অগ্নিদুর্ঘটনা
বহ্নি ফারহানা
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৪ ২২:৫৭ পিএম
আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৪ ২৩:৩৮ পিএম
প্রতীকী ছবি
রান্না করতে গিয়ে চুলার আগুনে দগ্ধ হয়ে এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে কাতরাচ্ছেন কিশোরগঞ্জের নিলুফা বেগম। তিনি জানান, নষ্ট গ্যাসের চুলায় রান্না করতে গিয়ে আগুন লেগে যায় শরীরে। শুধু নিলুফা বেগমই নয়, তার মতো এমন অসংখ্য নারী দগ্ধ হয়ে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যাদের বেশিরভাগই রান্না করতে গিয়ে দগ্ধ হয়েছেন।
ডান হাত ও শরীরের কোমর পর্যন্ত পুড়ে গেছে আসমার। সঙ্গে বোনকে নিয়ে এ হাসপাতালেই চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। যন্ত্রণায় ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না। কীভাবে এমন হলো সেই প্রশ্নে বলতে শুরু করেনÑ চুলা জ্বালাতেই দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগুন ওড়নায় লেগে যায়। বোন বাঁচাতে গিয়ে নিজের শরীরেও লেগে যায়। বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত, প্রাণে বেঁচে গিয়েছি।
বার্ন ইনস্টিটিউট ঘুরে দেখা গেছে, দগ্ধ রোগীদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। শীতকালে রান্না ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে গ্যাসের চুলা ব্যবহার, গরম পানির বেশি ব্যবহার এবং আগুন পোহানোর ক্ষেত্রে অসাবধনতার কারণে নারী ও শিশুরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ছাড়াও ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটেও প্রায় একই রকম চিত্র দেখা গেছে।
গত ডিসেম্বরে দগ্ধ হয়ে বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসেছেন মোট ১ হাজার ১২৬ জন। এর মধ্যে নারী ৩১৭ জন, যাদের ২৯৫ জনই জ্বালানি বা চুলার আগুনে দগ্ধ হয়েছেন। নভেম্বরে এ সংখ্যা কম ছিল। ওই মাসে ৮১০ জন দগ্ধ হয়ে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেন। যেখানে জ্বালানি বা চুলার আগুনে দগ্ধ হয়েছেন ১৬৬ জন। এই মাসে জরুরি বিভাগে দগ্ধ হয়ে চিকিৎসা নেন ৯২ নারী।
এ ছাড়া বেশিরভাগ শিশুই উত্তপ্ত তরলে দগ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে। নভেম্বরে উত্তপ্ত তরলে দগ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে মোট ৪৫৬ জন। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যা ছিল ৩৬৫ জন। ডিসেম্বরে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১০ জন। সেই সঙ্গে বাড়ে দগ্ধ শিশুদের সংখ্যাও। ওই মাসে ৪৭৪ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে, যাদের প্রায় সবাই উত্তপ্ত তরলে দগ্ধ।
ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. তরিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ৭০ শতাংশই থাকে নারী ও শিশু। জানুয়ারি মাসে তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি, তবে এ সংখ্যা গত দুই মাসের চেয়ে আরও বেশি হবে বলে মনে করি। বেশিরভাগ রোগীই আসে গরম পানিতে দগ্ধ হয়ে। যার মধ্যে শিশুদের সংখ্যা বেশি। এরপরই রান্নাঘর থেকে আগুনে দগ্ধ নারীর সংখ্যা রয়েছে। নারীরা আসেন গ্যাসের আগুন, রান্না করতে গিয়ে বিস্ফোরণ বা চুলার আগুনে পুড়ে। এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে শীতকালে দ্বিগুণ থেকেও বেশি বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব নিয়ে সচেতনতার কথা বলা হলেও এ ধরনের দুর্ঘটনা বাড়ছে। শীতে গোসলের জন্য মৃদু গরম পানির কথা বলা হলেও অনেক বেশি গরম পানি ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া গরম পানি শিশুদের নাগালের বাইরে রাখার বিষয়ে সচেতনতার অভাব তো রয়েছেই। পরিবারগুলোকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
গরম পানিতে ঝলসে গেছে যশোরের নড়াইলের বাসিন্দা দশ মাস বয়সি শিশু আরাফের মুখ হাতসহ শরীরে ডানপাশ। ৪৬ দিন চিকিৎসার পর এখন কিছুটা সুস্থ। ঢাকা মেডিকেলে শিশুদের ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, আরাফকে নাকে নল দিয়ে খাবার দেওয়া হচ্ছে। পাশে বসে আছেন মা মুরসালীন ও নানি মরিয়ম বেগম।
আরাফের মা মুরসালীন বেগম জানান, দেড় মাস আগে গরম পানি ছিটকে পড়ে আরাফের মুখসহ শরীর ঝলসে যায়। এ ঘটনার কয়েক দিনের মাথায় টাকা-পয়সা খরচ হবে বলে শিশুটির বাবা কৃষক সবুজ মিয়াও পালিয়ে যান। নড়াইলে কিছুদিন চিকিৎসার পর আরাফকে এখানে নিয়ে আসি। এখন পর্যন্ত ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেদিন পরিবারের অন্যরা যদি খেয়াল রাখত, তাহলে বাচ্চাটার এ অবস্থা হতো না। এখন আমার শ্বশুরবাড়ির কেউ খবর রাখে না।
শীতের সকালে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়েছেন রংপুরের মিঠাপুকুরের সাত বছর বয়সি জান্নাত। গায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের বিছানায় কাতরাচ্ছে এই শিশু। পাশে থাকা তার মা হাফসা বেগম জানান, আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ জান্নাতকে রংপুর হাসপাতাল থেকে এখানে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, বাচ্চা মানুষ, অনেক কষ্ট পাচ্ছে। ড্রেসিংয়ের সময় বেশি কষ্ট হয়।
লিজা মনি ময়মনসিংহের কেন্দুয়া থেকে এসেছেন মেয়ে জামিলাকে নিয়ে। ১৬ দিন এই হাসপাতালে আছেন তিনি। রান্না করার পর হঠাৎ এমন ঘটনা ঘটে যায়। মা লিজা মনি বলেন, রান্না করে গরম সবকিছু গুছিয়ে এলাম। হঠাৎ দেখি বাচ্চা চিৎকার করছে। প্রথমে ময়মনসিংহে একটি হাসপাতলে নিয়ে গেলে সেখান থেকে এই হাসপাতালে পাঠায় আমাদের।