মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিং
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০০:৫৩ এএম
যুক্তরষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার। ছবি : সংগৃহীত
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের বিচারপ্রক্রিয়া বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রেস ব্রিফিংয়ে এমন মন্তব্য করেন মুখপাত্র ম্যাথু মিলার। এদিকে এমন মন্তব্য বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর হস্তক্ষেপ মনে করে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার কথা বলছেন মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিচার অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়েছে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নে মুখপাত্র ম্যাথু মিলার বলেন, ‘আমরা উদ্বিগ্ন, শ্রম এবং দুর্নীতি দমন আইনের অপব্যবহারের যে ধারণা তৈরি হচ্ছে, সেটা আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং ভবিষ্যতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।’
শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেওয়া, শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করায় তিন বছর আগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের এক মামলায় গত ১ জানুয়ারি গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত।
আপিলের শর্তে সেদিনই তাদের জামিন দেওয়ায় কাউকে কারাগারে যেতে হয়নি। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে এর বিরুদ্ধে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন ইউনূস। পরে শ্রম ও কলকারখানা অধিদপ্তরের এক আবেদনে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আদেশ দেন, বিদেশে যেতে হলে ইউনূসকে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে জানিয়ে যেতে হবে। এ ছাড়া গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আরেক মামলায় অভিযোগপত্র অনুমোদন দিয়েছে দুদক।
সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীর মিরপুরের চিড়িয়াখানা রোডে গ্রামীণ টেলিকম ভবন ‘দখল করার চেষ্টার’ অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সামনে এনে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন করেন বিতর্কিত সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী।
মুশফিকুল ফজল আনসারী জানতে চান, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ২০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির একটি দল নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অফিস দখলের চেষ্টা চালিয়েছে এবং আপনি জানেন যে, বাংলাদেশের শাসক দল ইতোমধ্যে একতরফা সংসদ, বিচারাঙ্গন, মিডিয়া, দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়ন্ত্রণে রেখেছে আর এখন গ্রামীণের মতো সংস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
জবাবে ম্যাথি মিলার বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে দায়ের করা একাধিক ফৌজদারি মামলার বিষয়ে আমরা লক্ষ করছি যে, শ্রম মামলাটি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বিচার করা হয়েছে। অতিরিক্ত মামলার চার্জশিট অনুমোদন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন, যা বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে। আমরা অন্যান্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের সঙ্গে উদ্বিগ্ন যে, এই মামলাগুলো ড. ইউনূসকে হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশের শ্রম আইনের অপব্যবহার হতে পারে। আমরা উদ্বিগ্ন যে, শ্রম এবং দুর্নীতিবিরোধী আইনের এই অপব্যবহার আইনের শাসনকে বাধাগ্রস্ত করার সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আমরা ড. ইউনূসের জন্য একটি ন্যায্য ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য
এদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিচার অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। গত বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মিউনিখ সফর’ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
ইউনূস ইস্যুতে মিলারের বক্তব্যের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি (ম্যাথিও মিলার) কী মন্তব্য করেছেন, সেটা আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। শোনা কথার ওপর মন্তব্য করা অনুচিত। নিজে দেখে-পড়ে ও জেনে মন্তব্য করা উচিত। তবে এটুকু বলতে পারি, ড. ইউনূসের যে বিচার হচ্ছে, সেটা খুবই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে। তিনি (ইউনূস) আদালতের মাধ্যমে সাজা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে জামিনও দেওয়া হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়, এই বিচার স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে।’ আর এখানে সরকার কোনো পার্টি (পক্ষ) না, ইউনূসের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও শ্রমিকরাই তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ সেটা আপনারা জানেন।
আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, মামলা করার সময় কলকারখানা অধিদপ্তর থেকে তারা অনুমতি নিয়েছেন। মামলা করতে হলে এই অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হয়। এ প্রসঙ্গে ইউনূসের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের না জেনে, না শুনে এই ধরনের মন্তব্য করা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি অবমাননার শামিল। এটা এক ধরনের আদালত অবমাননা। আমরা প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের বিরুদ্ধে আর্জি নিয়ে আসব। মুহাম্মদ ইউনূসকে আইনি লড়াইয়ে কোথাও ছাড় দেব না। ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টকে সরাসরি বলে দিচ্ছি, এ বিষয়ে নাক গলাবেন না, নইলে আপনাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।