সংসদ সদস্য হত্যাকাণ্ড
ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৪ ১১:০৩ এএম
ড. ফরিদুল আলম
২৩ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘দেশের দাগী অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ভারত’ শিরোনামে
প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে কলকাতায় হত্যার পরিপ্রেক্ষিতে
করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের দাগী অপরাধী চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল প্রতিবেশী
দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন এলাকা। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গকে ঠিকানা করে এসব অপরাধী
চক্রের ভয়ানক অপতৎপরতা লক্ষ করা গেছে। খুন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ বাংলাদেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড
এমনকি রাজনীতিরও অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ হয় “ওপার” থেকে। অপরাধীরা সহজেই নাগরিকত্বের নথিপত্র
সংগ্রহ করে নিজেদের “ভারতের নাগরিক” দাবি
করায় বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও সব সময় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে
না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে ও প্রতিদিনের বাংলাদেশের
নিজস্ব অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।’

একজন মানুষ নির্মমভাবে
খুন হলেন, কসাই এনে লাশ টুকরো টুকরো করা হলো, এখন পর্যন্ত লাশের একটি টুকরোও উদ্ধার
করা সম্ভব হলো না! সন্তানের করুণ আর্তিÑ‘বাবাকে একটিবারের জন্য ছুঁয়ে দেখতে চাই।’ সে
উপায় নেই, নির্মমতা এবং নিষ্ঠুরতার জঘন্যতম উদাহরণ এর চেয়ে আর কী হতে পারে! যে মানুষটি
এমন নিষ্ঠুরতার বলি হলেন, তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন, আমাদের একজন আইন প্রণেতা, নির্বাচিত
সংসদ সদস্য। অথচ এ মানুষটি এমনভাবে খুন হওয়ার পরও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে সহমর্মিতা
ছাপিয়ে ক্রমাগতভাবে আলোচনায় উঠে আসছে তার সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প, যে গল্প
ধারাবাহিক নাটকের মতো রহস্যের পর রহস্যের জন্ম দিচ্ছে। মানুষের মধ্যে প্রশ্নের উদ্রেক
ঘটাচ্ছে, শঙ্কা বাড়াচ্ছে তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে এবং সর্বোপরি রাজনীতি
এখন কোন বাঁকে গিয়ে তার অবস্থান নিয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিবেশী ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয়
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছাপিয়ে অপরাধজগৎই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে কি নাÑসেসব বিষয়ও
আলোচনায় আসছে ঘুরেফিরে।
প্রশ্ন হচ্ছে—আমাদের রাজনীতি অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করে,
নাকি অপরাধজগৎ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে। বিষয়টি এ সময়ে এসে গভীর ভাবনার দাবি রাখে।
যে ব্যক্তিকে নিয়ে কথা বলছি তিনি একসময় ভিসিডি-ভিসিআরের ব্যবসা করতেন, রাজনীতি
করতেন বিএনপির আদর্শের। অন্য দেশ থেকে ভিসিডি-ভিসিআর এনে সীমান্তপথে ভারতে বিক্রি
করার মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দেশটির ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়। দেশের
রাজনীতির ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার এ ব্যবসা পুঁজি করে স্থানীয় একজন
আওয়ামী লীগ নেতার হাত ধরে যোগ দেন আওয়ামী রাজনীতিতে। একই সঙ্গে তার ব্যবসাও
নানামুখী খাতে বিকশিত হতে থাকে। ধারণা করা হচ্ছে, স্বর্ণ ব্যবসা তার আয়-উপার্জনের
প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে। এ ব্যবসা দিয়েই তিনি সম্পদের পাহাড় গড়তে থাকেন। এলাকার
বাল্যবন্ধু আক্তারুজ্জামানের সঙ্গে যৌথভাবে এ ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটান। নানা অপরাধের
একপর্যায়ে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে জারি হয় রেড নোটিস।
২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হলে তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো একের পর এক উধাও
হতে থাকে! এরই মধ্যে যে নেতার শিষ্য হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত
হয়েছিলেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে তৈরি করে ফেলেন। ইতোমধ্যে ওই নেতার
মৃত্যু হলে আওয়ামী লীগের টিকিট পেয়ে যান এবং বনে যান সংসদ সদস্য। এরপর রাজনীতিতে
তাকে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি।
জানা যায়, এলাকায় নিজেকে জনপ্রিয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন আনার।
মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতেন। এটা নিঃসন্দেহে ভালো লক্ষণ। তবে এর মধ্য দিয়ে তার সব
অপতৎপরতাও বৈধতা পেয়ে যায়। কক্সবাজারের
একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অনেক প্রমাণ পেলেও
এবং তারও দলীয় আদর্শের প্রতি আনুগত্য প্রশ্নবোধক থাকা সত্ত্বেও জনপ্রিয়তা এবং এলাকায়
প্রভাবের বিষয়টিকেই যোগ্যতার প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়েছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে
মনোনয়নবঞ্চিত করা হলেও প্রকারান্তরে বঞ্চিত করা হয়নি। তার সহধর্মিণীকে মনোনয়নদানের
মাধ্যমে আপস করা হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের রাজনীতি আপসকামিতার পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর এ আপসকামিতা হচ্ছে অর্থের সঙ্গে, বিত্তের সঙ্গে, অর্থবিত্ত দ্বারা সৃষ্ট প্রভাবের
