প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০২৪ ১৭:৩৭ পিএম
আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৪ ১৯:০১ পিএম
ট্রেনের টিকিট কালোবাজারিতে জড়িত সিন্ডিকেটের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
গত দুই দশকে বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট বিক্রির অপারেটর, পদ্ধতি, সবকিছুতেই অনেক পরিবর্তন এসেছে। এত সময় ধরে টিকিট বিক্রিতে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে মিজান ঢালীর। একের পর এক অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি। সেই সুযোগে দিনে দিনে গড়ে তোলেন ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির বিশাল সিন্ডিকেট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে– দীর্ঘদিন মিজানের নেতৃত্বাধীন ঢালী সিন্ডিকেট ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি করে আসছে। সদস্যদের মধ্যে রয়েছে টিকিট বিক্রিসংশ্লিষ্ট অপারেটরের সাবেক ও বর্তমান কর্মচারী, আবাসিক হোটেলের কর্মচারী ও গাড়িচালক।
বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে ঢালী সিন্ডিকেটের প্রধান মিজান ঢালীসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। গ্রেপ্তার বাকিরা হলেন, সোহেল ঢালী, মো. সুমন, জাহাঙ্গীর আলম, শাহজালাল হোসেন, মো. রাসেল, জয়নাল আবেদীন, সবুর হাওলাদার ও নিউটন বিশ্বাস। তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য বৃহস্পতিবার (২১ মার্চ) রাতে রাজধানীর কমলাপুর ও সবুজবাগ এলাকায় যৌথ অভিযান চালায় র্যাব ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই)। এ সময় জব্দ করা হয় কালোবাজারির আলামত এবং অবৈধভাবে সংগ্রহ ও মজুদ করা বিপুল পরিমাণ ট্রেনের টিকিট।
শুক্রবার দুপুরে কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণ্যমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
নিরবধি মিজানের আদ্যোপান্ত
র্যাব কর্মকর্তা আল মঈন জানান, ২০০৩ সালে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ডেফোডিলের কমলাপুর রেলস্টেশন শাখায় পিয়ন হিসেবে যোগ দেন মিজান। ডেফোডিলের মেয়াদ শেষে নতুন চুক্তিবদ্ধ সিএনএস ডট বিডি নামের প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান তিনি। সবশেষ চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকমেও মিজানের চাকরি বহাল থাকে। এ সময় বিভিন্ন রেলস্টেশনে সহজ ডট কমের অফিসে ও রেলস্টেশনের কর্মচারীদের সঙ্গে মিজানের পরিচয় হয়। এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই মিজান বিভিন্ন স্টেশনে থাকা সহজ ডট কমের সদস্য, টিকিট কাউন্টার ও অন্যান্য চক্রের সমন্বয়ে টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
কারসাজিতে আরও যারা
গ্রেপ্তার বাকি আটজনের মধ্যে সোহেল ঢালী টিকিট বিক্রিসংশ্লিষ্ট একটি অপারেটরে কর্মরত। তিনি শুরুতে মিজানের আত্মীয় পরিচয়ে সিএনএস ডট বিডিতে চাকরি নেন। পরে সহজ ডট কমে কমলাপুর শাখায় অফিস সহকারী হিসেবে তার চাকরি বহাল থাকে। সুমন সিএনএস ডট বিডিতে একসময় চাকরি করতেন। সহজের সঙ্গে রেলের চুক্তি শেষ হওয়ার পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। নিউটন বিশ্বাস ২০০৩ সালে সিএনএস ডট বিডিতে স্টেশন সাপোর্টার হিসেবে যোগ দিয়ে ২০১৬ সালে সার্ভার অপারেটরের দায়িত্ব পান। পরে সহজ ডট কমেও একই পদে তিনি চাকরি পেয়ে বহাল রয়েছেন। সবুর হাওলাদার বর্তমানে সহজ ডট কমের কমলাপুর রেলস্টেশন রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কর্মরত। এ ছাড়া শাহজালাল হোসেন একজন পাঠাও চালক। জাহাঙ্গীর আলম ও রাসেল কমলাপুরে অবস্থিত একটি আবাসিক হোটেলের কর্মচারী। জয়নাল আরেকটি আবাসিক হোটেলের কর্মচারী। এ ছাড়া ঢালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত আব্দুল মোত্তালিব, আশিকুর রহমানসহ আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে র্যাব।
কার কী দায়
র্যাব মুখপাত্র আল মঈন বলেন, ‘দাপ্তরিক প্রয়োজনে প্ল্যাটফর্মের টিকিট বুকিং কাউন্টারে প্রতিনিয়ত আনাগোনা ছিল সোহেলের। মিজানের সিন্ডিকেটে যুক্ত হয়ে টিকিট বুকিংয়ের দায়িত্বে থাকা কাউন্টারম্যানদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন তিনি। কাউন্টারম্যানদের যোগসাজশে টিকিট সংগ্রহ করেন তিনি। সার্ভার অপারেটর হওয়ায় ট্রেনের শিডিউল ও টিকিট সম্পর্কে বিস্তারিত জানতেন নিউটন। এ বিষয়ে মিজানকে তথ্য দিতেন তিনি। সুমন সংগ্রহকৃত ট্রেনের টিকিটগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে বিক্রি করেন। শাহজালাল, জাহাঙ্গীর ও রাসেল কর্মস্থলে কাজের পাশাপাশি সব সময় টিকিটপ্রত্যাশী যাত্রীদের কাছে প্রায় দুই গুণ বেশি দামে টিকিট বিক্রির কাজ করেন। তারা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে টিকিট বিক্রির কার্যাক্রম চালান। সবুর সরাসরি সিন্ডিকেটপ্রধান মিজানের সঙ্গে কাজ করেন।’
এই র্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সুমন, শাহজালাল, জাহাঙ্গীর, জয়নাল ও রাসেল সিন্ডিকেটপ্রধান মিজানকে ট্রেনের টিকিটের চাহিদা দিয়ে থাকেন। তাদের চাহিদা অনুযায়ী মিজান ঢালী টিকিট সংগ্রহ করে বিক্রির জন্য তাদের কাছে সরবরাহ করেন।’
টার্গেট করে কারসাজি
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘বিশেষ করে, ঈদ, পূজা, সাপ্তাহিক ছুটিসহ বিশেষ ছুটির দিন উপলক্ষ করে সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি টিকিট সংগ্রহ করে ঢালী সিন্ডিকেট। তারা প্রতিবছর ঈদ মৌসুমে দেশব্যাপী বিভিন্ন স্টেশনের সহজ ডট কমের কর্মচারী ও টিকিট কাউন্টারম্যানদের মাধ্যমে প্রায় দুই-তিন হাজার টিকিট কালোবাজারি করেন। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরে আগের চেয়ে বেশি টিকিট সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল তাদের।‘
তিনি আরও জানান, কালোবাজারির টিকিট বিক্রির টাকা দুই ভাগ হয়। এর মধ্যে অর্ধেক পান সহজ ডট কম ও রেলস্টেশনের টিকিট কাউন্টারম্যানরা। বাকিটা পান ঢালী সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এই টাকা কখনও তারা হাতে হাতে বুঝিয়ে দেন, কখনও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব কর্মকর্তা আল মঈন বলেন, ‘সহজ ডট কম টিকিট কালোবাজারির দায় এড়াতে পারে না। তাদের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ ছিল। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কিছু দিন পরে টিকিট অনলাইনে ছাড়বে। টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ শুরু করেছে।‘