× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইসরায়েলি গোপন কারাগার

মানবিকতার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য অপরাধ

জনাথন কুক

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৪ ০৯:২০ এএম

জনাথন কুক

জনাথন কুক

আজ থেকে ২১ বছর আগে নভেম্বরের এক কুয়াশাচ্ছন্ন দিনে নিজেকে আত্মগোপন রাখার প্রাণপণ চেষ্টার কথা আজও মনে পড়ে। ইসরায়েলের গ্রামীণ জনপদ গ্যালিলের এক কমলাবাগানে অবস্থান করছিলাম। দ্রুততার সঙ্গে একটা পোড়ো কংক্রিটের ভবনের ছবি তুলে নিই। কোনো ম্যাপে ভবনটির অস্তিত্ব তখন ছিল না। এমনকি সড়ক নির্দেশক থেকেও ফ্যাসিলিটি ১৩৯১-এর নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় হারেতজ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এখানেই গুপ্ত কারাগার রয়েছে। তখন থেকেই আর কারাগারটির অস্তিত্ব নেই মানচিত্রে। ফ্যাসিলিটি ১৩৯১ আবিষ্কারকদের মধ্যে আমিই প্রথম বিদেশি সাংবাদিক। কারাগারটির বিশাল একটি অংশ সুকৌশলে গোপন রাখা হয়েছে ১৯৩০ সাল থেকে। ব্রিটিশ শাসনামলে বিদ্রোহী ফিলিস্তিনিদের নির্মম নির্যাতন করা হতো এখানে। ব্রিটিশদের পর ইসরায়েলিরা অধিকাংশ আরব কারাবন্দিকে এখানে চালান করে দিতে শুরু করে। ইসরায়েলের আদালত, রেড ক্রস কিংবা মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এ কারাগারের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানত না। কারাগারের অধিকাংশই লেবানিজ হলেও জর্ডান, সিরিয়া, মিসর আর ইরানের নাগরিকদেরও এখানে বন্দিদশায় রাখা হতো। ওই বছর ওয়াশিংটন ইরাকে অভিযান পরিচালনা করলে জায়গাটিকে ‘ব্ল্যাক সাইট’ বলে অভিহিত করা হয়। ফ্যাসিলিটি ১৩৯১-এ কতজন কারাবন্দি ছিলেন কিংবা তাদের কত দিন ধরে আটকে রাখা হয়েছিলÑএ ব্যাপারে কোনো তথ্যই আমরা পাইনি। ‘ব্ল্যাক সাইট’ সম্পর্কে যা জানা গেছে তা হলো, এ কারাগারে বন্দিদের বাহ্যিক পৃথিবীর যেকোনো সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা হতো। বন্দিদের কালো গগলস পরিয়ে রাখা হতো সব সময়। শুধু অত্যাচারের সময়ই তারা আলোর সন্ধান পেত। সে দূর অতীতের কথা।

ফ্যাসিলিটি ১৩৯১-এর প্রসঙ্গ তুলে আনাটা বোধহয় এখন আর অবান্তর নয়। চলতি মাসে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলের নতুন গুপ্ত কারাগার সদে তেইমানের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। এ কারাগারে শুধু বিদেশিই নয়, ফিলিস্তিনিদেরও আটকে রাখা হয়। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অভিযানে এ বন্দিদের আটক করা হয়েছে। ‘ব্ল্যাক সাইট’ ওই সময় যতটা আলোড়ন তুলেছিল, নতুন গুপ্ত কারাগারের সংবাদটি পশ্চিমা গণমাধ্যমে অতটাও গুরুত্ব পায়নি। সিএনএনের ইসরায়েলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব নতুন নয়। তার পরও তারা অনুসন্ধানী একটি প্রতিবেদন করতে পেরেছে। এজন্য তাদের সাধুবাদ জানাতেই হয়। ‘পিছমোড়া করে বাঁধা, চোখে পট্টি, পরনে ডায়াপার’ শিরোনামে প্রকাশিত দীর্ঘ প্রতিবেদনে নতুন এ কারাগার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত এ গুপ্ত কারাগারে কতজন বন্দি রয়েছেÑএ বিষয়ে কোনো তথ্য অবশ্য মেলেনি। তবে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিতে দেখা গেছে, কারাগারটি ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত এ কারাগারে বন্দি বাড়ছে। গত বছর নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অনেক ফিলিস্তিনিই তাদের এ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু তখন পশ্চিমা গণমাধ্যম তাদের কথায় ভ্রুক্ষেপই করেনি। কয়েক সপ্তাহ আগে সদে তেইমানের কর্মীরাও এ কারাগারে হিংস্র কর্মকাণ্ডের কথা প্রকাশ করতে শুরু করে। সিএনএন বাদে আর কেউ তাদের কথায় গুরুত্ব দেয়নি।

