উপজেলা নির্বাচন
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২৪ ১০:৩৬ এএম
আপডেট : ২১ মার্চ ২০২৪ ১০:৫০ এএম
নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে হলে ১ লাখ টাকা জামানত দিতে হবে। ছবি : সংগৃহীত
উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের ব্যয় বাড়ছে। এ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে হলে ১ লাখ টাকা জামানত দিতে হবে। ভাইস চেয়ারম্যান পদের জন্য দিতে হবে ৭৫ হাজার টাকা। আগে এর পরিমাণ ছিল ১০ হাজার টাকা। জামানত বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংশোধনী নিয়ে বুধবার (২০ মার্চ ) ‘উপজেলা নির্বাচন বিধিমালা’এবং ‘উপজেলা পরিষদ (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা’ গেজেট আকারে প্রকাশ হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালায় নির্বাচনী ব্যয়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জামানতের টাকা ফেরত পেতে হলে প্রদত্ত ভোটের ১৫ শতাংশ ভোট পেতে হবে। আগের বিধিমালায় প্রদত্ত ভোটের ৮ ভাগের ১ ভাগের কম বা সাড়ে ১২ শতাংশের কম পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হতো। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা এই সংশোধনীকে গণবিরোধী হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আরও যেসব সংশোধন
জামানতের পরিমাণ ছাড়াও এই সংশোধিত বিধিমালার ফলে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীদের সাদাকালো পোস্টার ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা বাতিল হয়েছে। নতুন বিধিমালায় ‘নির্বাচনি সময়েরও’সংশোধন করা হয়েছে। এতে নির্বাচনী সময় বলতে তফসিল ঘোষণার পর থেকে গেজেট প্রকাশের পর ১৫ দিন করা হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের আগেও প্রার্থীরা জনসংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন। অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রত্যায়িত অনুলিপি জমা দিতে হবে। উল্লেখ করতে হবে টিআইএন নম্বর।
নির্বাচনী ব্যয়েও পরিবর্তন এসেছে। আগের আইনে প্রার্থী ব্যক্তিগত ও নির্বাচনী ব্যয় করতে পারতেন ১ লাখ ভোটারের জন্য সাড়ে ৫ লাখ টাকা, ১ লাখ ১ থেকে ২ লাখ ভোটারের জন্য ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও ২ লাখের বেশি ভোটার-সংবলিত উপজেলার জন্য ১১ লাখ টাকা। সংশোধিত বিধিমালায় চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অনধিক ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন। ‘মহিলা সদস্য’ পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অনধিক এক লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
আগে ভোটগ্রহণের তিন সপ্তাহ আগে থেকে প্রার্থীরা প্রচারণায় অংশ নিতে পারতেন। এবার তা সংশোধন করে প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকে প্রচারণা শুরুর কথা বলা হয়েছে। প্রচার-প্রচারণার আওতায় এবার ডিজিটাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও সন্নিবেশ করা হয়েছে।
এদিকে উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিধানও শিথিল করেছে ইসি। এত দিন চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে ২৫০ ভোটারের সমর্থনসূচক সই মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হতো। এটি এখন একেবারেই তুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভোটারের সমর্থনসূচক সই লাগবে না।
এতে উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পথ সুগম হলো বলেই মনে করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে জানিয়েছে, তারা এবার স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে দলীয় প্রতীক দেবে না। অন্যদিকে সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপির দলীয়ভাবে এ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হবে মূলত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীরা সাদাকালোর পাশাপাশি রঙিন পোস্টার ও ব্যানার করতে পারবেন। এ ছাড়া নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত ও পুনরায় ভোটের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে ইসির ক্ষমতা স্পষ্ট করা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাচন বিধিমালার ৩৯ বিধি সংশোধন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন প্রার্থীকে জামানত দিতে হয় ২০ হাজার টাকা। আর এখন উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য দিতে হবে ১ লাখ ও ৭৫ হাজার টাকা। এই পরিবর্তন গণবিরোধী বলে মনে করি। এর প্রয়োজন ছিল না। এতে করে বিত্তবান মানুষরাই প্রার্থী হতে পারবেন। আমার ধারণা, নির্বাচন কমিশন চাচ্ছে না যে উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ুক।
নাগরিক সংগঠন ‘সুজন’ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জনপ্রতিনিধিত্ব এখন ব্যবসায়ী ও বিত্তবানদের হাতে চলে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকারÑ সব জায়গাতেই একই অবস্থা। উপজেলা নির্বাচন বিধিমালা সংশোধন করে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে নির্বাচন কমিশন কাদের স্বার্থ রক্ষা করেছে তা পরিষ্কার। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোটারদের সমর্থনসূচক সই জমা দেওয়ার বিধান বাতিল করাকে আমি সমর্থন করি। এই বিধানটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিলে ব্যবহার হচ্ছিল।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, সংবিধানে বলা আছে, ২৫ বছর বয়স পূর্ণ হলে, অপ্রকৃতিস্থ বা পাগল বলে ঘোষিত না হলে, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব না নিলে বা বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার না করলে, নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধের দায়ে দুই বছরের কারাদণ্ডের পর মুক্তি পাওয়ার পাঁচ বছর পার হলে এবং দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী না হলে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া যাবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই বিধান রয়েছে। এর বাইরে জামানতের টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি সংবিধানসম্মত নয় বলেই আমি মনি করি। আর সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের জামানত যেখানে ২০ হাজার টাকা সেখানে উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ১ লাখ টাকা জামানত একধরনের প্রহসন।
তিনি আরও বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিধানটি বাতিল করাটি সঠিক হয়েছে বলেই আমি মনে করি। এ বিধানটি সংবিধানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে ভোটারদের গোপনীয়তা ভঙ্গ হয়। রঙিন পোস্টার ব্যবহারের পক্ষে বিধান করার বিষয়টিও সময়োপযোগী হয়েছে। ২০০৮ সালে রঙিন পোস্টারের ব্যয় সাদাকালো পোস্টারের ব্যয়ের তুলনায় বেশি থাকলেও বর্তমানে তা নেই। এ ছাড়া এখন সাদাকালো পোস্টার ছাপাতেই বরং সমস্যা হয়। তবে এসব পরিবর্তনের চেয়ে নির্বাচন কমিশনের উচিত নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য উদ্যোগী হওয়া।
জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ গতকাল সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, যারা নির্বাচনে প্রার্থী হন তারা কম টাকা ব্যয় করেন বলে মনে হয় না। আর জামানতের টাকা তো ফেরতযোগ্য। প্রদত্ত ভোটের ১৫ শতাংশ পেলে ওই টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। যারা এর কম ভোট পাবেন তাদের প্রার্থী হওয়া উচিত না।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ভোটারদের সইয়ের তালিকা জমা দেওয়ার বিধান বাতিল সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য অনেক সময় ভোটাররা স্বাক্ষর দিতে চায় না। সে কারণে সই জাল করার ঘটনা ঘটে। এ বিধানটি নিয়ে অনেকের আপত্তি ছিল। এ কারণে কমিশন এটি তুলে দিতে চেয়েছে।
তিনি জানান, উপজেলা নির্বাচন বিধিমালা ও আচারণ বিধিমালা সংশোধনের জন্য কমিশন যেসব প্রস্তাব রেখেছিল তার সবগুলোই আইন মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোটারদের সইয়ের তালিকা জমা দেওয়ার বিধানে পরিবর্তন আসবে কি না, এ প্রশ্নে অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, এটা পরিবর্তন করতে হলে আইন পরিবর্তন করতে হবে। এটার জন্য সময় আছে। নির্বাচন কমিশন চাইলে এ বিষয়ে প্রস্তাব রাখতে পারে।
উপজেলা নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ তফসিল আজ
আজ বৃহস্পতিবার প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। গতকাল ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
এবার চার ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হবে। প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ আগামী ৪ মে, দ্বিতীয় ধাপে ১১ মে, তৃতীয় ধাপে ১৮ মে এবং চতুর্থ ধাপের ভোট হবে ২৫ মে। ভোটের তারিখ জানানো হলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ তফসিল ঘোষণা করা হয়নি। আজ সকালে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের ২৯তম সভা হতে যাচ্ছে। সভায় সম্প্রতি শূন্য হওয়া ঝিনাইদহ-১ আসনের উপনির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।