বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৪ ১৬:০৪ পিএম
আপডেট : ১৩ মে ২০২৪ ১৭:৪৬ পিএম
হায়দার আকবর খান রনোকে গার্ড অব অনার প্রদান। সোমবার দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। প্রবা ফটো
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক ও লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আকবর খান রনোর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার (১৩ মে) বিকাল তিনটার দিকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
আজ সকাল ১০টার দিকে রনোর মরদেহ পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তি ভবনে নেওয়া হয়। সেখানে দলের পক্ষ থেকে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বেলা ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়।
শহীদ মিনারে রনোকে গার্ড অব অনারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সালাম ও সম্মান জানিয়েছে প্রশাসন। ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একেএম হেদায়েতুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকশ দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

সেখান থেকে রনোর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নেওয়া হয়। সেখানে তার প্রথম জানাজা হয়। বেলা পৌনে দুইটার দিকে বনানী কবরস্থানের উদ্দেশে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে রনোর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
সিপিবি নেতা মঞ্জুর মঈন সাংবাদিকদের জানান, বনানী কবরস্থানে বাবা, মা ও ছোট ভাইয়ের পাশে রনোকে শায়িত করা হয়েছে।
হায়দার আকবর খান রনো ছিলেন সিপিবির উপদেষ্টা। শুক্রবার রাতে ঢাকার পান্থপথের হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। শনি ও রোববার তার মরদেহ রাখা হয়েছিল হাসপাতালের হিমঘরে।
সর্বস্তরের শ্রদ্ধা
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রনোর প্রতি গার্ড অব অনার প্রদান শেষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সর্বস্তরের মানুষ। বাংলাদেশে বামপন্থি ধারার এই প্রবীণ রাজনীতিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), গণতন্ত্রী পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণফোরাম, গণসংহতি আন্দোলন, ঐক্য ন্যাপ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ব্যক্তিত্ব। সবাই এক বাক্যে মেহনতি মানুষের পক্ষ আন্দোলন-সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন রনোর অংশগ্রহণ ও অবদানের কথা স্মরণ করেছেন।

শহীদ শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর নাম ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে। প্রতিটি সংগ্রামে তিনি আপোসহীন লড়াই করেছেন। তিনি দেশ, জাতি ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য, জনগণের ভবিষ্যৎ রচনার জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি আমাদের আদর্শের প্রতীক হয়ে থাকবেন।’
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, শাজাহান খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আফজাল হোসেনে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিলসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের সঙ্গে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীও শ্রদ্ধা জানান।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শাজাহান খান বলেন, ‘জাতির পিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে হায়দার আকবর খান রনো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার সঙ্গে আমাদের আদর্শিক পার্থক্য হলো দার্শনিক বিষয়। জাতির পিতার আহ্বানে আমরাও মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তিনিও মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তিনি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না, তিনি একজন তাত্ত্বিক ছিলেন। লেখনীর মাধ্যমে তিনি নিজের আদর্শকে তুলে ধরেছেন।’

মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘হায়দার আকবর খান রনো শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যে একজন ছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন। এ দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য তিনি সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। তার মৃত্যুতে জাতি একজন সূর্য সন্তানকে হারাল।’
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে, জনগনের মুক্তি সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হায়দার আকবর খান রনো একটি অনন্য নাম। ছাত্রজীবন থেকে তিনি এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য রাজনীতি করেছেন এবং মার্কসবাদী আদর্শে দীক্ষিত এই মানুষটি সারা জীবন নিজের আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে মানুষের মুক্তির জন্য, কৃষক-শ্রমিক-মহনতি মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘হায়দার আকবর খান রনোর মৃত্যুতে জাতির বড় ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি আগা-গোড়া বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি কোনোদিন আপোষ করেননি, কখনও বিচ্যুত হননি। তিনি মার্কসবাদী-লেলিনবাদী ছিলেন। ওই আদর্শের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো সুবিধাবাদীতা তার চরিত্রের ধারেকাছেও আসতে পারেনি। তিনি কৈশোরে যেভাবে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। তিনি সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি করেছেন।’
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের মধ্যে যারা সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করেন, তাদের মধ্যে উনি একজন ব্যতিক্রমধর্মী নেতা ছিলেন। তিনি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, স্বৈরাচার বিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। সমাজতন্ত্রের ঝান্ডা হাতে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা যায়– এই রাস্তাটা তিনি বলিষ্ঠতার সঙ্গে দেখিয়ে গিয়েছেন। অনেক বামপন্থি বিভ্রান্তিতে ভুগলেও, হায়দার আকবর খান রনো কখনোই বিভ্রান্তিতে ভোগেননি। বাংলাদেশের প্রশ্নে, গণতন্ত্রের প্রশ্নে, স্বাধীনতা প্রশ্নে তিনি আপোষহীন লড়াই করেছেন।’