জন্মশতবার্ষিকী
ইমতিয়ার শামীম
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৪ ২০:২৩ পিএম
আপডেট : ০৮ মে ২০২৪ ২০:৩২ পিএম
শিল্পী কলিম শরাফী।
‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়ারে সে দুঃখের চোখেরও পানি, ও আমার চক্ষু নাই’- ১৯৬২ সালে পরিচালক সালাউদ্দিনের ‘সূর্যস্নান’ ছবির এই গান এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। অনেকেই জানেন না, কে এই গান প্রথম গেয়েছেন, কে এই গান লিখেছেন। কিন্তু এমন গান কি পারে মানুষের হৃদয় থেকে হারিয়ে যেতে? স্মৃতি থেকে গায়ক, গীতিকার ও সুরকারের নাম ধুয়েমুছে যেতে পারে- কিন্তু তারপরও তারা বাস করেন মানুষের হৃদয়েই।
এ গানের শিল্পী কলিম শরাফী তেমনই এক মানুষ। যিনি হারাননি,
কখনও হারাবেন না আমাদের অন্তর্লীন জগৎ থেকে। জীবনব্যাপী সাধনা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে
তিনি যে বসত গড়ে তুলেছেন বাঙালি এবং বাংলার সমাজে, নিজের যে পত্তন ঘটিয়েছেন বাংলাদেশে,
তা কখনোই ভেঙে পড়ার নয়। খুব নীরবেই এসেছে তার জন্মশতবার্ষিকীÑ সরবে যে তা পালন হচ্ছে
সেরকমও নয়; কিন্তু তবুও তিনি হারাবেন না আমাদের থেকে। ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী জাতীয়
মুক্তির সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে
তিনি যে চেতনার দীপ জ্বেলেছেন, তা আমাদের পথ দেখাবে অনন্তকাল।
জন্ম নিয়েছিলেন
রক্ষণশীল পরিবারে। শৈশবেই হয়েছিলেন মাতৃহারা। স্বভাবতই বড় হয়েছেন বন্ধনহীনভাবে, কিন্তু
রক্ষণশীলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে। ১৯২৪ সালের ৮ মে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার খয়রাডিহি
গ্রামে জন্ম হয় তার। পারিবারিকভাবে নাম রাখা হয় সৈয়দ কলিম আহমেদ শরাফী। তবে সাধারণ্যে
তার পরিচিতি ‘কলিম শরাফী’ নামে এবং রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হিসেবে। তারুণ্যে মার্কসবাদে
দীক্ষিত কলিম শরাফীর জীবন সংগত কারণেই হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময়।
বাল্যবন্ধু ও
সহপাঠী শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে মিলে কলিম শরাফী শুরু করেন জীবনের দুরন্ত অভিযাত্রা।
তারা দুজনেই ছিলেন কলকাতা মাদ্রাসার ছাত্র। তবে আলিম-ফাজিল নয়, তারা ছিলেন সেখানকার
ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। দশম শ্রেণির কিশোর কলিম শরাফী তখন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর
ডাকে অংশ নেন হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনে। কংগ্রেসি মার্কিস্ট বিভিন্ন দল ও ছাত্র
ফেডারেশনের কর্মী এবং মুসলিম ছাত্ররাও এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ফলে সুভাষ চন্দ্রের
ফরওয়ার্ড ব্লকের আহ্বানে গড়ে উঠলেও হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলন সর্বাত্মক হয়ে ওঠে।
ইসলামিয়া কলেজে এ আন্দোলনকারীদের একটি মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। তখন প্রতিষ্ঠানটির
অধ্যক্ষ ড. জাকারায়া, ছাত্রনেতা আব্দুল ওয়াসেক থেকে শুরু করে কলিম শরাফীও আহত হন। এ
সময় ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র ‘রফিক ভাইয়ের’ সংস্পর্শে কলিম শরাফী মার্কসবাদের দীক্ষা
নেন এবং গোপন সংগঠনের সাংগঠনিক তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে
ভারতবর্ষজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনেও অংশ নেন কলিম শরাফী। এ সময় তাকে প্রতিরক্ষা
আইনে গ্রেপ্তার করে সিউড়ি জেলে রাখা হয়। জেলে ১১ মাস থাকার সময় গ্রেপ্তার আরেক স্বদেশি
প্রণব গুঠাকুরতার সংস্পর্শে তিনি রবীন্দ্রসংগীত গাইতে শুরু করেন এবং ঠিক করেন শান্তিনিকেতনে
পড়াশোনা করবেন। ১১ মাস জেলে ছিলেন কলিম শরাফী। জেল থেকে বেরোনোর পর তিনি আরও নিবিড়ভাবে
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৩ সালে গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএর
সংগঠক হিসেবে তিনি যে ভূমিকা রাখেন, তা আরও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
রাজনীতিসংশ্লিষ্টতার
কারণে পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনে ভর্তি হতে না পারলেও কলিম শরাফীর সঙ্গে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়
ও সুচিত্রা মিত্রের পরিচয় ঘটে এবং তারা নানা সাংস্কৃতিক উদ্যোগে সহজন হয়ে ওঠেন। ১৯৪৫
সালে কলিম শরাফী দার্জিলিংয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেও অর্থাভাবে একসময় লেখাপড়া ছেড়ে
দিয়ে কলকাতা চলে আসেন। ভারত বিভক্তির পর তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকায় চলে আসেন। এ সময় ঢাকা
বেতারে সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘অবাক পৃথিবী’ গান গেয়ে তিনি পাকিস্তান গোয়েন্দা দপ্তরের
রোষানলে পড়েন। লেখাবাহুল্য, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ইতিবাচক, প্রতিবাদী ও
সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ভূমিকা রাখায় তাকে বারবার নিগৃহীত হতে হয়েছে। ঢাকার পরিস্থিতি
অনুকূল না হওয়ায় তিনি ১৯৫১ সালে চট্টগ্রামে চলে যান এবং ‘প্রান্তিক’ নামে একটি সংগঠন
গড়ে তোলেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকায় টিভি সেন্টার চালু হলে তিনি ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু
রবীন্দ্রসংগীত সাধনায় যুক্ত থাকায় চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। ১৯৭১ সালে
তিনি লন্ডন ও ওয়াশিংটনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন।
১৯৭৬ সালে সামরিক শাসনের সময় একুশে উদযাপন কমিটিতে যুক্ত থাকায় তাকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল
ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার পদ থেকে মাত্র এক ঘণ্টার নোটিসে বরখাস্ত
করা হয়। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ গণআদালত করে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের প্রতীকী বিচারের
রায় ঘোষণার পরদিনই শহীদ জননী জাহানারা ইমামসহ এর সংগঠক ২৪ বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে
রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। কলিম শরাফী ছিলেন যাদের অন্যতম।
রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী
হিসেবে সমধিক পরিচিত কলিম শরাফীর বেরিয়েছে সংগীতের কমপক্ষে ১৫টি ক্যাসেট, তিনটি সিডি
এবং পাঁচটি অ্যালবাম। নিজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে তিনি তুলে ধরেছেন ‘স্মৃতি
অমৃত’ (১৯৯৩) এবং ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায়’ (২০০৫) নামের দুটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ।
তাকে নিয়ে আবৃত্তিকার-পরিচালক নিশাত জাহান রানা নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র ‘পথে
পথে দিলাম ছড়াইয়া’। ‘স্বাধীনতা পদক’ (১৯৯৯), একুশে পদক (১৯৮৫), সত্যজিৎ রায় পুরস্কারসহ
(১৯৯৫) অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। তার বৈচিত্র্যময় জীবনের দেহাবসান
ঘটে ২০১০ সালের ২ নভেম্বর। কিন্তু তিনি স্মরিত হবেন চিরদিন।