সাইফ বাবলু ও শহীদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৪ ১১:২১ এএম
ভারতের নিউ টাউন এলাকার ফ্ল্যাটে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে হত্যা করে লাশ টুকরা করে কিমা করতে জিহাদ নামে এক পেশাদার কসাইকে ১ কোটি টাকায় ভাড়া করা হয়। জিহাদ পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পরে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
গোয়েন্দারা জানান, মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান শাহীনের বান্ধবী কথিত মডেল সেলে নিস্কি রহমান ওরফে সেলেস্তি রহমানের ‘পাতা ফাঁদে’ পড়ে মদপান করেন এমপি আনার। অতিরিক্ত মদপানে এমপি আনার সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে কিলার গ্রুপের সদস্যরা আক্তারুজ্জামান শাহীনের নির্দেশনায় তাকে প্রথমে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ওই ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামতের সঙ্গে মদের বোতল উদ্ধার হওয়ায় এমন ধারণার কথা জানিয়েছে পুলিশের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
সূত্রগুলো বলছে, কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া জিহাদ ২ মাস আগে ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করে মুম্বাইয়ে মাংসের দোকানে চাকরি নিয়ে সেখানে থাকা শুরু করে। জিহাদ হাওলাদারকে শুক্রবার উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত আদালতে তুলে ১২ দিনের রিমান্ড হেফাজতে নেয় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ৩ জনকে শুক্রবার আদালতে হাজির করে ৮ দিনের হেফাজতে নেয় ডিবি। শুক্রবারও এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারের মরদেহের টুকরা উদ্ধারে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি। এমপি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি তদন্ত করছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এলাকার গোপাল নগর গ্রাম থেকে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া খুলনার দিঘলিয়া থানার বাসিন্দা জিহাদ হাওলাদার নামক কসাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে আনোয়ারুল আজিমকে নৃশংসভাবে হত্যার পর মরদেহ টুকরা করে কীভাবে বিভিন্ন স্থানে ফেলা হয় সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। তার দেওয়া তথ্যে শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় এমপি আনারের মরদেহের টুকরা অংশের সন্ধানে তল্লাশি চালায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। এমপি আনারের টুকরা মরদেহ যে লাল ট্যাক্সিক্যাবে করে নিয়ে যাওয়া হয় ওই ক্যাবচালককে নিয়েও তল্লাশি চালানো হয়।
ডিএমপির ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপ কমিশনার আব্দুল আহাদ জানান, এমপি আনার হত্যায় কসাই জিহাদ যে তথ্য দিয়েছে তা বিস্তারিতভাবে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া যায়নি। সে যে তথ্য দিয়েছে সেই তথ্য ডিবির একটি টিম পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার পর যাচাই করবে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ১ কোটি টাকা চুক্তিতে ভাড়া করা হয়েছিল জিহাদকে। আনার হত্যার পরিকল্পনাকারী আকতারুজ্জামান শাহীন তাকে ভাড়া করে। পেশাদার কিলার গ্রুপের সদস্য জিহাদ অন্তত ২ মাস আগে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ভারতে যাওয়ার পর জিহাদ হাওলাদার নিউটাউন এলাকায় নিজেকে কসাই পরিচয় দিয়ে একটি মাংসের দোকানে চাকরি নেয়। আনার হত্যার পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন জিহাদ হাওলাদার সঞ্জীবা গার্ডেনে আগ থেকে অবস্থান নিয়ে থাকে। তার দায়িত্ব ছিল এমপি আনারের শরীর টুকরা করা। যাতে আনারের মরদেহ গুম করতে সুবিধা হয়।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এমপি আনারকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, হত্যার পর মরদেহ কীভাবে টুকরা করা হয়েছে তার একটি বর্ণনা দিয়েছে জিহাদ হাওলাদার। পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযুক্ত জিহাদ বাংলাদেশি এবং একজন ‘দক্ষ কসাই’। অবৈধভাবে মুম্বাইয়ে বাস করছিলেন তিনি। সিআইডিকে সে জানিয়েছেন, তার নাম জিহাদ হাওলাদার, বাবার নাম জয়নাল হাওলাদার খুলনার বাসিন্দা। দুই মাস আগে তাকে ভারতে নিয়ে যান বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক আখতারুজ্জামান শাহীন। হত্যাকাণ্ডের দিন এমপি আনারকে যে ফ্লাটে হত্যা করা হয়েছে সেই ফ্লাটে আগ থেকে অবস্থান নেয় জিহাদ।
ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ৩ জন ৮ দিনের রিমান্ডে