সঙ্গে এবং এ প্রভাববলয়ের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। সংসদ সদস্য আনারকে কীভাবে, কখন এবং কারা হত্যা করেছে সে বিষয়টি নিয়ে বিস্তর সংবাদ
প্রকাশিত হয়েছে। এমনটি আমাদের গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার কিংবা
সরকারি দলের সার্বিক চেহারার খণ্ডিত চিত্র কি না, এ নিয়ে যখন কিছু মানুষ চিন্তিত,
তাদের সেই চিন্তার আগুনে আরও ঘি ঢেলে দিয়েছেন আমাদের বিরোধী বিএনপির নেতারা। সঙ্গে
সুর মেলাচ্ছেন সরকারবিরোধী আরও অনেকেই। আনারের সঙ্গে তারা সরকারি দলের অন্য সংসদ
সদস্যদের অবস্থান এবং ব্যক্তিগত জীবনের তুলনা করেছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ সবই
কেবল বিতর্কের কারণে বিতর্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।
বিগত ও বর্তমান সময়ের এমন অনেক সংসদ সদস্য রয়েছেন, যাদের
ব্যক্তিগত জীবনের মতো রাজনৈতিক জীবন যথেষ্ট পরিচ্ছন্ন। তবে রাজনীতি যে অর্থ এবং
অপরাধ দ্বারা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত, এ সত্যও অস্বীকার করব কীভাবে? সারা দেশের
রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলে আমরা যে চিত্রটি দেখতে পাই তা হচ্ছেÑরাজনীতি আজ
বিত্তশালীদের বৃত্তে বন্দি। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া রাজনীতি এবং নির্বাচনব্যবস্থা
অনেক খরুচে বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। এ সুযোগে বিএনপি ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ
সম্পর্ককে খোঁচা দিতেও ছাড়েনি। এর দ্বারা জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব সৃষ্টিরও
প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভারত-বাংলাদেশ
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে খোঁচা মেরে একজন এমপির নিরাপত্তা বিধান করতে না পারার
বিষয়টি তুলে ধরেন। সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল
কাদেরও দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিনের নিরাপদে ভারতে অবস্থান নিয়ে পাল্টা
প্রশ্ন ছুড়ে দেন। আনার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চয় উদ্বেগের ও বিব্রতকর। বিষয়টি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব সৃষ্টি করবে
কি না এ নিয়েও বিভিন্ন মহলে বিরাজ করছে নানান প্রশ্ন। এ ধরনের
প্রশ্নের নেপথ্যে অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে। আমরা অতীতে দেখেছি, অনেকেই এ দেশে অপরাধ
করে ভারতের মাটিতে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে। এমন অসংখ্য নজির রয়েছে যে তারা
নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে সেখানে বৈধতাও পাচ্ছে। ভারতের মাটিতে বসে এ দেশে খুন,
চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ অসংখ্য অপরাধ করে সেখানে আশ্রয় নিয়ে যখন তারা নাম পাল্টে
সামান্য কিছু অর্থ ব্যয় করে ভারতীয় আধার কার্ড, আই
কার্ড, প্যান কার্ড (ভোটার কার্ড), রেশন কার্ডসহ যাবতীয় কাগজপত্র জোগাড় করে ফেলে, তখন
ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু করার থাকে না।
এ ক্ষেত্রে আমরা নিশ্চয়ই ভারতের সরকারি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের
দুর্বলতার বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করতে পারি। ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের
সুসম্পর্ক বিরাজ করলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এবং সরকার পরিচালনায় আসীন তৃণমূল সরকারকে
সেখানকার বিজেপির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়ে দোষারোপ
করা হয়ে আসছিল। তাদের পক্ষ থেকে রাজ্য সরকারের আশ্রয়প্রশ্রয়ের কথা বলা হলেও, গোটা ভারতের
নিরাপত্তার সংকটের বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। কেননা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অপরাধীরা
কেবল কলকাতাতেই আবদ্ধ থাকে না, তারা চষে বেড়ায় গোটা ভারত এবং সে দেশের অপরাধজগতের সঙ্গে
মিলে নানা অপরাধকর্মে সম্পৃক্ত থাকার কথা বিভিন্ন সময় জানা যায়। এর আগে বঙ্গবন্ধুর
খুনি মাজেদ, ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনসহ বিচ্ছিন্নভাবে
কোনো কোনো অপরাধীকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা হয়। দুই দেশের মধ্যে অপরাধী প্রত্যর্পণসহ
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নিরাপত্তা ইস্যুতে কাজ করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আমরা মনে করি
না, ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে এ দেশের অপরাধীদের আশ্রয় দিচ্ছে, তবে এ দেশ থেকে সেখানে গিয়ে
আশ্রয় নেওয়া দাগী অপরাধীর সংখ্যা নিছক কম নয়।
একজন সংসদ সদস্য, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যেমনই থাকুন না কেন, বাংলাদেশের সংবিধানের বিধি অনুসারে তিনি রাষ্ট্রের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এ বিষয়টি আমলে নিয়ে ভারত সরকারের এটাই অনুধাবন করা উচিত, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে তাদের সাত রাজ্য নিয়ে যে সার্বক্ষণিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল, সেখান থেকে তারা আজ অনেকটাই নিষ্কৃতি পেয়েছে কেবল বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সহযোগী মনোভাবের কারণে। ভারত সরকারের আরও উচিত হবে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাদের দিক থেকে দৃশ্যমান সহযোগিতার মনোভাব প্রদর্শন করা এবং এটি আমাদের সঙ্গত প্রত্যাশা।