগ রয়েছে, সমাজের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের টিকি স্পর্শ করতে পারে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে মাদক সিন্ডিকেট যতই শক্তিশালী হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদকের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। মাদক কারবারিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতারও কোনো বিকল্প নেই। যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়েছে তাদেরও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সুস্থধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বাড়াতে হবে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যাও। সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করে যার যার অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করে এ যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে।
স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার শানিত প্রত্যয়ের বিপরীতে যেসব উপসর্গ জিইয়ে আছে সেসবের নিরসন করতেই হবে। সমাজের স্তরে স্তরে ছড়াতে হবে সাম্যের আলো। সবক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। সম্মিলিত প্রয়াসেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।