নীলফামারী সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২২ ০০:৩৩ এএম
বৃহস্পতিবার চিলাহাটি রেলপথ পরিদর্শনে আসেন ভুটানের প্রতিনিধি দল। ছবি: প্রবা
চিলাহাটি রেলস্টেশনের প্রাক গুরুত্ব ও ভালো কানেকটিভিটির জন্য বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও একই সঙ্গে খরচ কমাতে চিলাহাটি থেকে মংলা পর্যন্ত রেলপথ ব্যবহার করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভুটান। চিলাহাটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপ নিলে এলাকার মানুষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নসহ আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে।
বর্তমানে ভারতের হলদিবাড়ি হয়ে ও নীলফামারীর চিলাহাটি দিয়ে বাংলাদেশে চলাচল করছে আন্তঃদেশীয় ট্রেন মিতালী এক্সপ্রেস ও পণ্যবাহী ট্রেন।
রেলপথ ব্যবহার এবং পণ্য পরিবহনে ভুটানের এমন আগ্রহ প্রকাশে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হবে বাণিজ্যের বড় সম্ভাবনা। তেমনি চিলাহাটি স্থল বন্দরে রূপান্তরিত হলে এই সম্ভাবনা আরও বেশি গতি পাবে।
এমন আগ্রহে বৃহস্পতিবার (১০ নভেম্বর) সকাল ১১টার দিকে ভুটান সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ১৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল চিলাহাটি রেলপথ, স্টেশন ও লুপলাইন পরিদর্শন করেন।
এডিবির বিশেষজ্ঞ ফিরোজ আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে ১৮ সদসস্যের ভুটানের প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব দেন ওই দেশের পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান শেরিং লাহাদন। এর আগে পশ্চিমাঞ্চল রেলের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চিলাহাটি রেলস্টেশনের অতিথিশালায় তারা বৈঠক করেন। পরিদর্শনে এসে তারা এই রেলপথ ব্যবহারে মংলা বন্দরে সহজে বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি এবং চিলাহাটি স্থলবন্দর চালু হলে বাণিজ্যের আরও গুরুত্ব বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন।
বর্তমানে বুড়িমারী ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে সড়ক পথে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে ভুটান থেকে। তবে চিলাহাটি রেলপথ ব্যবহার করা গেলে মংলা বন্দরের দূরত্ব যেমন কমবে, একই সঙ্গে অনেক বেশি পণ্য আনা-নেয়া করা যাবে। ফলে খরচ ও দূরত্ব দুটোই কমবে ভুটানের। আর এ কারণে ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যে সম্প্রসারণে এই রেলপথকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে ভুটানের প্রতিনিধি দল।
পরিদর্শন শেষে ভুটান প্রতিনিধি দলের পক্ষে এডিবির কনসালট্যান্ট ফিরোজ আহমেদ বলেন,‘ভুটান আমাদের বন্ধু প্রতীম দেশ। প্রতিনিধি দলটি চিলাহাটিতে ভিজিটে এসেছেন। আমাদের সরকার এবং এডিবি তাদেরকে সহযোগিতা করছেন। তারা এ পথে পণ্য আমদানি-রপ্তানির চিন্তাভাবনা করছেন। এ লক্ষ্যে এটি তাদের প্রিমিলারি ভিজিট।’
তিনি বলেন, ‘চিলাহাটি ঐতিহাসিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটির সাথে আমাদের সেই বৃটিশ আমল থেকে কানেকটিভিটি ছিল। আসাম এবং শিলিগুড়ি-দার্জিলিংয়ের সাথে কানেকটিভিটি ছিল। এখন ভুটান তাদের যে সকল বাণিজ্যগুলো করে এর মধ্যে ভুটান থেকে বোল্ডার, পাথরসহ অন্যান্য পণ্য আসে বাংলাদেশে। সেগুলো এই রেল কানেকটিভিটির মাধ্যমে ব্যবহার করা যায় কি না তা তারা দেখতে এসেছেন।’
ফিরোজ আহমেদ বলেন,‘চিলাহাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি রেলওয়ে স্টেশন এবং রেল কানেকটিভিটি। এর সাথে ভুটানের যেসব পণ্য আমাদের দেশে আমদানি হয় এবং আমাদের দেশের পণ্য ভুটানে যায়। ওনারা চিন্তা করছেন, এই রেলওয়ে কানেকটিভিটি কীভাবে ব্যবহার করা যায়। ওনারা এটাও আলোচনা করেছেন যে এটি যাতে ল্যান্ডপোর্ট হয়। মানুষ যাতে চলাচল করতে পারে এবং ওনাদের যারা রেলওয়ের সাথে যুক্ত তারা যাতে এখানে সহজে ইমিগ্রেশন সুবিধা পায় সেটি নিয়েও আলোচনা করেছেন। এই বিষয় গুলো নিয়ে তারা বাংলাদেশ সরকারের রেলওয়ে বিভাগসহ অন্যান্য বর্ডার অথরিটিকে জানিয়েছেন এবং তারা এগুলো ভেবে দেখছেন।’
তিনি বলেন,‘মংলা পোর্টের সাথে খুলনার যে রেল সংযোগ যুক্ত হচ্ছে সেই প্রজেক্ট শেষ হলে তারা হয়ত মংলা পোর্ট ব্যবহার করবেন। সেই ক্ষেত্রে এই চিলাহাটি রেলবন্দর এবং ভবিষ্যতে যদি এখনে স্থল বন্দর হয়, ইমিগ্রেশন সুবিধা দেয়া যায় তাহলে চিলাহাটি রেলবন্দরের গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পাবে।’
সম্ভাবনার প্রশ্নে ফিরোজ আহমেদ বলেন,‘প্রচুর সম্ভানা আছে। এটি আরও বাড়বে যদি এ পথের (রেল) সঙ্গে ল্যান্ড পোর্ট এবং ইমিগ্রেশন চালু করা হয়।’
ভুটানের এ পথ ব্যবহারে ভারতীয় করিডরের প্রশ্নে তিনি বলেন,‘এ বিষয়ে আমি তাদেরকে কোনো প্রশ্ন করিনি। তবে আমি যতটুকু জানি ভারতের সঙ্গে তাদের সহজ চলাচল এবং পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা আছে। তারা অবকাঠামো দেখলেন, ভবিষ্যতে সরকারের যে পরিকল্পনা আছে, সেগুলো নিয়ে তারা খুবই আশাবাদী।’
