× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ক্যানসার চিকিৎসায় ‘যুদ্ধ’ সিরিয়ালেই জীবন শেষ

রাজবংশী রায়

প্রকাশ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৮:৩৪ এএম

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১২:২২ পিএম

ক্যানসার চিকিৎসায় ‘যুদ্ধ’ সিরিয়ালেই জীবন শেষ

বগুড়ার বাসিন্দা রহিম শেখ এক বছরের বেশি সময় ধরে কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। এই কেমোথেরাপি নিতে গিয়ে তাকে যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তা অবর্ণনীয়। তার এ ভোগান্তির সঙ্গী স্ত্রী রোজিনা বেগমের ভাষায়- চিকিৎসা পাওয়াও একটা ‘যুদ্ধ’। পদে পদে ভোগান্তি, হয়রানির শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কেমোথেরাপি নেওয়ার জন্য ছয় মাস সিরিয়াল ধরে থাকতে হয়েছে। বহু চেষ্টা-তদবিরের পর সিরিয়াল পেলেও হাসপাতালে ভর্তির শয্যা মেলেনি। পরে হাসপাতালের পাশে একটি বাসা ভাড়া নেন। সেখানে থেকে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। গত বুধবার ছয়টি কেমোথেরাপি শেষ হয়েছে। চিকিৎসক এখন রেডিওথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। রোজিনা জানেন না, কতদিনে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল মিলবে? 

রহিম শেখ ও রোজিনার মতো ক্যানসারের চিকিৎসা পেতে এভাবেই ‘যুদ্ধ’ করে যাচ্ছে শত শত রোগী ও তাদের স্বজনেরা। সরেজমিন জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালে বহির্বিভাগের সামনে শত শত মানুষ। কেউ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আবার কেউ মেঝেতে বসে আছে। সারিবদ্ধ এই লাইন হাসপাতাল ভবন পেরিয়ে সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত। শারমিন জাহান নামে এক রোগীর স্বজন জানান, ফজরের আজানের পর তিনি হাসপাতালে এসেছেন। এরপরও সিরিয়ালের অনেক পেছনে পড়ে গেছেন তিনি।

তিনি জানান, বহির্বিভাগ বেলা ২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এর মধ্যেই চিকিৎসক দেখাতে হয়। তবে রোগীর ফাইল দুপুর ১২টার মধ্যে জমা দিতে হয়। ১২টা পর্যন্ত যতগুলো ফাইল জমা পড়ে সেগুলো বেলা ২টা পর্যন্ত চিকিৎসকরা দেখে পরামর্শ দেন। এ কারণে ভোরে এসে সিরিয়াল দিতে হয়েছে। যাতে প্রথম ধাপে চিকিৎসক দেখানো ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সবকিছু ১২টার আগে করে চিকিৎসক বোর্ডে জমা দেওয়া যায়।

নোয়াখালীর বাসিন্দা সাথী আক্তার জানান, তার মায়ের জরায়ু ক্যানসার। এক মাস ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অসুস্থ রোগী নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসক দেখানো ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন।কিন্তু এখনও চিকিৎসা শুরু হয়নি।

ফজলুল হক নামে এক রোগী জানান, হাসপাতালের পাশে একটি ঘরে দৈনিক ৩০০’ টাকা ভাড়ায় থেকে তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার মতো শত শত রোগী হাসপাতালের পাশে বাসাবাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

ফজলুল হক অভিযোগ করে বলেন, অতিরিক্ত চাহিদার সুযোগ নিয়ে হাসপাতালের কর্মচারীদের একটি চক্র শয্যাবাণিজ্য করছে। ওই চক্রটি কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সিরিয়াল নিয়েও বাণিজ্য করে। শয্যা পেতে ৫ থেকে ১০ হাজার এবং কেমো ও রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।

ক্যানসার আক্রান্ত দেশের নিম্ন আয়ের রোগীদের একমাত্র ভরসার স্থল এ হাসপাতাল। বেসরকারি হাসপাতাল বা দেশের বাইরে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই- এমন রোগীরা এখানে ভিড় করে। ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালটি রোগীর ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এ সুযোগ নিয়ে একটি চক্র বছরের পর বছর বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক রোগীকে চিকিৎসার সুযোগ না পেয়েই জীবন দিতে হয়। 

জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নিজামুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ক্যানসার আক্রান্ত রোগীকে দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা নিতে হয়। একজন রোগীকে প্রথম দফায় এক মাস বা তারও বেশি সময় হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। এরপর ২১ দিন পরপর কেমোথেরাপি নিতে হয়। তখন গড়ে তিন দিন করে ভর্তি থাকতে হয়। এই সময়ে অন্য রোগীদের একটি দীর্ঘ সিরিয়াল পড়ে। সময়ের সঙ্গে এটি বাড়তে থাকে। ৫০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতি ১০ জনে একজন রোগীও দৈনিক ভর্তি করা সম্ভব হয় না। এতে রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ে। হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ক্যানসার চিকিৎসার পরিধি বাড়াতে হবে। প্রত্যেকটি বিভাগীয় শহরে একটি করে হাসপাতাল স্থাপন প্রক্রিয়া চলমান আছে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে অনকোলজি ইউনিটগুলো শক্তিশালী করতে হবে। যাতে রোগীরা সেখানে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পায়। তাহলে সংকট কিছুটা হলেও দূর হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ১৫ লাখের মতো মানুষ ক্যানসারের জীবাণু বয়ে বেড়াচ্ছে। অপরদিকে ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর ক্যানসার (আইএআরসি) বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে দেড় লাখ মানুষ ক্যানসার আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে মৃত্যু হচ্ছে ১ লাখ ৮ হাজার জনের। তাদের চিকিৎসার জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় শয্যা আছে মাত্র ৫০০। অর্থাৎ একটি শয্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা তিন হাজার। আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। অন্যরা চিকিৎসার বাইরে থাকছে। অথচ দেশে কত সংখ্যক মানুষ ক্যানসার আক্রান্ত সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে। এ অবস্থায় আজ রবিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ক্যানসার দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘যত্নের ঘাটতি কমিয়ে আনুন।’ 

চিকিৎসায় হাহাকারের চিত্র

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী ১৭ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে ১৭০টি ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্রের প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে মাত্র ৯টি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ছয়টি হাসপাতালে ক্যানসার রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রতি বছর রোগী বাড়লেও ক্যানসার চিকিৎসার পরিধি বাড়ছে না। সরকারি পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিৎসা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একমাত্র ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ছাড়া অন্যগুলোতে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেই। বেসরকারিভাবে রাজধানীর ইউনাইটেড, স্কয়ার, ডেলটা, আহ্‌ছানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতাল এবং ঢাকার বাইরে খাজা ইউনুস, নর্থ-ইস্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিৎসা দেওয়া হলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দরিদ্র মানুষের পক্ষে এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া অসম্ভব। দেশে ক্যানসার চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও নেই। সারা দেশে মাত্র ২০০ চিকিৎসক রয়েছে। আটটি ব্ভিাগে ১০০ শয্যার ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা ছিল বর্তমান সরকারের। ২০১৯ সালে একনেকে ৮ বিভাগীয় শহরে একটি করে ১০০ শয্যার ক্যানসার হাসপাতাল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু চলতি বছরে তা শেষ হবে না বলে স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।

জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সরকারি পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসায় ৪৬টি বিশেষজ্ঞ এবং ৪২টি প্রশিক্ষণ পদের চিকিৎসক রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি পর্যায়ে ৩২ হাজার ৬০৮ রোগীর বিপরীতে একজন চিকিৎসক রয়েছে। ক্যানসার চিকিৎসায় সারা দেশে ৫০০ শয্যা আছে। তিন হাজার রোগীর বিপরীতে শয্যা আছে একটি। সরকারি পর্যায়ে কোনো অনকোলজিস্ট নার্স নেই। মেশিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দেওয়া জনবল নিয়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা চলছে। রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্টদের ৬৫ পদের মধ্যে ৩৯টিই শূন্য পড়ে আছে। 

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দেশে ক্যানসারের সর্বোচ্চ চিকিৎসা থাকলেও অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার কারণে মানুষকে সুচিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। রাজধানীর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া দেশের অন্য হাসপাতালগুলোতে নামেমাত্র ক্যানসার চিকিৎসা সেবা চালু আছে। যন্ত্রপাতি ও জনবলেরও যথেষ্ট ঘাটতি আছে। সরকারকে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। এজন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞ তৈরির পাশাপাশি সেবার পরিধিও বাড়াতে হবে। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রত্যেকটি বিভাগীয় শহরে একটি করে ১০০ শয্যার ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া চলমান আছে। ভবন নির্মাণ শেষ হলে জনবল নিয়োগ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করে সেগুলো পুরোদমে চালু করা হবে। এসব হাসপাতালে বিকিরণ চিকিৎসার জন্য সর্বাধুনিক টেলিথেরাপি ও ব্রাকিথেরাপি মেশিন, অস্ত্রোপচার, ইনডোর ও ডে-কেয়ার কেমোথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসার প্রয়োজন হবে না। এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভোগান্তিও কমবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা