নাসির উদ্দীন ইউসুফ
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৩ ২০:৪৮ পিএম
আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:২৭ পিএম
জয়া আহসান এখন দুই বাংলায় শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। এটি আমাদের জন্য দারুণ আনন্দের ও গৌরবের। সততা, বিশ্বাস ও পরিশ্রমকে সঙ্গে নিয়ে সে দিনকে দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে সে যদি এমন আরও অনেক আইকনিক চরিত্রে অভিনয় করে তাহলে নিজের প্রতি সুবিচার করবে বলেই আমার মনে হয়।
জয়া আহসানকে প্রথম চিনি টেলিভিশন নাটকের মাধ্যমে। ছোটপর্দায় তার বেশ কিছু নাটক দেখেছিলাম। সে সময় মনে হয়েছে, জয়া চরিত্রের গভীরে গিয়ে কাজ করার ক্ষমতা রাখে। তার অভিনয়ের পারঙ্গমতা ভাবিয়েছে, ছোটপর্দার চাইতে বড়পর্দায় সে অনেক বেশি সফল হবে। টেলিভিশনে চরিত্রের গভীরতা ফুটিয়ে তোলা কিছুটা কষ্টসাধ্য বটে। তবে সে চেষ্টা করেছে। জয়ার অভিনীত ‘তবুও আঙ্গুরলতা নন্দকে ভালোবাসে’ আমার প্রথম দেখা নাটক। এরপর ‘সংশয়’ শিরোনামে আরও একটি নাটক দেখেছিলাম। এগুলো দেখে মনে হয়েছে, সে একেবারে ভিন্ন ঘরানার অভিনয়শিল্পী।
‘গেরিলা’ সিনেমাটি নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল অনেক দিনের। কিন্তু কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাস্টিংয়ের জন্য উপযুক্ত অভিনয়শিল্পীকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন শিমুল ইউসুফ পরামর্শ দিল- জয়া আহসানকে দিয়ে চরিত্রটি করানো যেতে পারে। ও ভালো কত্থক নাচ করে। এরপর জয়াকে বলা হলো একটি ওয়ার্কশপে অংশ নিতে। এতে সিনেমার সংলাপ, ক্যারেক্টারাইজেশন নিয়ে আলোচনা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল, ষাট-সত্তর দশকের নারীদের জীবনযাপন, দর্শন নিয়ে ওর সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। ওয়ার্কশপে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বই, ছবি বের করে অনেক আলোচনা হয়েছিল তার সঙ্গে। ওয়ার্কশপ থেকে শুরু করে স্ক্রিপ্ট রাইটিং, প্রতিটি জায়গায় সে ছিল ভীষণ মনোযোগী। ‘গেরিলা’ সিনেমার জার্নি ছিল প্রায় এক বছরের। পুরোটা সময় সে কখনও অহেতুক ছুটি নেওয়া কিংবা অন্য কোথাও কাজ করা, এসব করেনি। কখনও বিশেষ কারণে ছুটির প্রয়োজন হলে ইউনিটকে আগে জানিয়েছে। তার এই নিষ্ঠা ছিল চোখে পড়ার মতো।
এটা সত্যি, মুক্তিযোদ্ধারা একাত্তরকে যেভাবে অনুভব করে, পরের প্রজন্ম একইভাবে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই অনুভব করতে পারে না। যেহেতু তারা স্বচক্ষে মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। নির্মাতা হিসেবে আমার কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, অনুভূতি শিল্পীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার। এক্ষেত্রে স্তানিস্লাভোস্কির অভিনয়রীতির ধারা অনুসরণ করেই জয়াকে চরিত্রায়নের ব্যাপারে বোঝানো হয়েছিল। কারণ জয়া আহসান থেকে বিলকিস বানুর চরিত্র ট্রান্সফরমেশন তো চাট্টিখানি কথা নয়। যেখানে দুটি চরিত্রের সময়কাল, ব্যক্তিত্ব সবকিছুর বিস্তর ফারাক। যেহেতু সে প্রতিভাবান শিল্পী। তার ক্ষেত্রে চরিত্রটি দ্রুত তুলে ফেলা সম্ভব হলো।
নির্দেশকের কথা শুনেই যে একজন অভিনয়শিল্পী ভালো পারফরম্যান্স করবেন তা আমি বলছি না। ন্যূনতম মেধা ও তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ পরিশ্রমী মনোভাবাপন্ন মানুষই একজন সুশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। জয়ার মধ্যে পরিশ্রম করার মানসিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। একটা ঘটনা মনে পড়ল, জুন-জুলাইয়ে তপ্ত গরমে পাকিস্তান আমলের মেরামত করা একটি ট্রেনে আমরা দিনের পর দিন শুটিং করছিলাম। এমন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই সে অভিনয়কৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগ করছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিলÑ আবেগের যথাযথ প্রয়োগ বিলকিস চরিত্রটিতে করেছে জয়া। তা না হলে মেলোড্রামা হয়ে যেত। বিলকিস ক্যারেক্টারটি ভীষণ আবেগী চরিত্র। চরিত্রটির ব্যাপারে খালেদ মোশাররফ বলেছিলেন সৈয়দ শামসুল হককে, আখাউড়াতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি মেয়েকে ধর্ষণ করতে চেয়েছিল, ধর্ষনের মুহুর্তে কৌশলে বিলকিস পাকিস্তানি আর্মিকে জাপটে ধরে ভাইয়ের চিতায় লফিয়ে পড়ে। সেনা সদস্যকে হত্যা করে এবং সে আত্মাহুতি দেয়। আমি এখানে কিছুটা পরিবর্তন এনে দেখিয়েছি- আত্মাহুতি দেয়। এই যে পুরো বিষয়টিতে নানা টানাপড়েন, তা জয়া দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকী চরিত্রটিকে চরিত্রাভিনয়ের মাধ্যমে মূর্ত করে তোলা সত্যিই প্রশংসনীয়।
জয়া আহসান এখন দুই বাংলায় শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। এটি আমাদের জন্য দারুণ আনন্দের ও গৌরবের। সততা, বিশ্বাস ও পরিশ্রমকে সঙ্গে নিয়ে সে দিনকে দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে সে যদি এমন আরও অনেক আইকনিক চরিত্রে অভিনয় করে তাহলে নিজের প্রতি সুবিচার করবে বলেই আমার মনে হয়। শিল্প তো সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়েই হয়। খুব কম শিল্পী মানুষকে ভাবাতে পারে, সাধারণের সঙ্গে কানেক্টেড থাকতে পারে। জয়া তেমনই এক শিল্পী। যার কাছে তরুণ প্রজন্মেরও শেখার অনেক কিছু আছে। তার ব্যক্তিত্ব, অভিনয়দর্শন নতুনদের কাছে অনুসরণীয়।