আলাউদ্দিন আরিফ ও শহিদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৪ ১০:৪৭ এএম
সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। ছবি : সংগৃহীত
সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের শেকড় অনেক গভীরে বলে আভাস দিয়েছেন গোয়েন্দারা। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আন্তঃদেশীয় অপরাধী চক্র জড়িত থাকারও তথ্য মিলেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাসহ সবকিছু ‘কাটআউট’ পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন হওয়ায় অনেক তথ্য পাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এ যাবৎ তথ্যে মনে হচ্ছে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও যশোর সীমান্ত কেন্দ্রিক স্বর্ণ, মাদক এবং হুন্ডি কারবারের নিয়ন্ত্রণ; আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যেই আনারকে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে স্বর্ণ ও হীরার শীর্ষস্থানীয় কয়েক ব্যবসায়ী এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপ্রতিনিধি জড়িত। জনপ্রনিধিদের মধ্যে যশোর ও ঝিনাইদহের সাবেক দুই এমপিরও সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত মিলেছে। এই পুরো চক্রকে পর্যায়ক্রমে তদন্তের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
দুই এমপি ও প্রভাবশালী দুই ব্যবসায়ীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আনার কিলিং মিশনে দুটি গ্রুপ কাজ করেছে। একটি গ্রুপ মদদ দিয়েছে, আরেকটি গ্রুপ বাস্তবায়ন করেছে। মদদদাতা আক্তারুজ্জামান শাহীন ৩০ এপ্রিল কলকাতায় তিন সদস্যকে নিয়ে যান। সেই দলে একজন মেয়েও ছিল। শাহীনের সঙ্গে মদদদাতা ও খুনের নির্দেশদাতা আরও কারা ছিল সেটা জানার চেষ্টা চলছে। তদন্তে নেমে আমরা নানান তথ্য পাচ্ছি। গণমাধ্যমেও নানান তথ্য আসছে। সেগুলোও বিচার বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যারাই সম্পৃক্ত থাকুক তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আনার হত্যার অনেক মোটিভ থাকতে পারে। পূর্বশত্রুতার জের, আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক বিষয়ও থাকতে পারে। এসব বিষয় জানতে তদন্ত চলছে।’
গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য ভারতে যান ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। ১৩ মে তিনি কলকাতায় খুন হয়েছেন বলে ২০ মে নিশ্চিত করে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের পুলিশ। খুনের পর তার মরদেহ টুকরা করে হাড়-মাংস আলাদা করা হয়। দেহের খণ্ডিত অংশগুলো ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঝোপজঙ্গল ও খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে। গত তিন দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন খাল ও জঙ্গলে আনারের দেহাবশেষের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে সেখানকার পুলিশ। হত্যায় জড়িত জাহিদকেও গতকাল আটক করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। তবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি স্বীকার করেনি। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে কলকাতায় একজন নারীও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে আটক আছেন বলে সেখানকার সাংবাদিকরা জানিয়েছেন।
ভারতীয় পুলিশের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে ডিবি পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল আজ পশ্চিমবঙ্গে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাবেন বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে আনার হত্যায় জড়িত সন্দেহে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ৩ জন ৮ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গতকাল ছিল রিমান্ডের প্রথম দিন। অপর দিকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া মুম্বাইয়ের কসাই জিহাদ ১২ দিনের রিমান্ডে আছে। ডিবি পুলিশ বলছেন, হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহীন ইতোমধ্যে আমেরিকায় আত্মগোপন করেছেন। খুনের পরিকল্পনাকারী কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়রের ভাই ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এই শাহীন। কোটচাঁদপুর মানুষের কাছে রহস্যময় চরিত্র শাহীনের পূর্ববর্তী ক্রিমিনাল রেকর্ড পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সূত্র জানায়, তার সঙ্গে আনারের হুন্ডি ও সোনা কারবারের অর্থ নিয়ে বিরোধ ছিল। এমপি আনারের বাল্যবন্ধু শাহীন। তিনি কেন আনারকে হত্যা করেছেন? তাকে কেউ নির্দেশ দিয়েছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দারা বলেন, ‘অনেক তথ্যই আমরা পাচ্ছি। কুখ্যাত চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়া ওরফে আমানুল্লাহ সাঈদকে কিলিং মিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেন শাহীন। তারা দুজন মিলে সিয়াম, জিহাদ, ফয়সাল ওরফে তানভীর ও মোস্তাফিজুর রহমান ফকির নামে কয়েকজনকে ভাড়া করেন। পুরো কিলিং মিশনে অংশ নেন মোট সাতজন। ৩০ মে শাহীন তার দুই সহযোগী আমানুল্লাহ, সেলে নিস্কি ওরফে সেলেস্তিকে সঙ্গে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে যান। সেখানে মাসে এক লাখ রুপিতে নিউটাউন এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া করে আমানুল্লাহ ও সেলে নিস্কিকে রেখে ১০ মে শাহীন দেশে ফেরেন। গুলশানের ফ্ল্যাটে বসে কিলিং মিশন পর্যবেক্ষণ করেন শাহীন।
