× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইতিহাসের এক অনন্য সৈনিক বীর উত্তম লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দার

মধ্যাঞ্চলীয় ব্যুরো

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২২ ০৭:১৫ এএম

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২২ ০৭:৫১ এএম

একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে নিয়াজী ও অরোরার সঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দার। ছবি: সংগৃহীত

একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে নিয়াজী ও অরোরার সঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দার। ছবি: সংগৃহীত

একাত্তরে সেনাবাহিনীর যে বীর বাঙালি সদস্যেরা মহান মুক্তিযুদ্ধে সামরিক প্রতিরোধ ও মুক্তিবাহিনীর ভিত্তি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, লড়েছিলেন বীরদর্পে রণাঙ্গণে, তাদের অন্যতম একজন তৎকালীন মেজর ও পরবর্তী সময়ে বীর উত্তম লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দার। বাঙালিদের মধ্যে শুধু এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান একে খন্দকার উপস্থিত ছিলেন ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পরাজিত পাকিস্থানী বাহিনীর আত্মসমপর্ণ অনুষ্ঠানে।

ডিসেম্বরে প্রথমে ঢাকা বেতার ও টিভি থেকে ঘোষণাও পাঠ করেন- 'আমি মেজর হায়দার বলছি- মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নির্দেশ... ...।' ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিতায় ৬ নভেম্বর ভোররাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানীকে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দার এসএসজি বীর উত্তম এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি ছিলেন ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর)।

মো. ইসরাইল মিয়া ও হাকিমুন্নেসার পুত্র এটিএম হায়দারের জন্ম কলকাতার ভবানীপুরে। ১৯৪২ সালের ১২ জানুয়ারি। ২ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে হায়দারদ্বিতীয়।

হায়দার পাবনা বীণাপাণি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর ১৯৫৮ সালে কিশোরগঞ্জ রামানন্দ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৬১ সালে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৬৩ সালে লাহোর ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেন।

তারপর লাহোরের পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি থেকে পরিসংখ্যানে এমএসসি ১ম পর্ব সমাপ্তির পর সামরিক বাহিনীতে কমিশন্ড পদে মনোনীত হন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্থান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।

তিনি প্রথমে কাকুলে ট্রেনিং নেন এবং কমিশন প্রাপ্তির পর গোলন্দাজ বাহিনীর অফিসার হিসেবে নিয়োজিত হন। হায়দার চেরাটে এমএসজি (স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ) ট্রেনিংয়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে একজন দক্ষ গেরিলা কমান্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

কমান্ডো ট্রেনিংয়ে ৩৬০ জনের মধ্যে মাত্র দুই জন বাঙালি অফিসার ছিলেন। কমিশন প্রাপ্তির পর ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের মুলতান ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬৯ সালের শেষের দিকে তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে তাকে কুমিল্লা সেনানিবাসে পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ১৫ বা ২০ দিন পর তাকে ফের কুমিল্লায় নিয়োগ করা হয়।

মার্চ মাসের প্রথম দিকে ঢাকায় সামরিক ছাউনিতে তাঁবুর মধ্যে কয়েকজন বাঙালি অফিসারের সঙ্গে তাকে অন্তরীণ রাখা হয়। মার্চ মাসের ২১ বা ২২ তারিখে তাকে আবারও কুমিল্লা সেনানিবাসে তৃতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নে পাঠানো হয়। যা ছিল বাংলাদেশে প্রথম পাকিস্তানি কমান্ডো ব্যাটালিয়ন।

সম্ভবত ২৬ বা ২৭ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের পতনের দিন সকাল ১০টায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি পালিয়ে যান। ৪র্থ ইস্টবেঙ্গল তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চলে গেছে। তিনি ৪র্থ বেঙ্গলের অন্য অফিসারদের সঙ্গে সেখানে মিলিত হন।

সেখান থেকে তেলিয়াপাড়া পরে ভারতের মতিনগর হয়ে মেঘালয়ে যান। তখন ২নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল মেঘালয়ে। হায়দার এখানে প্রথমে একটি স্টুডেন্ট কোম্পানি গঠন করেন। তিনি কোম্পানিটিকে নিজেই গেরিলা ট্রেনিং প্রদান করতেন।

পরবর্তীতে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিয়োজিত হন তিনি। মেঘালয়ে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডো, বিস্ফোরক ও গেরিলা প্রশিক্ষণসহ শপথও তিনি করাতেন। ৭ অক্টোবর ‘কে ফোর্স’ গঠনের পর মেজর হায়দার ২ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন।

এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় তিনি ভারতীয় কমান্ডো ও ৬,৭ জন সৈন্য নিয়ে কিশোরগঞ্জে আসেন এবং কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ মহাসড়কের তারেরঘাট ব্রিজ, মুসুল্লি রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস করে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সুসংহত করেন। তিনি বিশেষ গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রাস্তার ফেনীতে অবস্থিত বড় ব্রিজটি ধ্বংস করেন মে মাসের শেষ সপ্তাহে।

ডিসেম্বরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পতনের পর ঢাকায় পাক হানাদারদের আত্মসমর্পণের আগে মিত্র বাহিনীর হাইকমান্ডসহ হেলিকপ্টারে তিনি ঢাকার অদূরে ডেমরা পর্যন্ত আসেন এবং সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্থানীদের আত্মসর্মপণের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তিনি এবং একে খন্দকারই ছিলেন বাঙালি অফিসার- যারা এ অনুষ্ঠানে ছিলেন। ডিসেম্বরের শরতে ঢাকা বেতার ও টিভি থেকে তিনি ঘোষণা পাঠ করেন- 'আমি মেজর হায়দার বলছি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নির্দেশ......।'

১৯৭২ সালে মেজর থাকা অবস্থায় হায়দার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ১৩ ইস্টবেঙ্গল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৪ এ তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন এবং চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অষ্টম বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৭৫ এর ১ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ছুটিতে কাটান। ২৭ অক্টোবর চট্টগ্রামের রুমা সেনানিবাসে যোগদান করেন।

৬ নভেম্বর ভোররাতে শেরেবাংলা নগরে সশস্ত্র বাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্যের হাতে ব্রিগেডয়ার খালেদ মোশাররফের সঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হায়দার এসএসজি বীর উত্তম নিহত হন। পাক হানাদাররা যাকে স্পর্শ করতে পারেনি তিনি এদেশের কতিপয় সৈন্যদের হাতে নিহত হন।

তুখোড় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তার বাবার স্থাপিত কিশোরগঞ্জ শোলাকিয়া মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। বাবার টেলিগ্রাম পেয়ে হায়দার কিশোরগঞ্জ যাওয়ার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। কিশোরগঞ্জে আসলেন ঠিকই তবে ঘাতকের নির্মম বুলেটে রক্তাক্ত লাশ হয়ে। কিশোরগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে চিরনিদ্রায় শায়িত বাঙালি জাতির বীর যোদ্ধা।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এ প্রজন্মের অনেকেই তার নামটি পর্যন্ত জানে না, চেনে না। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো অনুষ্ঠানে তার নামও উচ্চারিত হয় না।

প্রসঙ্গত, হায়দার বীরউত্তমের অনুজ ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বীর প্রতীক। ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম বীর প্রতীক বলেন, স্বাধীন দেশের বীর সেনানী ভাই এটিএম হায়দারের অবিশ্বাস্য মৃত্যুই তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখময় স্মৃতি। দুঃখ, অভিমান ও হতাশায় তিনি বর্তমানে আমেরিকায় প্রবাসী।

তার একমাত্র ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা এটিএম সাফদার জিতু কিশোরগঞ্জ শহরের খরমপট্রিতে পৈত্রিক বাড়িতে আলাপকালে জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তার ভাই-বোনের অবদান জাতি মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করলে পরিবারের দুঃখটা থাকতো না। কিন্তু জাতীয় দিবসসহ অন্যান্য দিবসে তাদের সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না বলে একে জাতি হিসেবে সংকীর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলেও জানান তিনি।

তিনি জানান, এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সত্যিকার অর্থেই নতুন প্রজম্ম বঞ্চিত হবে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস হতে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা