× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সেই দিন নেই সদরঘাটে, ঈদ মৌসুমেও সুনসান নীরবতা

ইউছুব ওসমান, জবি

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৪ ০১:০৩ এএম

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪ ০১:২৮ এএম

সুনসান নিরব সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। ফাইল ছবি

সুনসান নিরব সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। ফাইল ছবি

প্রতি বছর ঈদ আসলে লঞ্চগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, টিকিটের জন্য কাড়াকাড়ি, নাড়ীর টানে বাড়ি ফিরতে ঘাটে লাখো জনতার ঢল, এমনটাই ছিল রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের চিরায়ত দৃশ্য। তবে গত কয়েক বছরে সেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখন যাত্রীর অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলোকে। তবুও মেলে না যাত্রী, অনেক সময় সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যেতে হয় গন্তব্যে। মূলত পদ্মা সেতু চালুর পর নৌপথে যাত্রীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে লাভ তো দূরের কথা, আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতেও হিমশিম খাচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা। ঈদকে ঘিরে আশায় বুক বাঁধলেও যাত্রী না হওয়ায় সেই স্বপ্নও ভঙ্গ হচ্ছে তাদের।

যাত্রী সংকটের কারণে নৌপথের অন্তত ১০টি রুটের লঞ্চ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু লঞ্চ মালিকরা নয়, যাত্রী সংকটের রেশ পড়েছে নৌযান শ্রমিক ও সদরঘাট কেন্দ্রিক ব্যবসায়ী, কুলি-মজুরদের মাঝেও। তাদের কেউ করেছেন জায়াগা বদল, কেউবা বদলে পেশা। সদরঘাট এলাকার আশপাশের ব্যবসায়ীদেরও একই অবস্থা। সারা বছর রয়ে-সয়ে ব্যবসা চালালেও ঈদেও মেলেনা স্বস্তি। বছর ঘুরে ঈদ আসলেও ব্যবসা জমছে না তাদের। এতে অনেকেই ব্যবসা বদলে স্থানান্তরিত হচ্ছেন অন্য জায়গায়, কেউ বা বদলাচ্ছেন পেশাও।

শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) ২০২৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, পদ্মা সেতু চালুর পর ২০২২ সালের জুন থেকে গত বছর পর্যন্ত ঢাকার লঞ্চযাত্রী কমেছে ৩৪ শতাংশ। বাস্তবতায় ২০২৪ সালে এসে এর পরিমাণ আরও বেশি। অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ব্যবসায় মন্দার কারণে মালিকরা এক বছরে অন্তত ২০টি লঞ্চ স্ক্র্যাপ করে ফেলেছেন। এ ছাড়া আরও অন্তত ছয়টি লঞ্চ স্ক্র্যাপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। যাত্রী সংকটে নৌ রুটের এই দুর্দিনে লঞ্চ বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায়ও দেখছেন না তারা।

শনিবার (৩০ মার্চ) সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদের আর মাত্র ১০ দিনের মতো বাকি থাকলেও এখনও অনেকটা সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকায়। লঞ্চের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হলেও এখনও তেমন সাড়া মিলছে না। টার্মিনাল এলাকায়ও নেই তেমন হাঁকডাক।কিছু যাত্রী আসলেও তার সংখ্যা নগণ্য। অথচ আগে ঈদের সময়ে টার্মিনাল এলাকা থাকত লোকে লোকারণ্য।

লঞ্চ মালিকরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর আগে প্রতি দিন ঢাকা থেকে অন্তত অর্ধ লাখ মানুষ লঞ্চে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যেতেন। আর ঈদ আসলে বাড়ি ফিরতে অন্তত অর্ধকোটি মানুষ রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ভিড় করতেন। সেখানে এখন যাত্রী সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। বাধ্য হয়ে তাই রোটেশনে চালানো হচ্ছে লঞ্চ। প্রতিদিনি ঢাকা বিভিন্ন রুটে থেকে ছেড়ে যায় দুটি করে লঞ্চ। অনেক রুটে আবার এর সংখ্যা একটি। সে হিসাবে পাঁচ দিন পর একটি আপডাউন ট্রিপ পাচ্ছে লঞ্চগুলো। কেউ কেউ আবার  ছেড়েছেন লঞ্চ ব্যবসা। আবার কেউ এই ব্যবসা ছেড়ে দেবেন বলেও ভাবছেন। 

লঞ্চ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল বলেন, লঞ্চের ব্যবসা তো আর নেই। একদম শেষ হয়ে গেছে। যাত্রী এখন অর্ধেকেরও কম। ভাড়া কম রেখেও যাত্রী পাওয়া যায় না। এই সংকট কাটানোর রাস্তাও আমাদের জানা নেই। আমার নিজের ৫টা লঞ্চ ছিল, ৪টা কেটে বিক্রি করেছি। সব মালিকেরই এই অবস্থা। লঞ্চ চালালে খরচও তুলা যায় না।

এদিকে সদরঘাট এলাকা ঘিরে হকারি ব্যবসায়ও ধ্বস নেমেছে। হকাররা বলছেন, বেচাকেনা কম হওয়ায় টার্মিনাল থেকে অনেক হকার চলে গেছে। অনেকে অন্য জায়গায় গিয়ে ব্যবসা শুরু করেছে। আগে পন্টুনের দুই পাশে হকারদের সরব অবস্থান থাকত। এখন যারা আছেন তারা কোনোভাবে এক পাশে বসে পণ্য বিক্রি করছেন। আগের সেই জমজমাট অবস্থা এখন আর নেই। একসময় যারা ফল বিক্রি করতেন, তারা ব্যবসা পরিবর্তন করে বাদাম, ঝালমুড়ি ইত্যাদি বিক্রি করছেন। একই কথা বলছেন টার্মিনালের সামনের এলাকার ব্যবসায়ীরাও। সরেজমিনেও মিলেছে সেই চিত্র। দোকান খুলে, বসে থাকলেও নেই ক্রেতাদের ভিড়।

সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের পন্টুনে ডিম বিক্রেতা সাইফ শেখ বলেন, আগে দিনে কয়েক হাজার টাকার ডিম বিক্রি করতাম। একটা আয় রোজগার ছিল। পদ্মা সেতু হওয়ার পর থেকে ঘাটে যাত্রীই হয় না। এখন খুব বেশি হলেও চার-পাঁচশ টাকার বেশি ডিম বিক্রি হয় না। আমরা তো গ্রাম থেকে এসে এখানে ব্যবসা করি। অল্প টাকায়, ঘর ভাড়া দিয়ে চলা মুশকিল। অনেকেই অন্য জায়গায় চলে গেছে ব্যবসা নিয়ে। আবার আমার মত অনেকেই কষ্ট করছে এখানে। 

টার্মিনালের সামনের মুদি দোকানদার ফয়জুর মোল্লা বলেন, আগে ঈদের সময় দিনে ২০-৩০ হাজার টাকারও মালামাল বিক্রি হয়েছে। আর সাধারণ সময় ৪-৫ হাজার টাকা। এখন তো খুব বেশি হলে ১ হাজার টাকা হয়। আশপাশে অনেকে দোকান ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। এ অবস্থায় তো ব্যবসা চলে না। সবারই পরিবার আছে। আর কতদিন থাকতে পারব জানিনা।

লঞ্চ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে শ্রমিকদের প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে বেতন মিললেও, এখন মাসের ১৫-২০ তারিখেও বেতন মিলছে না। অধিকাংশ লঞ্চের শ্রমিকদের ৪ থেকে ৫ মাসের বেতনও বাকি আছে। শ্রমিকরা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে যেখানে বেতন বাড়ার কথা, সেখানে এখন নিয়মিত বেতন পাওয়াই দায়। অনেকে লঞ্চ না থাকায় এখন কার্গোতে কম বেতনে চাকরি নিয়েছেন। আবার অনেকেই এই পেশা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে অন্য চাকরি নিয়েছেন। 

নৌযান শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের সদস্য আতিকুল ইসলাম টিটু বলেন, ব্যবসা না থাকায় মালিকরাও টাকা দিতে পারছে না। আমরা যে চাপ দেব, সে সুযোগও নেই। বাধ্য হয়েই সবাই কার্গোতে গিয়ে কম বেতনে চাকরি করছে। আবার অনেকেই অন্য চাকরিতে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের তো স্কিলের কাজ। এর বাইরে অন্য কাজ খুব বেশি জানা নেই যে সবাই অন্য পেশায় যাব। যারা পারছে তারা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আর যারা পারছে না তাদের খেয়ে না খেয়েই থাকতে হচ্ছে। 

প্রিন্স আওলাদ লঞ্চের স্টাফ কামাল হোসেন বলেন, অনেক দিন ধরে একই বেতনে কাজ করছি। আমাদের বেতন বাড়ার কথা ছিল। আমরা বেতন বাড়ানোর আন্দোলনও করেছিলাম। পদ্মা সেতু হওয়ার পর যাত্রী কমে গেছে। এখন তো আর বেতন বাড়ার সুযোগ নেই। ঠিকমতো বেতনও পাচ্ছি না। ১০-১২ হাজার টাকায় নিজের খরচ চালিয়ে পরিবারের জন্য টাকা পাঠানো কঠিন। তাও যদি সঠিক সময়ে বেতন পেতাম। এখন বেতন পেতে মাসের ১৫-১৬ তারিখ হয়ে যায়। এছাড়াও আমার ২ মাসের বেতন বাকি। কবে দিবে কে জানে। ব্যবসা না থাকায় বার বার চাইতেও লজ্জা লাগে।

এবিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে লঞ্চ মালিক সমিতির এক শীর্ষ নেতা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এমন এক অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, সরকারও আমাদের দিকে নজর দিচ্ছে না। আমরা কোটি কোটি টাকা লস দিয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছি। সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের সহায়তা ছাড়া এই সংকট কাটানোর আর কোনো উপায় জানা নেই।  

সার্বিক বিষয়ে কথা বলা হলে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, বাজার অর্থনীতিতে বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকবে। সেখানে যদি মান উন্নত না হয়, তাহলে ভোক্তাদের আকর্ষণ থাকবে না। ভোক্তাদের আকর্ষণ করে এমন বেশ কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। লঞ্চ অনেক আরমদায়ক একটি যান। তারা সেবার মান বাড়ালে যাত্রী অবশ্যই বাড়বে। শুধু লঞ্চ না সদরঘাটকে তেমন আকর্ষণের জায়গা করা গেলেও এখানে মানুষ বেশি আসবে। তখন একে কেন্দ্র করে যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আছেন তাদরে ব্যবসাও চাঙ্গা হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা