নতুন সরকারের কূটনীতি
আমিনুল ইসলাম মিঠু
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ ০৯:৪৪ এএম
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। ছবি: সংগৃহীত
বেশিরভাগ দেশ ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে সরকারকে অভিনন্দন জানালেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এই নির্বাচন প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি বলে মন্তব্য করেছে। নির্বাচনের আগেও নির্বাচন প্রশ্নে সরকারকে নানা চাপে রেখেছিল এই দেশগুলো। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। নানা বৈশ্বিক সংকটের এই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টিকেও তারা রেখেছেন আলোচনার একেবারে প্রথম দিকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন সরকারকে ইতিবাচক সাবধানী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
তবে সরকার-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উল্লেখিত পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য দিলেও তাদের পুরো বিবৃতি নেতিবাচক নয়। সেখানে একই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে আগামীতে উন্নয়ন ও পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করার কথাও বলেছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। গত বৃহস্পতিবার সরকার গঠনের দিনও এই দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বঙ্গভবনে উপস্থিত ছিলেন। শপথ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ উল্লিখিত দেশগুলোর উপস্থিতি সরকারের প্রতি তাদের আস্থা ও সমর্থনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে মনে করেন তারা।
আর দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করব। পূর্ব-পশ্চিম সবার সাথে সম্পর্কের আরও উন্নয়ন ঘটাব। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, কারও সাথে বৈরিতা নয়, সবার সাথে সুসম্পর্কÑ সেই নীতি নিয়েই আমরা সবার সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলব।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু হয়নি বলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে মেরুকরণ হয়েছে। এছাড়া বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী পক্ষ এই নির্বাচন নিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভারত, চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে এটি বদলে যেতে থাকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্ব কমাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতাও ছিল বলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন।
কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো সামাল দিতে আওয়ামী লীগ সরকারকে এবার পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার চারটি ‘আই’ (ইমেজ, ইনফরমেশন, ইনভেস্টমেন্ট ও ইমপ্লিমেন্ট) এর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে নতুন সরকারকে, বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। শুরুতেই ভাবমূর্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারের দিকেও জোর দিতে হবে। পাশাপাশি আগামী দিনে দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খাতে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা জরুরি। সঠিক, নির্ভুল ও যথাযথ তথ্য-উপাত্ত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপনের মাধ্যমে এটি করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতির মাধ্যমে যেহেতু বহির্বিশ্ব থেকে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো আদায় করা যায়, তাই নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়কে নীতিগুলো সবদিক বা সব দেশের প্রতি নজর রেখেই তৈরি করতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশ ও এদেশের মানুষকে ভয় দেখাচ্ছে, যা দূর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ নিয়ে যে ভয় দেখানোর রাজনীতি তারা করছে, সেটি প্রতিহত করার বিষয়ে জোর দিতে হবে নতুন সরকারকে। আর বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে যেসব দেশ আগেভাগে স্বাগত জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আরও সংবেদনশীল, বিশেষ করে দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই নয়; অর্থ, বাণিজ্য, সিভিল এভিয়েশন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, তথ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোকে বৈদেশিক যোগাযোগ তথা দেশের ইমেজ পুনরুদ্ধারে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ নিয়ে বহির্বিশ্বে যেসব ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে, সেগুলো খণ্ডাতে সঠিক তথ্য তুলে ধরতে হবে। যারা ভয় দেখাচ্ছে, তারা চায় বাংলাদেশের মেধাবীরা যাতে বিদেশে চলে যায়। তাই মেধাবীদের জন্য দেশে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, বিশেষ করে তাদের কাজের পরিধি বাড়ানোসহ যথাযথ মূল্যায়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার মতো ভয়গুলো দেখিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কগুলো নষ্ট করার চেষ্টা করছে কতিপয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠী। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বিশাল ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। হতে পারে তারা হয়তো কোনো বিশেষ কারণে বা মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা দেশগুলোর দূত বা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কোনো সরকারি চিন্তা-ভাবনা জানিয়েছে। কিন্তু তারা বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এদেশের কোনো সংকট থাকলে তা এদেশের জনগণই ঠিক করবে, বাইরের কোনো দেশ এসে ঠিক করতে পারবে নাÑ এই বিষয়টিই ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নিশ্চিত ও পরিষ্কার হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এম হুমায়ুন কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ফেরাতে হলে ভূরাজনৈতিক যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে এবং অভ্যন্তরীণ সংযোগ বাড়ানোসহ রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। এটি সম্ভব হবে কূটনৈতিক পেশাদারিত্ব শক্তিশালী করার মাধ্যমেই।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক মুন্সী ফয়েজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচনের আগে বেশ কিছুদিন ধরে কিছু দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের টানাপড়েন লক্ষ করা গেছে। দেশগুলো আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কথাবার্তা বলছিল, যা হস্তক্ষেপের মতো মনে হচ্ছিল। এটাকে হুমকি হিসেবে ধরে নিয়ে সেখান থেকে এখন নতুন করে শুরু করতে হবে। পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঝালিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ সবাই আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। সবার সাথে নানা রকম দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আছে, যেগুলো থেকে আমরা উপকৃত হই। তাই দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক দৃঢ় ও জোরদার করতে হবে। কে কী বলেছে, আগে সেগুলো ভুলে গিয়ে ও সম্পর্কের যদি কোনো টানাপড়েন থাকে, সেগুলো আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শুধরে নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের জনগণের প্রতি সরকারের যে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার আছে তা রক্ষা করতে হবে; সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আর সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়- এ নীতিতেই চলতে হবে। এখানে মূল বিষয় হবে জাতীয় স্বার্থ। কে কী বলল বা চাইল তা নয়, আমাদের জাতির স্বার্থে ও আর্ত-সামাজিক উন্নয়নে কোন বিষয়টি প্রয়োজন তা নিশ্চিত করা হবে।
প্রথম কার্যদিবসে যা বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, দেশি-বিদেশি সব চাপ উতরে নির্বাচন হয়ে গেছে। এখন সরকার কোনো চাপ অনুভব করছে না। সরকার সবার সঙ্গে কাজ করবে। সবাই বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার।
গতকাল রবিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার মন্ত্রণালয়ে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন তিনি।
হাছান মাহমুদ বলেন, আমরা কারও চাপ অনুভব করছি না। নির্বাচন নিয়ে চাপ, গভীর চাপ, মধ্যম চাপ আরও নানা ধরনের চাপ ছিল। সব চাপ উতরে নির্বাচন হয়ে গেছে। সুতরাং আমরা কখনও কারও কোনো চাপ অনুভব করিনি।
নির্বাচন নিয়ে সব দেশে কমবেশি প্রশ্ন থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে সব দেশে কমবেশি প্রশ্ন থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন পর্যবেক্ষক এসেছেন। তাদের মধ্যে একজন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, ভালো একটা নির্বাচন হয়েছে। তখন প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, তোমাদের দেশের চেয়ে ভালো হয়েছে? তখন তিনি বলেছেন, আমাদের দেশেও নির্বাচনের পর নানা প্রশ্ন থাকে। আপনাদের ভালো নির্বাচন হয়েছে।
রোহিঙ্গা সমস্যা কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান করতে চান উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আমরা প্রতিনিয়ত যোগাযোগের মধ্যে আছি। আশা করি কূটনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান হবে। আমরা কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানে বিশ্বাস করি না। আমরা কূটনৈতিকভাবে এ সমস্যার সমাধান করব।