× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অর্থনীতি

উচ্চ সুদহারের ইতি-নেতি প্রভাব

আহসান এইচ মনসুর

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৪ ০৯:২৬ এএম

আহসান এইচ মনসুর

আহসান এইচ মনসুর

লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ঋণ-আমানতসহ সব ধরনের সুদহার। সেই সঙ্গে সরকারি ট্রেজারি বিলেরও সুদহার বেড়ে ১২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এতে আমানতকারীরা লাভবান হচ্ছেন, কিন্তু ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে উচ্চ সুদ দিতে চেয়েও আমানত পাচ্ছে না ব্যাংক, অন্যদিকে ঋণ সংকটে পড়ছে বেসরকারি খাত। তবে এ সুবাদে ব্যক্তি আমানতকারী ও ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ছে ট্রেজারি বিলে। বছর দুই আগেও ৯১ দিন মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল আড়াই শতাংশের কম। স্বল্পমেয়াদি এ ঋণের সুদহার এখন ১১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। মেয়াদ বেশি হলে ঋণ নিতে সরকারকে আরও বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে এটি একটি বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। আমরা কিছুটা দেরিতে হলেও সে পথেই হাঁটছি। তবে দেশে মূল্যস্ফীতি যে হারে বাড়ছে সে অনুপাতে সুদহার বাড়ানো ঠিক হয়নি বলেই অনেক অর্থনীতিবিদের অভিমত। সুদহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে এখনও নানা সংশয় রয়ে গেছে। শুধু সুদহার বাড়িয়ে আমাদের অর্থনৈতিক সংকট কাটানো সম্ভব হবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না। বরং বৈদেশিক বিনিয়োগ ও মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সুদহার বৃদ্ধির আপাতত কোনো বিকল্প নেই। দেশের ব্যাংক ঋণে যে সুদের হার রয়েছে তা বাজারভিত্তিক নয়, এ অভিযোগ বহুদিনের। আমরা বলছি স্মার্ট সুদহার, কিন্তু এ পদ্ধতিকে নানা সীমায় আটকে রাখা হয়েছে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় গত বছর। তখন অনেকেই বলেছিলেন, আরও দু-তিন বার এভাবে বাড়ানোর পর হয়তো মূল্যস্ফীতি কিছুটা সামাল দেওয়া যাবে। ১৮ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংক আমানতের সুদের চেয়ে ট্রেজারি বিলে সুদ বেশি; তাই ব্যক্তি আমানতকারীরা ব্যাংকের পরিবর্তে ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করছেন। ফলে ব্যাংকে তারল্য সংকট প্রকট হচ্ছে। ব্যাংকের প্রতি আস্থাহীনতাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। অন্যদিকে এ নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের সুযোগ নিচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক। তাই ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতের ঋণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে অনেকে। ফলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।

একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি কমিয়ে দিচ্ছে প্রবৃদ্ধি। ওই প্রতিবেদনে এও বলা হয়, ব্যাংকের বদলে ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ড ছেড়ে সরকার ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ঋণ করছে। এসব বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করলে এখন ভালো মুনাফা মিলছে। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ অনেক বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে। সুদহার বেড়ে যাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বিল-বন্ডে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বেড়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিপর্যায়েও এ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়ছে। উচ্চ সুদহারের কারণে ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তাতে ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে। কর্মসংস্থান ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সব ছাপিয়ে ব্যাংকে তারল্য সংকট একটি বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদনব্যবস্থায়। ফলে দ্রব্যমূল্যও বাড়ছে। উৎপাদনের সঙ্গে সমন্বয় করতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে।

