প্রাণ-প্রকৃতি
আমিনুল ইসলাম মিঠু
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৪ ১১:২৬ এএম
আপডেট : ১১ মে ২০২৪ ১৮:৩১ পিএম
পরিযায়ী পাখি হুডেড পিটা। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের লাঠিটিলা বন থেকে তোলা। ছবিটি তুলেছেন বন্যপ্রাণী বিষয়ক আলোচিত্রী শাহানুল করিম চপল।
বাংলাদেশে কমেছে পরিযায়ী পাখির আগমন। গেল শীত মৌসুমে পরিযায়ী পাখি বিচরণ করা জলাশয়গুলোতে আসেনি তেমন কোনো পাখি। এজন্য দেশের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, জলাশয় ও ব্যবস্থাপনা কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন গবেষকরা। একই সঙ্গে পরিযায়ীর আসা-যাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ বিনষ্টের কারণে পাখিদের শিকার পোকা-পতঙ্গ ও খাদ্য কমে যাচ্ছে বলছেন প্রাণিবিদরা। তারা বলছেন, পোকামাকড় অনেক পরিযায়ী পাখির প্রজাতির জন্য শক্তির অপরিহার্য উৎস, শুধু প্রজনন ঋতুতে নয়, ভ্রমণের সময়ও।
সম্প্রতি বাংলাদেশের যেসব এলাকায় পরিযায়ী পাখি বিচরণ করে, সেসব এলাকায় থাকা ঘাসবনগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়া, প্রাকৃতিক বন থেকে পোকা জন্মানোর মতো পাতা কুড়িয়ে আনা এবং কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পাখির খাদ্য পোকা ও পতঙ্গ কমে যাওয়াতে পরিযায়ী পাখির খাদ্য চক্রে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন পাখি গবেষকরা।
প্রাণিবিদরা বলছেন, প্রজনন স্থান এবং পরিযায়নের রুটে পোকামাকড়ের ক্ষতি পাখির বেঁচে থাকা এবং সুস্থতাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। বন ও তৃণভূমির মতো প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোকে কৃষি ও নগর উন্নয়নের নামে রূপান্তরিত বা বিপন্ন করা হয়েছে। এর প্রভাব এবং নানা দূষণের কারণে কমে যেতে পারে পোকামাকড়ের সংখ্যা।
পাখি গবেষক সীমান্ত দীপু বলেন, টাঙ্গুয়া ও হাকালুকি হাওরে যে ঘাসবন ছিল তার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। কারণ, সেখানে গরু চরানো হয়। আগে আমরা সেখানে গবেষণায় গেলে তিনশ’র বেশি পাখি পেতাম। কিন্তু এখন পাখি নিয়ে গবেষণার কাজে গেলে ১০ থেকে ১২ টির বেশি পাখি পাওয়া যায় না।
আজ বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পোকা বা পতঙ্গকে। পাখি গবেষকরা বলছেন, পাখিরা পরিযায়নের রুট বরাবর মাঠ, বন, জলাভূমি এবং বিভিন্ন আবাসস্থলে কীটপতঙ্গ খোঁজে। তাই পরিযায়ী পাখি রক্ষাসহ তাদের খাদ্য পোকামাকড়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবারের বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবসে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বৈশ্বিক পাখি শুমারির ফল বলছে, পাখি ও তার বিচরণ এলাকা ভালো নেই। প্রজননকাল শেষে পরিবারের নতুন অতিথিদের অবস্থা কেমন আছে, তা-ও বোঝা যায় এই গণনা করে। এই বছর ১০ দিনব্যাপী উপকূলজুড়ে প্রায় ৪৭টি এলাকা বা চরে পাখিশুমারি করা হয়। শেষ হয় জানুয়ারির ১১ তারিখ। শুমারি দলের নেতৃত্ব ছিলেন পাখি গবেষক সায়েম চৌধুরী। পাখি গণনা শেষে দেখা গেছে, উপকূলে এসেছিল ৬২টি প্রজাতির ৩৪ হাজার ৩১২টি পাখি। পাখির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ কম।
পাখি গবেষকদের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৩২০ প্রজাতির পরিযায়ী আছে; সেগুলো পোকা খেয়ে থাকে। এর মধ্যে সৈকত বা উপকূল এলাকায় আছে ৬০ প্রজাতির পাখি; সেগুলোও পোকা খেয়ে থাাকে। কিন্তু দেশে পাখিদের খাদ্য পোকার যে উৎস ঘাসবনগুলো ছিল সেগুলো বিলীন হওয়াতে পরিযায়ী পাখির খাদ্যের উৎস নষ্ট হয়ে গেছে; যা পরিযায়ী পাখি আসার হার কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।
সম্প্রতি জাতিসংঘের কনজারভেশন অব মাইগ্রেটরি স্পিসিস অব ওয়াইল্ড অ্যানিমেলসে (সিএমএস-কপ-১৪) পরিযায়ী প্রজাতির প্রাণীদের নিয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিএমএসের অধীনে তালিকাভুক্ত কিছু পরিযায়ী প্রজাতির উন্নতি হচ্ছে, তবে প্রায় অর্ধেক (৪৪ শতাংশ) প্রজাতির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এই তালিকায় থাকা প্রজাতির পাঁচটির মধ্যে একটি (২২ শতাংশ) বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সম্প্রতি কপ-১৪ এর অধীন পরিযায়ী বন্য প্রাণীর ওপর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৪ শতাংশ পরিযায়ী প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত হারে কমছে। বন্য প্রাণীর আবাস ধ্বংস হওয়া অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে যেসব বন্য প্রাণী পরিযায়ী হিসেবে আসে তার মধ্যে প্রধান পাখি। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা এবং দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকায় এসব পাখির প্রধান আবাস। অথচ এসব এলাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোনো সংরক্ষণ কার্যক্রম নেই। হাওর এলাকা যারা ব্যবস্থাপনা করেন, তারা সরকারের রাজস্ব তৈরিতে হাওরের বিলগুলো লিজ দিয়ে থাকে। আর উপকূল এলাকা নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিপর্যস্ত। ফলে আমাদের দেশে পরিযায়ী পাখির আবাস নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে গত এপ্রিলে বাংলাদেশের গঙ্গা-নিম্ন প্লাবনভূমি অঞ্চলের পাখিদের নিয়ে বাংলাদেশে প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এক গবেষণা উপস্থাপনায় জানানো হয়, বাংলাদেশের এই অঞ্চল পাখি বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। বিশেষ করে জলাভূমিগুলো। কিন্তু এই অঞ্চলে কোনো সংরক্ষিত এলাকা নেই। গত ৭ বছরের গঙ্গা নিম্ন প্লাবনভূমির মোট ১১টি গবেষণাপত্র পর্যালোচনা এবং সাম্প্রতিক বেশ কিছু প্রকল্পের তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, দেশের গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি বন্য প্রাণী সম্পদে সমৃদ্ধ একটি বিশিষ্ট বায়ো-ইকোলজিক্যাল জোন। পুরো এলাকার আবাসস্থলকে ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়। যার মধ্যে প্রধান নদী অববাহিকা ও সংশ্লিষ্ট চর, বিভিন্ন ছোট নদী ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে বেশিসংখ্যক পাখি দেখা যায়। এ ছাড়া ঘাসবন, মানববসতি সংশ্লিষ্ট বন এবং কৃষিজমি সংশ্লিষ্ট বনে অনেক বেশি পাখির দেখা মেলে। পাঁচ ধরনের আবাসস্থলের মধ্যে পাখিদের প্রজাতিগত ভিন্নতা দেখা গেছে। শীতকালে সব থেকে বেশিসংখ্যক পাখি এবং নতুন প্রজাতি দেখা যায়। আইইউসিএনের তথ্যমতে, দেশের ৩৮ প্রজাতির শঙ্কাগ্রস্ত পাখির মধ্যে ১৯ প্রজাতির দেখা মেলে গাঙ্গেয় প্লাবনভূমিতে। তবে অবৈধ পাখি শিকার, বন্য পাখির ব্যবসা, পানিদূষণ, পর্যটন এবং বিদ্যমান মাছ ধরার পদ্ধতি এই এলাকার পাখিদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস
প্রতি বছরের মে মাসের দ্বিতীয় শনিবার বিশ্ব পরিযায়ী পাখি দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। আর মেক্সিকো, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানে পালিত হয় অক্টোবরের দ্বিতীয় শনিবারে। বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে মে মাসের দ্বিতীয় শনিবার পরিযায়ী পাখি দিবস পালন করা হয়। এদিন সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা দিবসটিকে ঘিরে নানা সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।