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার আব্দুল আহাদ জানান, এমপি আনার হত্যায় গ্রেপ্তার সৈয়দ আমানুল্লাহ, মোস্তাফিজ ও ফয়সালকে শুক্রবার আদালতে হাজির করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান ১২ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত প্রত্যেককে ৮ দিনের রিমান্ড হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। রিমান্ডপ্রাপ্তরা হলেনÑ ফয়সাল আলী ওরফে তানভীর, শিমুল ভূঁইয়া ওরফে সৈয়দ আমানুল্লাহ ও মোস্তাফিজ। তবে ডিবির হাতে আটক সেলেস্তি রহমান ওরফে সেলে নিস্কিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে কোনোকিছু পরিষ্কার করেনি ডিবি।শুক্রবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাদের হাজির করা হয়। এ সময় মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মাহফুজুর। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথি এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।এর আগে বৃহস্পতিবার সৈয়দ আমানুল্লাহ, ফয়সাল আলী ও সেলেস্তি রহমানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসার জন্য গত ১২ মে যাওয়ার পর ১৪ মে থেকে পরিবাারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকেন ঝিনাইদহ ৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। ২০ মে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ। বাংলাদেশ থেকে ৩ জন এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আনুষ্ঠানিকভাবে কসাই জিহাদকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। গত বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
লাগেজ ঘিরে রহস্য
এমপি আনারকে হত্যার পর মরদেহ গায়েবের জন্য পেস্ট কালারের একটি লাগেজ নিয়ে সটকে পড়ে খুনিরা। কলকাতার নিউ টাউনের যে ডুপ্লেক্স বাড়িতে হত্যা করা হয় আনারকে, সেখানকার সিসিটিভির ফুটেজ প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে পেস্ট কালারের একটি লাগেজ নিয়ে খুনিদের সটকে পড়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। সেই লাগেজে আনারের খণ্ডিত মরদেহ রয়েছে বলে ধারণা কলকাতা পুলিশের। তাই লাগেজ আর মরদেহ উদ্ধারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছে পুলিশ। প্রতিদিনের বাংলাদেশের হাতে দুটি ভিডিও ফুটেজ এসেছে।
সিসিটিভির একটি ফুটেজে দেখা যায়, ১৩ মে দুপুরে ২টা ৫৩ মিনিটে ওই ফ্ল্যাটের সামনে হাজির হন তিন ব্যক্তি। আগে থেকেই ভেতরে অবস্থান করা কেউ একজন দরজা খুলে দিলে জুতা খুলে একে একে ভেতরে প্রবেশ করেন তারা। ছবিতে দেখা ওই তিন ব্যক্তির পরিচয় মিলেছে। তাদের একজন সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। বাকি দুজন হলেন ফয়সাল ও ঢাকায় গ্রেপ্তার সৈয়দ আমানুল্লাহ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া। ১৩ মে তিনজনই কলকাতার নিউ টাউন এলাকার সঞ্জিভা গার্ডেনসের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন একসঙ্গে।
আরেকটি সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, একই ফ্ল্যাট থেকে বের হচ্ছেন দুজন। এবার তাদের সঙ্গে নেই সংসদ সদস্য আনার। তবে তাদের সঙ্গে আছে রহস্যজনক পেস্ট কালারের একটি লাগেজ। যে লাগেজটি নিয়ে একে একে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসছেন সৈয়দ আমানুল্লাহ এবং আনার হত্যার পর ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার জাহিদ। লাগেজ ছাড়াও তাদের হাতে বেশ কয়েকটি শপিং ব্যাগ দেখা যায়। এরপর লিফটের সামনে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর নিচে নামেন তারা।
আনার হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য অনুযায়ী গোয়েন্দারা বলছেন, আনারকে হত্যার পর তার শরীরের হাড় ও মাংস বিচ্ছিন্ন করে ফেলে খুনিরা। হাড়গুলো একটি ব্রিফকেসে ভরে বাইরে নিয়ে যায়। আর মাংস আলাদা করে নিয়ে যায় অন্য ব্রিফকেসে। যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে, সেজন্য মাংসে হলুদ লাগিয়ে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, আনার হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয় গত দুই-তিন মাস আগে। রাজধানীর গুলশান-২ নম্বর ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বন্ধু আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহীনের বাসায় খুনের ছক কষা হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক কলকাতার নিউ টাউনের ওই বাড়িতে নিয়ে হত্যা করা হয় আনারকে। খুনিরা আধাঘণ্টার মধ্যেই কিলিং মিশন সম্পন্ন করে। হত্যাকাণ্ডের পর একজন আনারের মোবাইল ফোন নিয়ে ওই বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
হারুন অর রশীদ বলেন, খুনিরা চেয়েছিল বাংলাদেশেই হত্যা করতে। কিন্তু পুলিশের তৎপরতার কারণে তারা বিদেশে খুনের পরিকল্পনা করে। ফলে তিনজন মিলে কলকাতার এমন একটি পরিবেশে বাসা ভাড়া নেয়, যেখানে পরিবার থাকবে। আর এমপি আনার কলকাতায় কখন যাবেন সেটা দেখে তাকে পরিকল্পনামতো বাসায় নেবে। হারুন অর রশীদ বলেন, বাংলাদেশ থেকে তিনজন সেই বাসায় অবস্থান করে। আর বাকি এদেশেরই দুজনকে ভারত থেকে ঠিক করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ভারতে গ্রেপ্তার জিহাদকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতার হাতিশালা বর্জ্য খালে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।