পশ্চিমা গণমাধ্যম ইসরায়েলের হিংস্রতার খবর নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এখনও শুরু করেনি। পশ্চিমা গণমাধ্যম এখন শুধু ফিলিস্তিনিদের দৈন্যদশার কথা বলায় ব্যস্ত। তারা ক্ষুধার্ত, মানবিক ত্রাণ ও সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে নাÑএমন খবরই বেশি দেখতে পাওয়া যায়। তারা এমন অবস্থাকে ‘মানবিক সংকট’ বলে অভিহিত করছে। মনে হচ্ছে, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফিলিস্তিনিদের এ দুর্দশা। পশ্চিমা শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে সরাসরি এ কাজে সহায়তা করছেÑএ খবর প্রচারেও পশ্চিমা গণমাধ্যম কুণ্ঠা বোধ করছে। বাইডেন প্রশাসন যে সুরে বক্তব্য দিয়ে থাকে ঠিক সেভাবেই তারা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড উল্লেখ করছে। অনেক সময় তারা এককানাভাবে বলছে, ইসরায়েল ‘সম্ভবত’ যুদ্ধাপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের এ অপরাধের কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারকরা সুষ্ঠুভাবে বিচারকার্য সম্পাদন করতে পারছেন না। গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের স্বচ্ছ সংবাদ পরিবেশনে তাদের এ অবস্থান কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কেন? কারণ পশ্চিমা গণমাধ্যম এমন ধরনের বর্ণনায় বিশ্বাসী যা পশ্চিমা ক্ষমতাকাঠামো পোক্ত করে তোলে।

সিএনএনের ওই প্রতিবেদনে অল্প কজনই জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের মুখেই জানা গেছে, সদে তেইমানে বন্দিদের অকথ্য নির্যাতন সইতে হচ্ছে। তাদের চোখ বেঁধে রাখা হচ্ছে। মরুভূমিতে রাতে প্রবল ঠান্ডায় তাদের পাতলা ম্যাট্রেসে শুতে দেওয়া হচ্ছে। কেউ অভিযোগ জানালে তাদের পিটিয়ে ঘাড় গুঁড়ো করে দেওয়া হয়। তথ্য সংগ্রহের নামে এ বন্দিদের ওপর প্রতিশোধ ও আক্রোশ মেটানো হচ্ছে। প্রতিশোধ বলে রায় দিলে বিষয়টিকে খাটো করে দেখা হয়। বরং শিল্প খাতের দৃষ্টিকোণ বিচারেও এ কারাগারের কার্যক্রম খতিয়ে দেখলে গাজা যুদ্ধের অবস্থা বোঝা সম্ভব। কারাগারে বন্দিরা নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করবে। তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এমনকি মাংস মেডিকেল পরীক্ষার কাজে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। একজনের জবানবন্দি অনুসারে, কারাগারটি ইতোমধ্যে ইসরায়েলি ইন্টার্নদের স্বর্গভূমি হয়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনিদের শুধু ‘ল্যাব র‍্যাট’ বানিয়ে রেখেই তারা ক্ষান্তি দেয়নি। ইন্টার্নদের যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই পরীক্ষানিরীক্ষা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো চেতনানাশক ছাড়াই পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

সম্প্রতি ইসরায়েল ফিলিস্তিনের অনেক হাসপাতালে হামলা চালায়। এসব হামলায় বহু চিকিৎসককে অপহরণ করে গুপ্ত কারাগারে নিয়ে আসার অভিযোগও রয়েছে। মানবিকতার বিরুদ্ধে এমন ঘৃণ্য অপরাধের বিষয়টিও পশ্চিমা গণমাধ্যমের নজর যেন এড়িয়ে গেছে। অথচ কদিন আগেও ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধ নিয়ে তারা সরব হয়ে উঠেছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো অবশ্য ফিলিস্তিনি কারাবন্দিদের অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণের সময় আচমকা গুপ্ত কারাগারের সংবাদ যে-কাউকেই বিস্মিত করার কথা হলেও তা যেন করেনি। ইসরায়েল হামাসকে ধ্বংস করার পরিকল্পনায় ব্যস্ত। তবে ইসরায়েলিরা হামাসের যাদের ধরতে পারছে তাদের কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না। অন্যদিকে হামাস ইসরায়েলি বন্দিদের যতটা সম্ভব নিরাপদে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ বন্দিদের তারা মূলত সদে তেইমানে আটক বন্দিদের উদ্ধারের জন্য বহুদিন ধরে রাখছে। ইসরায়েলের তা নিয়ে অবশ্য মাথাব্যথা নেই। ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার জন্য তারা সবকিছু করতে বদ্ধপরিকর। পশ্চিমা গণমাধ্যম এ বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিতে পারছে না।

  • সাংবাদিক

মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা