প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২২ ১২:২৭ পিএম
আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২২ ১৩:৩১ পিএম
৩ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ছবি : সংগৃহীত
আজ ৩ নভেম্বর। ১৯৭৫ সালের এই দিনে রচিত হয়েছিল ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও জাতীয় নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে সেদিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের এ দিনটিকে পালন করা হয় জেলহত্যা দিবস হিসেবে।
নৃশংস ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর ওই সময়ের কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন্স) আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি হিসেবে রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের নাম উল্লেখ করা হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়—তার নেতৃত্বে চার থেকে পাঁচজন সেনা সদস্য কারাগারে ঢুকে চার নেতাকে হত্যা করেন। গুলি করে তাদের হত্যা করা হয়। পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনায় মামলার ২৩ বছর পর ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত মো. মতিউর রহমান মামলার রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে আসামি রিসালদার মোসলেম উদ্দিন (পলাতক), দফাদার মারফত আলী শাহ (পলাতক) ও দফাদার আবুল হাশেম মৃধাকে (পলাতক) মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া চার আসামি—সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদসহ ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নূরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে দেওয়া হয় খালাস।
বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট মোসলেমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মারফত আলী ও হাশেম মৃধাকে খালাস দেন। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকেও খালাস দেন হাইকোর্ট।
২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। এরা হলেন—কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, লে. কর্নেল (অব.) মহিউদ্দিন আহমদ (ল্যান্সার), মেজর (অব.) এ কে বজলুল হুদা ও মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন (আর্টিলারি)।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করলে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল ওই রায় বাতিল করে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন। প্রধান বিচারপতি ছাড়া বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন—বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি মো. ইমান আলী।
সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন হলেন—রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী শাহ ও দফাদার আবুল হাশেম মৃধা। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—খন্দকার আবদুর রশীদ, শরিফুল হক ডালিম, এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী, আবদুল মাজেদ, আহমদ শরিফুল হোসেন, মো. কিসমত হোসেন, নাজমুল হোসেন আনসার, সৈয়দ ফারুক রহমান, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন।
তবে জেলহত্যা মামলার ১০ আসামি এখনও পলাতক। তারা হলেন—মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোসলেম উদ্দিন, আপিল বিভাগের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মারফত আলী শাহ ও আবুল হাশেম মৃধা, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খন্দকার আবদুর রশীদ, শরিফুল হক ডালিম, এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী, এ এম রাশেদ চৌধুরী, আহমদ শরিফুল হোসেন, কিসমত হোসেন ও নাজমুল হোসেন আনসার।
এদিকে গত বছর পলাতক আসামি আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এ ছাড়া পলাতক অবস্থায় খুনিদের একজন আবদুল আজিজ পাশা ২০০১ সালের ২ জুন জিম্বাবুয়েতে মারা গেছেন বলে জানা যায়।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জেলহত্যা মামলার আসামি সাবেক হাইকমিশনার খায়রুজ্জামানকে মালয়েশিয়ায় আটক করা হয়েছে। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ২০০৪ সালে জেলহত্যা মামলা থেকে খালাস পান। ২০০৫ সালে তিনি মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়োগ পান। পরে ২০০৭ সালের আগস্টে তাকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খায়রুজ্জামানকে দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনি সেই নির্দেশ অমান্য করে মালয়েশিয়ায় থেকে যান।
সরকারের বিভিন্ন সূত্র জানায়, জেলহত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কর্নেল (অব.) এম বি নূর চৌধুরী কানাডা ও লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। তাদের ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক দিন ধরে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে এক অনুষ্ঠানে বলেন, খুনি রাশেদ চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে কানাডার হাইকমিশনার লিলি নিকোলস গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে নূর চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে কানাডার প্রতি অনুরোধ জানান আইনমন্ত্রী।
এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইতিহাসের জঘন্যতম জেলহত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। তবে এখনও দণ্ডপ্রাপ্ত অনেক আসামি পলাতক আছেন। তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে অবশ্যই দণ্ড কার্যকর করা হবে।’
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আনিসুল হক আরও বলেন, ‘খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভার সব সদস্যই ছিলেন হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মেলানো আওয়ামী লীগার এবং এটা ছিল একটা আধাসামরিক সরকার। অভ্যুত্থানকারী মেজর-ক্যাপ্টেনরাই ওই সরকারের ওপর ছড়ি ঘোরাত। ওই সরকারের পেছনে সেনা সমর্থন থাকলেও বঙ্গভবনের ওপর তাদের পুরোপুরি কর্তৃত্ব ছিল না। ২৪ আগস্ট তখনকার সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। এই জিয়াই পরবর্তীতে জেলহত্যা ও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন এবং অনেককে দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘জেলহত্যা মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায় হয়েছে। তবে এখনও অনেক আসামিই পলাতক। তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করলে দেশ আরও একবার কলঙ্কমুক্ত হবে।’