প্রতি বছর মাত্র ৩ শতাংশ হারে শ্রমবাজারে কর্মীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। অর্থাৎ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না বলা চলে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলেও সেখানে মানুষের অংশগ্রহণও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সীমিত। বৈদেশিক বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে পড়ছে। আমরা দেখছি, রাজস্ব ঘাটতি সত্ত্বেও সরকার প্রতি বছর আরও বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করছে। প্রতি বছরই বাজেটে বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এ ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, দেশের মুদ্রাবাজারে টাকা নেই। তাই উচ্চ সুদে সরকার ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। এত বেশি সুদে ঋণ নেওয়ায় সংকট আরও তীব্র হবে। সরকার ১১ শতাংশের বেশি সুদে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিচ্ছে। এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার ৮ শতাংশ। যেকোনো ব্যাংকের কাছে এখন সরকারই সবচেয়ে বড় ভোক্তা। ব্যক্তি খাতে ঋণ দেওয়ার কোনো প্রয়োজনীয়তাই ব্যাংকের এখন নেই। ফলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়ে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ নেই। পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্টদের ব্যবসাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দিয়েছে। সে ঋণ দেশের মূল্যস্ফীতি উস্কে উঠতে সহায়তা করেছে। এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তারা নতুন টাকা ছাপাবে না। তার মানে বাজার থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতে যে পরিমাণ আমানত বাড়বে, তার পুরোটাই সরকারের ঋণে চলে যাবে। সংগত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায়- ব্যক্তিঋণ খাতের পরিস্থিতি কেমন হবে। স্মরণে আছে, শ্রীলঙ্কা তাদের অর্থনৈতিক সংকটের কারণ দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করতে পেরেছিল। সংকট কাটাতে দূরদর্শী ও ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কারণে মূল্যস্ফীতির হার ১ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনতে পেরেছে। কিন্তু আমরা এখনও সংকটের কারণই অনুসন্ধান করে চলছি। সুদহার বাড়ানোসহ যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো যথেষ্ট নয়। বাজেট ঘাটতি মেটাতে চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে। লক্ষ্যের চেয়েও ব্যাংক খাত থেকে সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হতে পারে। দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ঘরে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে ব্যাংকগুলোয় দেড় লাখ কোটি টাকার আমানত বাড়লে তার প্রায় সমপরিমাণ ঋণ কেবল সরকারকেই নিতে হবে। সরকার নিজেই যদি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাহলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক খাতে উদ্যোক্তা কিংবা বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও জটিলতার মুখে পড়তে পারে। এ মুহূর্তে শুধু সংকট সমাধানের শঙ্কায় আটকে থাকলে হবে না। বরং আমাদের সুষ্ঠু সমাধানের দিকে এগোতে হবে।

দেশের অর্থনীতিতে খেলাপি ঋণ আরেকটি বড় সংকট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফে ঋণখেলাপিদের যে তথ্য উপস্থাপন করা হয় তার মধ্যে অধিকাংশই ব্যাংক খাত সম্পর্কে সচেতন নয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পর ঋণখেলাপি না হওয়ার বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্যও অধিকাংশের থাকে না। এ ধরনের ব্যক্তিদের ঋণের পরিমাণও অল্প। কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানই মূলত এ ঋণ নিয়েছে। তবে আইনের নানা সুবিধা দিয়ে এ ধরনের ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে ঋণখেলাপি দেখানো হয় না। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণখেলাপিদের যে সংখ্যা দেখিয়েছে, বাস্তবে তার সংখ্যা আরও বেশি। বিশ্বের কোনো ব্যাংকিং খাতই খেলাপি ঋণমুক্ত নয়। তার পরও তা সহনীয় মাত্রায় থাকা জরুরি। সচরাচর কোনো দেশে খেলাপি ঋণ ২ থেকে ৩ শতাংশ হলে তাকে সহনীয় মাত্রায় আছে বলে ধারণা করা হয়। খেলাপি ঋণের সমস্যা কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। কাজেই খেলাপি ঋণ থেকে ব্যাংকিং সেক্টরকে মুক্ত করতে হলে একটি মাত্র ব্যবস্থা গ্রহণ করলে হবে না। এজন্য অনেক ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য যেখানে যেমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, আমাদের তা করতে হবে।

এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি করতে হবে যাতে ঋণখেলাপিদের মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে তা পরিশোধ করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতিতে সরকারের ঋণ একটি বড় সংকট। দিনদিন ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এর বিপরীতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়ছে না। দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ অনেক জরুরি। বৈদেশিক বিনিয়োগ অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উৎপাদন কার্যক্রম বাড়ানোর বাড়তি শক্তি জোগায়। সরকার নিজেই যখন ঋণের দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে তখন সঙ্গত কারণেই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হয়ে থাকে। ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে তাদের তেমন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগও এখন নেই। কারণ অর্থনীতি এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছে গেছে যে, মূল্যস্ফীতি কমাতে অন্য সব বিষয়ে ছাড় দিতে হবে। অর্থনীতিতে একই সময়ে সবকিছু একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে আমাদের প্রবৃদ্ধিকে ছাড় দিতে হবে। কিন্তু তার আগে আর্থিক খাতে সুশাসন ও তারল্যসংকট মেটানোর জন্য যা কিছু করণীয় তা করতে হবে। অবলোপন ঋণ, ঋণখেলাপি ও ব্যাংক খাতে নয়ছয়ের যে অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমান কর্মসংস্থান ঠিক থাকলেও সার্বিক কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে বলে গণ্য করতে হবে। নতুন কর্মীদের কাজ দিতে না পারলে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ক্রমেই শ্লথগতির হয়ে পড়ছে। আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনার পথ মসৃণ করার পাশাপাশি দুর্নীতি বন্ধের মাধ্যমে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা জরুরি। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বৈদেশিক আয় বাড়ানো, ব্যক্তি পর্যায়ে ঋণ বিতরণ, ঋণ আদায়- এসব বিভিন্ন মেয়াদে ভাগ করে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যদি তা না করা যায়, তাহলে আমাদের অর্থনীতি বিরাট ক্ষতির মুখোমুখি হবে।

  • অর্থনীতিবিদ
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা