দীপক দেব
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৪ ০৮:৫৩ এএম
দেশের ভেতরে ও বহির্বিশ্বের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা। আগামী পাঁচ বছর এই মন্ত্রিসভা সরকার চালাবে। নির্বাচনী ইশতেহারে দলটির স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে অঙ্গীকার, সেটি বাস্তবায়নসহ তাদের সামনে মোটাদাগে চলমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ বড় হয়ে উঠবে। অনেকে মনে করেনÑ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাও টানা চতুর্থ মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে কঠিন পরীক্ষা হয়ে দেখা দেবে। এসব বিষয় মোকাবিলায় নতুন সরকার কতটা সক্ষম ও তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটাÑ তা নিয়ে সর্বস্তরে শোনা যাচ্ছে আলোচনা। নাগরিক প্রতিনিধিরা নতুন মন্ত্রিসভাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার ওপর দৃষ্টিপাত করেছেন।
আওয়ামী লীগ ও জোট শরিক ১৪ দলের নেতাদের দাবিÑ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিচার বিশ্লেষণ করে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। নতুন ও পুরোনোদের নিয়ে একটি গতিশীল মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন তিনি। কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ ১১টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ইশতেহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ, তা বস্তবায়ন এবং সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন মন্ত্রিসভা দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নতুন মন্ত্রিসভায় ৩৬ সদস্যকে বেছে নিয়েছেন, যার মধ্যে ১৪ জনকে প্রথমবারের মতো দায়িত্ব দিয়েছেন। পুরোনো প্রায় ৩০ মন্ত্রী বাদ পড়েছেন। পুরোনোদের মধ্যে যারা আবার দায়িত্ব পেয়েছেন তারা রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সামনের দিনে এই ৩৬ জনকে দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির প্রয়োগেরও বিকল্প দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
মন্ত্রিসভা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত কয়েক মেয়াদের মধ্যে এবারের মন্ত্রিসভা আকারে ছোট। কিন্তু রাজনীতিকদের প্রাধান্য দিয়েই গঠিত হয়েছে মন্ত্রিসভা। সবচেয়ে বড় বিষয়, বিগত মেয়াদে বিভিন্ন সময়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি মোকাবিলায় যারা ব্যর্থতার পরিচয় কিংবা সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন, তাদের এবার রাখা হয়নি। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়টি এবার যে প্রাধান্য পেয়েছে, তা স্পষ্ট। বলা হচ্ছে, এ কারণেই পরিবর্তন আনা হয়েছে অর্থ, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
অর্থমন্ত্রী করা হয়েছে আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে। তিনি ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। চাকরিজীবনে তিনি কূটনীতিক হলেও পড়ালেখা করেছেন অর্থনীতিতে। পেশা শুরু করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা। যেখানে তিনি কৃতিত্বই দেখিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন হলোÑ তিনি অর্থ মন্ত্রণালয় কি সামলাতে পারবেন?
আগের মন্ত্রিসভায় বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন একজন ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, সিন্ডিকেট করে পণ্য সংকট সৃষ্টি এবং হুটহাট পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। এবার এই মন্ত্রণালয়ে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী দেওয়া হয়নি। আহসানুল ইসলাম টিটুকে করা হয়েছে প্রতিমন্ত্রী। তিনি প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন। জনঘনিষ্ঠ এই মন্ত্রণালয় তিনি কীভাবে চালাবেন, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কিছু দেশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপের শঙ্কাও আলোচনায় আছে। উপমহাদেশের কূটনীতিতেও ভারসাম্য রক্ষার বিষয় রয়েছে। এই অবস্থায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও আনা হয়েছে পরিবর্তন। সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় সামলানো ড. হাছান মাহমুদকে দেওয়া হয়েছে এই দায়িত্ব। তিনি এ মন্ত্রণালয়ে আগেও কিছুদিন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তবে এবার তার সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ।
নতুন মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বড় পদোন্নতি পেয়েছেন মহিবুল হাসান চৌধুরী। উপমন্ত্রী থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে তরুণ এই মন্ত্রীর উদ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে গতি পাবে বলে আশা তৈরি হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও এসেছে নতুন মুখ। বিশেষ করে টেকনোক্র্যাট কোটায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে খ্যাতিমান চিকিৎসক ডা. সামন্ত লাল সেনের নিয়োগের বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
নতুন মন্ত্রিসভায় ১৫ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী তাদের আগের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। তাদের ক্ষেত্রে সরকারের উন্নয়নকাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং মেগা প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার বিষয় সামনে আসছে।
বিদায়ি মন্ত্রিসভায় যেখানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মাত্র ৫ জন নেতা ছিলেন, এবার সেখানে স্থান পেলেন ৯ জন। শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, দীপু মনি, হাছান মাহমুদদের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছেন মুহাম্মদ ফারুক খান, আব্দুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সিমিন হোসেন রিমি ও মোহাম্মদ আলী আরাফাত। বিষয়টিকেও ইতিবাচকভাবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
কঠিন সময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। গতকাল শুক্রবার রাতে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, নতুন মন্ত্রিসভা আগেরটির চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। বিতর্কিত মন্ত্রীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে নতুনদের সামনে দুর্নীতি রোধ, সুশাসন ও ভোটাধিকার নিশ্চিতসহ অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আশা করি, তারা সফল হবেন।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ কেমন হলো বা কে কোন মন্ত্রণালয় পেলেন, তা যেভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, প্রশ্ন থেকেই যায়। একচ্ছত্র রাজনৈতিক অঙ্গন ও অবারিত ক্ষমতাসম্পন্ন শাসনকাঠামোতে দ্বাদশ সংসদ ও নতুন মন্ত্রিসভা জবাবদিহিমূলক সুশাসন ও জনকল্যাণ কতটুকু নিশ্চিত করতে পারবে সরকারÑ এসবই বড় প্রশ্ন। যার জবাব কেবল সময়ই দিতে পারবে।
তিনি বলেন, জনগণের প্রতি জবাবদিহির সব রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিলুপ্তপ্রায় পরিপ্রেক্ষিত সরকার পরিচালনা একটা চ্যালেঞ্জই হবে। জনস্বার্থের অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিফলন, শুদ্ধাচার নিশ্চিত ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করাটাও এই মন্ত্রিসভার জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, তবে দেখার বিষয় হবে ‘অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা হবে’ মর্মে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বা দলীয় নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা’র বাস্তবায়নে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা নিজস্ব অবস্থান থেকে ও সামষ্টিকভাবে কতটুকু তৎপরতার পরিচয় দিতে পারবেন। নাকি এসব ঘোষণা আগের চেয়েও বেশি কাগুজে দলিলে পরিণত হবে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা সম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া নতুন মন্ত্রিসভা গতিশীল হবে বলে আশা করেন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, নতুন মন্ত্রিসভা গতিশীল হবে ও আগামী দিনের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।
প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ও ১৪ দলীয় জোট ঢাকা মহানগরের সমন্বয়ক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলটির নেতারা মনে করেনÑ আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয় মাথায় রেখে অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে ৩৬ জনকে মন্ত্রিসভায় নিয়েছেন শেখ হাসিনা। বিশেষ করে আগের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করছেন এমন কয়েকজনকে আনা হয়েছে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়টি মাথায় রেখেই। তাদের মতে, এবারের মন্ত্রিসভায় রাজনৈতিক নেতাদের মূল্যায়ন করার পেছনে দেশি-বিদেশি চ্যালেঞ্জের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের প্রতি অবিচল থেকে তারা আগের মতোই ভূমিকা রেখে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন।