খুলনা সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২২ ১৯:৫৪ পিএম
আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২২ ২০:৪২ পিএম
বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, ফাইল ছবি
আগামীকাল রোববার (২ আগস্ট) বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী। তিনি ১৮৬১ সালের এই দিনে খুলনা জেলার পাইকগাছার রাড়ুলী ইউনিয়নের রাড়ুলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হরিশচন্দ্র রায় ছিলেন স্থানীয় জমিদার। মায়ের নাম ভূবনমোহিনী দেবী।
তার জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে তার প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, আলোচনা সভা, জীবন ও কর্মেরর ওপর তথ্যচিত্র প্রদর্শন, উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
বনেদি পরিবারের সন্তান প্রফুল্ল চন্দ্র ছেলেবেলা থেকেই সব বিষয়ে ছিলেন তুখোড় ও প্রত্যুৎপন্নমতি। তিনি ১৮৮২ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়ে অনার্সসহ স্নাতক শেষ করেন। পরে গিলক্রিইষ্ট বৃত্তি নিয়ে চলে যান এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখান থেকেই বিএসসি ডিগ্রি নেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ১৮৮৮ সালে দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এ সময় তিনি ঘি, সরিষার তেল ও বিভিন্ন ভেষজ উপাদান নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
১৮৯৫ সালে তিনি মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার করেন। যা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটি তার অন্যতম প্রধান আবিষ্কার। এ ছাড়া পারদ সংক্রান্ত ১১টি মিশ্র ধাতু আবিষ্কার করে তিনি রসায়ন জগতে বিস্ময় সৃষ্টি করেন। রসায়ন শাস্ত্রে গবেষণারত প্রফুল্ল চন্দ্র মারকুইরাস নাইট্রাইট-এর মত রসায়ন শাস্ত্রে মৌলিক পদার্থ উদ্ভাবন করার মাধ্যমে বিশ্বকে চমকে দেন। এরপর থেকে সম্মান সূচক ডিগ্রি ১৮৮৬ সালে পিএইচডি, ১৮৮৭ সালে ডি.এস.সি, ১৯১১ সালে সি.আই.ই, ১৯১২ সালে আবার ডি.এস.সি. পান। প্রায় ২৪ বছর তিনি এই কলেজে অধ্যাপনা করেন। নাইট উপাধি পাওয়া পিসি রায় ১৯৪৪ সালে ১৬ জুন মৃত্যুবরণ করেন।
পিসি রায় ছিলেন একজন শিল্পাদ্যোক্তা, সমাজ সংস্কারক, বিজ্ঞানশিক্ষক, দার্শনিক, কবি, শিক্ষানুরাগী, ব্যবসায়ী ও বিপ্লবী দেশপ্রেমিক। তিনি নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন এইভাবে ‘আমি বৈজ্ঞানিকের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম্য সেবকদের সাথে গ্রামসেবক আর অর্থনীতিবিদদের মহলে অর্থনীতিজ্ঞ।’ দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য যখন যা প্রয়োজন, সেটাই তিনি করেছেন।
তার নিজস্ব গবেষণাগার থেকেই বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে ১৯০১ সালে তা কলকাতার মানিকতলায় ৪৫ একর জমিতে স্থানান্তরিত হয়। তখন এর নতুন নাম রাখা হয় বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড।
পিসি রায়ের জীবন ছিল অনাড়ম্বর। শিক্ষা বিস্তারে তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমিদারি সম্পত্তি ও তার উপার্জিত সমুদয় অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্রবৃত্তি ও জনহিতকর কাজে দান করে গেছেন। পিসি রায় শুধু নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই প্রতিষ্ঠা করেননি; সেই সময়ে প্রতিষ্ঠিত এমন কোন প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে পিসি রায়ের অর্থনৈতিক অনুদান ছিল না।
সমবায়ের পুরোধা স্যার পিসি রায় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে নিজ জন্মভূমিতে একটি কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে তার পিতার নামে আর.কে.বি.কে. হরিশ্চন্দ্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। চারটি গ্রামের নাম মিলে ১৯০৩ সালে তিনি দক্ষিণ বাংলায় আর.কে.বি.কে. হরিশ চন্দ্র ইনষ্টিটিউট (বর্তমানে কলেজিয়েট স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পিতা ১৮৫০ সনে গ্রামের বালিকাদের লেখাপড়ার জন্য তার স্ত্রী ভূবন মোহিনীর নামে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। নিজের রাড়ুলী গ্রামে পিতার প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয় ভুবন মোহিনী বালিকা বিদ্যালয়ে অর্থ প্রদান করেন।
বাগেরহাট পিসি কলেজ, সাতক্ষীরা চম্পাপুল স্কুল ও খুলনায় পিসি রায় প্রাথমিক বিদ্যালয় অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত তারই কীর্তি। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ, বরিশালে অশ্বিণী কুমার ইনস্টিটিউশন, যাদবপুর হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালসহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক অনুদান দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও পি.সি রায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ১ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা দান করেন।
প্রফুল্ল চন্দ্র রায় শুধু বিজ্ঞানী ছিলেন না। তিনি উঁচুমানের দার্শনিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, লেখক ও সু-সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি রসায়ন পদার্থ ও জীববিজ্ঞান ছাড়াও প্রকৃতি বিজ্ঞানের উপর অসংখ্য প্রবন্ধ ও গ্রন্থ লিখেছেন। বাঙালিকে আত্মসচেতন করে গড়ে তোলার জন্য তিনি বিভিন্ন প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে সঙ্কট উত্তরনের পথ দেখিয়েছেন।
১৮৮৯ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি কলেজের শিক্ষক ছিলেন তিনি। এরপর ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ১৯৩৭ সালে ৭৫ বছর বয়সে তিনি যখন পরিপূর্ণ অবসর নিতে চাইলেন, তখন তাকে আমৃত্যু অধ্যাপক হিসেবে রসায়নের গবেষণা কর্মের সঙ্গে যুক্ত রাখা হয়।
শিক্ষকতার জন্য তিনি সাধারণ্যে ‘আচার্য’ হিসেবে আখ্যায়িত। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তৃতীয়বারের মত তিনি ইংল্যান্ড যান এবং সেখান থেকেই সি.আই.ই লাভ করেন। ১৯১১ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে এই ডিগ্রি দেয়। এছাড়া ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীকালে মহীশুর ও বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি ডক্টরেট পান।