দলের সদস্য ভুটানের চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহসভাপতি কমল প্রধান বলেন,‘বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দ্রুত ও কম সময়ের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথ, মঙ্গলা সমুদ্র বন্দর ও বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা স্থলবন্দরকে গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা। এজন্য আমরা ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন রুটগুলো পরিদর্শনে এসেছি। চিলাহাটি রেল রুটটি অনেক সম্ভাবনাময়। এটি চালু হলে দুই দেশের মধ্যে কম খরচে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন তেমনি দুই দেশের সরকারের রাজস্ব বাড়বে।’
ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক সুজিত কুমার বিশ্বাস, বিভাগীয় ব্যবস্থাপক সুফি নুর মোহাম্মদ, রংপুর বিভাগীয় কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মানস কুমার বর্মণ, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান, চিলাহাটি-হলদিবাড়ি লিংক রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক আব্দুল রহীমসহ অনেকে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল বিভাগের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘ভুটান-বাংলাদেশ বন্ধু প্রতীম রাষ্ট্র। ভুটান একটি ল্যান্ড লর্ড কান্ট্রি। তাদের বাণিজ্য করতে হয় ভারতে মধ্য দিয়ে। কলকাতা হয়ে শিলিগুড়ি-হলদিবাড়ি ঘুরে তাদের দেশে যেতে অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়। ভুটান যদি আমাদের মংলা পোর্ট ব্যবহার করে চিলাহাটি হয়ে ভারতের হলদিবাড়ি দিয়ে হাসিমারা পর্যন্ত যেতে পারে তাহলে হাসিমারা থেকে তাদের বর্ডারে দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটার।’
তিনি বলেন, ‘এই ১৬ কিলোমিটার পথ যদি তারা বাইরোডে পণ্য আনা-নেওয়া করে তাহলে তাদের বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য করা সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তারা আমাদের দেশে পাথর রপ্তানি করতে পারবে। ভুটানে প্রচুর ফল উৎপাদন হয়। সে ফল তারা বাংলাদেশ এবং মংলা বন্দর দিয়ে বর্হিবিশ্বে রপ্তানি করতে পারবেন। চিলাহাটি রুট ব্যবহারে তাদের মংলা পোর্টের দূরত্ব কমবে। এই পোর্ট ব্যবহার করে স্বল্প খরচে বর্হিবিশ্বে তাদের পণ্য পৌঁছাতে পারবেন। এই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তারা মূলত চিলাহাটি রেল কানেকটিভিটি অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা কেমন আছে সেটি দেখার জন্য উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলটির আগমন। চিলাহাটির রেল অবকাঠামো এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তারা সন্তুষ্ট।’
সুজিত কুমার বলেন,‘আমাদের অবকাঠামো এবং পরিকল্পনা দেখে তারা একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তাদের সরকারকে দেবেন। এর পর দুই দেশের সরকার পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হবে। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে আমাদের অবকাঠামোগত দিকগুলোকে উন্নত করছি। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মানের রেলওয়ে স্টেশন ভবন নির্মাণ করছি। টুরিস্ট বিল্ডিং তৈরি করে কাস্টমস্-ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা করা হবে। ভবিষ্যতে এটি স্থলবন্দর হতে যাচ্ছে। এসব দেখে এবং আমাদের পরিকল্পনাগুলো বুঝতে পেরে তারা অনেক সন্তুষ্ট। বাণিজ্যকভাবে লাভবান হতে তারা এই করিডর ব্যবহার করবে। কারণ এই করিডোর দিয়ে তারা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বর্হিবিশ্বের বিভিন্ন দেশে তারা তাদের বাণিজ্য সম্প্রারণ করতে পারবে।’
এর একদিন আগে ওই প্রতিনিধিদল ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের সময় লালমনিরহাটের বুড়িমারি ও ভারতের কোচবিহারের চেংড়াবান্ধা স্থলবন্দর পরিদর্শন করেন। বৃহস্পতিবার চিলাহাটি পরিদর্শন শেষে বুড়িবামী হয়ে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
রেলওয়ের সূত্র অনুযায়ী, দীর্ঘ ৫৫ বছর পর ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেলপথ চালু হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে এটি উদ্বোধন করেন।
চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রেল লিংক স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আব্দুর রহীম জানান, চিলাহাটি স্টেশনে বর্তমানে ৬০০ মিটার লুপ লাইন রয়েছে। এর ধারণ ক্ষমতা ৪২টি ওয়াগন। সেটিকে ৭৫০ মিটারে উন্নীত করে ৫০টি ওয়াগন ধারনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।