প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৩ ২০:৫৯ পিএম
আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৩ ১৪:৩২ পিএম
ফেরদৌসী মজুমদার
ফেরদৌসী মজুমদার একজন প্রখ্যাত অভিনেত্রী। স্বাধীনতা-উত্তরকালে টিভি ও মঞ্চে সমানতালে তিনি অভিনয় করে যাচ্ছেন। শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাস ‘সংশপ্তক’ উপজীব্য করে নির্মিত একই নামের ধারাবাহিক নাটকে ‘হুরমত’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকপ্রিয় হন।
ফেরদৌসী মজুমদারের জন্ম বরিশালে হলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল নোয়াখালীতে। ফেরদৌসী মজুমদারের পরিবার ছিল খুব রক্ষণশীল। বাড়িতে সাংস্কৃতিক চর্চা ছিল নিষিদ্ধ। তাঁর লেখাপড়া শুরু হয় নারীশিক্ষা মন্দির স্কুল থেকে। এই স্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ার পর তিনি ভর্তি হন মুসলিম গার্লস স্কুলে। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন ইডেন কলেজে।
ইডেন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় তিনি তাঁর বড় ভাই শহীদ মুনীর চৌধুরী তাঁকে ‘ডাক্তার আবদুল্লাহর কারখানা’ নামের একটি নাটকে রোবটের চরিত্রে অভিনয় করার কথা বলেন। নাটকটি লিখেছিলেন শওকত ওসমান। এটি মঞ্চস্থ হয়েছিল বর্তমান জহুরুল হক হলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তিনি পাবলিক লাইব্রেরিতে ‘দণ্ড ও দণ্ডধর’ নাটকে অভিনয় করেন তাঁর শিক্ষক রফিকুল ইসলামের বিপরীতে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা নাটকের ফোরামে তিনি জড়িয়ে পড়েন। এরপর ফেরদৌসী মজুমদার অভিনয় করেন নীলিমা ইব্রাহিমের লেখা ‘তামসি’ নাটকে। পরিবারের অমতে ১৯৭০ সালে বিয়ে করেন রামেন্দু মজুমদারকে। ১৯৭১ সালের শুরুতে পাকিস্তানের করাচিতে গিয়ে একটি অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মে কাজ শুরু করেন। এবং মার্চ মাসের শুরুতে দেশে ফিরে আসেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুনীর চৌধুরী ছাড়া তাঁর পরিবারের সবাই কলকাতা চলে যান।
১৯৭২ সালে আবদুল্লাহ আল মামুন ও রামেন্দু মজুমদার গঠন করেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নাট্যদল ‘থিয়েটার’। ফেরদৌসী মজুমদার সেই দলে যোগ দেন। তিন দশকের অভিনয়জীবনে টেলিভিশন ও মঞ্চে ৩শর বেশি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। যার মধ্যে অন্যতমÑ কোকিলারা, এখনো ক্রীতদাস, বরফ গলা নদী, জীবিত ও মৃত, বাঁচা, অকুল দরিয়া, যোগাযোগ, চোখের বালি, নিভৃত যতনে, এখনও দুঃসময়, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। নাটক ছাড়াও কয়েকটি সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন এই গুণী অভিনেত্রী।
কর্মময় জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ফেরদৌসী মজুমদার ১৯৯৮ সালে লাভ করেছেন একুশে পদক, ২০১৮ সালে শহীদ আলতাফ মাহমুদ স্মৃতিপদক, ২০২০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার এবং ২০২১ সালে আত্মজীবনীতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার।
রুনা লায়লা
রুনা লায়লা, বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের একজন কিংবদন্তিতুল্য শিল্পী। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক, পপ ও আধুনিক সংগীতের জন্য তিনি বিখ্যাত।
১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের সিলেটে জন্ম নেওয়া রুনা লায়লা শ্রোতাদের মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বাংলা, হিন্দি, উর্দু, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, বেলুচ, আরবি, মালয়ালম, নেপালি, স্প্যানিশ, ফরাসি ও ইংরেজিসহ অনেক ভাষায় গান গেয়েছেন ‘গানের পাখি’ রুনা লায়লা। মোট ১৮টি ভাষায় ১০ হাজারেরও বেশি গান করেছেন তিনি।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তানি চলচ্চিত্র ‘জুগনু’তে প্রথম প্লেব্যাক করেন রুনা লায়লা। ১৯৬৬ সালে উর্দু ভাষার ‘হাম দোনো’ চলচ্চিত্রে ‘উনকি নাজরোঁ সে মোহাব্বত কা জো পয়গম মিল’ গান দিয়ে সংগীতাঙ্গনে আলোচনায় আসেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালে তিনি জিয়া মহিউদ্দিন শোতে গান পরিবেশন করতেন এবং ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেওয়া শুরু করেন। ‘এক সে বাড়কার এক’ চলচ্চিত্রের শীর্ষ গানের মাধ্যমে সংগীত পরিচালক কল্যাণজি-আনন্দজির সঙ্গে প্রথম কাজ করেন রুনা লায়লা। এই গানের রেকর্ডিংয়ের সময় প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী লতা মুঙ্গেশকর তাকে আশীর্বাদ করেন। রুনা ‘ও মেরা বাবু ছ্যাল ছাবিলা’ ও ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গান দুটি দিয়ে ভারত এবং পাকিস্তানজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এরপর আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৭০ সালের মধ্যেই তিনি প্রায় এক হাজার গান রেকর্ড করে ফেলেন।
রুনা লায়লা ১৯৭৪ সালে বাবার পরামর্শে সপরিবারে বাংলাদেশে চলে আসেন। প্রয়াত সত্য সাহার সুরে ‘জীবন সাথী’ ছবিতে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক করেন তিনি। গানের কথা ছিল ‘ও জীবন সাথী তুমি আমার’, এই গান তাকে অসম্ভব জনপ্রিয় করে তোলে। পাকিস্তানের অনেক মানুষ ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গানটা এখনও তার কণ্ঠেই শুনতে চান, ভারতে ‘ও মেরে বাবু ছ্যাল ছাবিলা’ শুনলে এখনো নেচে ওঠেন অনেকে। ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গানটির জন্য ভারতে তার নাম হয়েছিল ‘দামদাম গার্ল’। আর দুই বাংলাতেই তো কত জনপ্রিয় গান তাঁরÑ ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাবো’, ‘পান খাইয়া ঠোঁট লাল করিলাম’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘সাধের লাউ’, ‘এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না’, ‘বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম’, ‘যখন আমি থাকবো না গো’...।
এ ছাড়াও অসাধারণ কিছু দেশাত্মবোধক গানও গেয়েছেন। তাঁর গাওয়া ‘প্রতিদিন তোমায় দেখি সূর্য রাগ’, ‘আমায় গেঁথে দাও না মাগো’, ‘আমার মনপাখিটা যায়রে উড়ে যায়’, ‘স্বাধীনতা এক গোলাপ ফোটানো দিন’, ‘নদীর মাঝি বলে এসো নবীন’সহ আরও বেশকিছু দেশাত্মবোধক গান ব্যতীত বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো কল্পনা করা যায় না। গানে তিনি বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন।
বাংলাদেশে সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার লাভ করেছেন। ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন। এ ছাড়া ভারত থেকে সায়গল পুরস্কার, পাকিস্তান থেকে নিগার পুরস্কারসহ বিদেশ থেকেও অনেক স্বীকৃতিই পেয়েছেন তিনি।