প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০০:০১ এএম
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১০:২৩ এএম
আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ১৯৫২ সালে আজকের এই দিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে তৎকালীন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভেঙে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে ছাত্রছাত্রীরা। সেদিন শিক্ষার্থী-জনতার মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে শহীদ হন রফিক, জব্বার ও বরকত। গুরুতর আহত আবদুস সালামের মৃত্যু ঘটে ২৫ ফেব্রুয়ারি। পুলিশের গুলিবর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে জনতা। অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহারের অধিকার।
৭২ বছর আগে ২১ ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গুলিতে ছাত্রহত্যার কথা জানতে পেরে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম লেখেনÑ ‘মুখের বোল কাড়িয়া নিবে/ রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে/ ঘোষণা করিল যখন/ যারা বাংলা মায়ের ছেলে/ পরিষ্কার দিলো বলে/ মানবো না থাকিতে জীবন/ রাখতে বাংলা ভাষার মান/ অকাতরে দিলো প্রাণ/ আমরা যে বাঁধা ঋণে।’ তাৎক্ষণিকভাবে রচিত এ গান করিম তখন বিভিন্ন মঞ্চে পরিবেশনও করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি গানটি পরিমার্জন করে সংকলিত করেন তাঁর ‘ভাটির চিঠি’ (১৯৯৮) বইয়ে।
প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি/ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’Ñকালজয়ী এ গানটি আমাদের চেতনার সঙ্গে মিশে আছে। যতদিন বাঙালি জাতির অস্তিত্ব থাকবে ততদিন এই অমর সংগীতও উচ্চারিত হবে মানুষের মুখে মুখে।
একুশকে কেবল একটি ঐতিহাসিক তারিখ হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। বাঙালি জাতিসত্তা মূলত বিকশিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয় একুশের হাত ধরেই। একুশ আমাদের চেতনা। সাহিত্যিক আবুল ফজলের বিখ্যাত উক্তি, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা।’ প্রকৃতার্থেই একুশ বাঙালির আত্মশক্তি আর অহংবোধকে তুলে ধরে। একুশ মানেই গণতান্ত্রিক, উদারনৈতিকতা ও প্রগতিভাবাপন্ন রাষ্ট্র এবং সুষম সমাজ গড়ার শপথ। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিকে মর্যাদা দেওয়াও একুশের চেতনা। তাই একুশ নিয়ে অহংকার করতে চাইলে ভাষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত চেতনাকেই ধারণ করতে হবে। একুশের মূল চেতনাই হচ্ছে সকল ভাষার অধিকার সুপ্রতিষ্ঠা করা।
ভাষাসংগ্রামী প্রয়াত ড. আনিসুজ্জামান তার ভাষা আন্দোলনের প্রাসঙ্গিক কথায় ১৯৪৭-৫২-এর সংগ্রামী পরিক্রমায় লেখেন, ‘১৯৪৭ সাল থেকেই সরকারবিরোধী ছাত্র, যুব ও রাজনৈতিক সংগঠনের সূচনা হতে থাকে। একধরনের অসন্তোষ দেশের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালের মার্চে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালিত হয় প্রধানত ছাত্রদের নেতৃত্বে। জিন্নাহ ছাত্রদের নিরস্ত করতে পারেননি। কিন্তু আন্দোলন খানিকটা থিতিয়ে গিয়েছিল। ১৯৫২ সালে খাজা নাজিমউদ্দীনের বক্তৃতা আবার চাবুক মেরে সেই আন্দোলনকে জাগিয়ে তুলেছিল।’
ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হকের স্মৃতিতে ভাস্বর ২৬ জানুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ কালপর্বের ‘ভাষার লড়াইয়ের তুঙ্গ মুহূর্তগুলো।’ এতে তিনি লিখেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারি আবদুল মতিন শান্তভাবে যুক্তি দিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বক্তব্য রাখলেন। সবশেষে সভাপতি হিসেবে আমি আমার বক্তব্য রাখি। আমার সেদিনের বক্তব্যের সব কথা মনে পড়ে না। তবে মোটামুটিভাবে শেষাংশ বোধ হয় এ রকম ছিল, নুরুল আমিন সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে পুলিশ মোতায়েন করেছে। ১৪৪ ধারা ভাঙা হলে নাকি গুলি করা হবেÑ ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করা হবে। ১৪৪ ধারা আমরা ভাঙব। আমরা দেখতে চাই নুরুল আমিন সরকারের বারুদাগারে কত বুলেট জমা আছে।’
৭২ বছর আগে আজকের এই দিনে এভাবে ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ তখনকার শাসকগোষ্ঠীর ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শঙ্কিত করে তোলে। তারা অপচেষ্টা চালায় গুলি চালিয়ে সেই গতিকে রোধ করতে। কিন্তু ছাত্রদের আত্মদানে আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে ওঠে। বাঙালির জন্য এই দিনটি শোক ও বেদনার; অন্যদিকে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরেই ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আসে স্বাধীনতা, নতুন রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের।
কর্মসূচি : রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতি একুশের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে। একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এ ছাড়া কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি, আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মধ্য দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে সর্বস্তরের মানুষ। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দিবসটি পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে, সারা বিশ্বে।
আজ বুধবার দিবসটি উপলক্ষে রয়েছে সরকারি ছুটি। এদিন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। জাতীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো আজ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কোরানখানির আয়োজনসহ দেশের সকল উপাসনালয়ে ভাষাশহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মিশনগুলো শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাণী পাঠ, বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলনবিষয়ক আলোচনা সভা, পুস্তক ও চিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং বাঙালি অভিবাসীদের এসব কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কদ্বীপ ও গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাজনক স্থান বাংলাসহ অন্যান্য ভাষার বর্ণমালা সংবলিত ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। একুশের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার ও সংবাদপত্রগুলোয় ক্রোড়পত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের বিষয়টি বিশেষভাবে উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ দুই দিনব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারা দেশে সংগঠনের সকল কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত করা ও কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ এবং প্রভাতফেরি।
এ ছাড়া আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আলোচনা সভা হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিএনপিও দিবসটি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টায় রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এ উপলক্ষে দলটি আলোচনা সভার আয়োজন করে। আজ বুধবার ভোরে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন, ভোর ৬টায় কালোব্যাজ ধারণ করে প্রভাতফেরির জন্য বলাকা সিনেমা হলের কাছে নেতাকর্মীদের জমায়েত এবং আজিমপুরে ভাষাশহীদদের কবর জিয়ারত ও সেখান থেকে প্রভাতফেরিসহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবে বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা সভা, শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণসহ নানা কর্মসূচি পালন করবে।