প্রশ্ন উঠেছে শাহীন একাই খুনের পরিকল্পনাকারী নাকি তার সঙ্গে আর কেউ আছে ? এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ‘শাহীন পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে কাটআউট পদ্ধতিতে। যারা কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করেছে তারা সবাই ভাড়াটে কিলার। এরা পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর শাহীনের নাম বলেছে। শাহীনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অন্য কারা আছে সেটা জানা যাবে। তবে শাহীন কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করে ২০ মে বা তারও আগে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ‘আমরা বিভিন্ন সূত্র থেকে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার সঙ্গে গুলশানের একজন ডায়মন্ড ব্যবসায়ী (যার বাড়ি বৃহত্তর যশোর এলাকায়), ঢাকার একজন শিল্পপতি, একজন ডেভেলপার ব্যবসায়ী, চুয়াডাঙ্গা ও যশোরের সাবেক দুজন সংসদ সদস্যের সম্পৃক্ততার তথ্য পাচ্ছি। তাদেরকে প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হবে।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘খুনের প্রকৃত মোটিভ জানার জন্য শাহীনের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাইবে।’
আড়াই কোটি টাকা পেয়েছিল ঘাতকরা
আনার অপহরণ মামলার তদারকিতে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, আনার কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করতে বাস্তবায়নকারী ঘাতকদের সঙ্গে ৫ কোটি টাকার চুক্তি করে শাহীন। এর মধ্যে আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল, জিহাদ, সিয়াম, ফয়সালসহ অন্যদেরকে আড়াই কোটি টাকা দিয়েছিল শাহীন। অবশিষ্ট টাকা কিলিং মিশন বাস্তবায়ন হওয়ার পর দেওয়ার কথা ছিল। শাহীনের বসুন্ধরার ফ্লাট থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরিতে কাকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে তারও বিবরণ রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
তৃতীয় পরিকল্পনায় সফল ঘাতকরা :
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে আরও দুই দফায় আনারকে হত্যার চেষ্টা করে ঘাতকরা। চলতি বছরের ১৭ থেকে ১৮ জানুয়ারি তিনি কলকাতায় যান। সেই সময়ে হত্যাকারীরাও তাকে খুনের উদ্দেশ্যে কলকাতায় গিয়েছিল। কিন্তু হোটেলে থাকার কারণে ঘাতকদের ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তৃতীয় ধাপে গত ১৩ মে তারা সফল হয়। গতকাল ডিবি কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে হারুন অর রশীদ বলেন, ‘শুধু হত্যাই নয়, আসামিদের পরিকল্পনা ছিল আনারকে জিম্মিকে করে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। ওই অর্থ ঘাতকদের দিয়ে দেওয়া হতো। শাহীনের পাতা হানি-ট্রাপে পা দিয়ে ভারতে যান আনার। তাদের পরিকল্পনা ছিল ১৩ মে খুন করার আগে আনারকে জিম্মি করা হবে। আনারের আপত্তিকর ও অন্তরঙ্গ ছবি তুলে দুই দিন রেখে ব্ল্যাকমেইল করা হবে। ওই সময় হুন্ডির মাধ্যমে দেশ থেকে এবং কলকাতায় থাকা আনারের বন্ধুদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করতে চেয়েছিল ঘাতকরা। কিন্তু ঘটনার দিন নিউটাউনের ফ্ল্যাটে আনারের মুখে চেতনানাশক স্প্রে করায় জ্ঞান হারান তিনি। অজ্ঞান অবস্থায় আনোয়ারুলের আপত্তিকর ছবিও তোলা হয়। চেতনানাশক স্প্রে করার পর জ্ঞান না ফেরায় ব্ল্যাক মেলের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে হত্যা করে লাশ গুমের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ঘাতকরা। এরপর তারা আনারের মোবাইলগুলো বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেয়। এমনকি হত্যাকারীদের একজন আনারের চারটি মোবাইল ফোন নিয়ে বেনাপোল এলাকায় যায়। সেখানে গিয়ে আনারের প্রতিপক্ষকে চারটি মোবাইল থেকে ফোন করা হয়। ফোন করে বলা হয় ‘শেষ’। এর টার্গেট ছিল এই ফোনের সূত্র ধরে যেন পুলিশ প্রতিপক্ষকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এই সুযোগে ঘাতকরা পার পেয়ে যাবে।’
অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, ‘সংসদ সদস্য আনার হত্যার ঘটনা তদন্তে ভারতীয় পুলিশের একটি দল ঢাকায় কাজ করছে। পাশাপাশি আমাদের হাতে গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা জেনেছি, শাহীন ৩০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত কলকাতায় অবস্থান করে কিলিং মিশন বাস্তবায়নের মূল নেতা পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়াকে সব বুঝিয়ে দিয়ে দেশে চলে আসেন। তাদের কাছ থেকে আমরা বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছি। যেহেতু ভারতীয় পুলিশ আমাদের এখানে কাজ করছে, তাদের কাজ শেষ হলে আমরাও কলকাতায় যাব।’
কী কারণে এমপি আনারকে হত্যা করা হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে হারুন বলেন, ‘এই হত্যার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। এই হত্যা বাস্তবায়নে নিয়োজিত সবাই পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে তাতে শিমুল ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি গলা কেটে হত্যার মামলা রয়েছে।’
স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনোকিছুই বলা যাবে না। তবে অনেকগুলো বিষয় আছে। তদন্ত শেষ করে আমরা আপনাদের জানাতে পারব।’
আনারের লাশ এখনও পাওয়া যায়নি, কীসের ভিত্তিতে হত্যার কথা বলা হচ্ছে, জানতে চাইলে হারুন বলেন, ‘আমরা অনেক তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে এখন প্রকাশ করছি না। প্রমাণ পেয়েছি বলেই কলকাতায় হত্যা মামলা হয়েছে। আমাদের দেশে একটি অপহরণ মামলা হয়েছে। কলকাতার মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। নিশ্চয়ই তারা আলামত পেয়েছে। কলকাতায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার তদন্তে আমরাও যাব।’
ভারত যাচ্ছে ডিবির প্রতিনিধিদল
সংসদ সদস্য আনার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে আজ ভারত যাবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি প্রতিনিধিদল। তিন সদস্যের এ দলের নেতৃত্বে থাকবেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন উপকমিশনার আব্দুল আহাদ ও অতিরিক্ত উপকমিশনার সাহিদুজ্জামান।