ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৪:০৪ পিএম
১৭৪ বছরের রেকর্ড ভাঙল তাপমাত্রা। ফাইল ফটো
চলতি বছর ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই দেশের তাপমাত্রা বেশি ছিল। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি আগামী বছরের এপ্রিল বা মে মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির এ হার শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বব্যাপী অব্যাহত ছিল। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) প্রতিবেদনে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারকে ১৭৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সাগরের বাস্তুতন্ত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরিবর্তন আসতে পারে মানবিক আচরণে- এমন আশঙ্কা করছেন পরিবেশ ও আবহাওয়াবিদরা।
গত ৩০ নভেম্বর ডব্লিউএমও গত ১১ মাসের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার তুলে ধরে। সেখানে বলা হয়, ২০২৩ সাল ছিল রেকর্ড উষ্ণতম বছর। গ্রিন হাউস গ্যাসের মাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং উচ্চতা রেকর্ড পরিমাণ বাড়ছে। অ্যান্টার্কটিক সমুদ্রের বরফ গলছে। এই চরম আবহাওয়া মৃত্যু ও ধ্বংসের কারণ হিসেবে চিহ্নিত। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি আগামী বছরের প্রথম দিকে প্রকাশিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
ডব্লিউএমওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরের তথ্যে দেখা গেছে, এ বছর বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রায় ১.৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল, যা ১৮৫০-১৯০০-এর প্রাক-শিল্পের বেসলাইনের ওপর শূন্য দশমিক ১২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি। এটি ১৭৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। তা ছাড়া গত ৯ বছর তথা ২০১৫-২০২৩ সাল পর্যন্ত রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণতম সময় ছিল। উষ্ণায়নের মূলে রয়েছে এল নিনোর ঘটনা। এল নিনো সম্ভবত ২০২৪ সালও তাপমাত্রার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে।
‘এল নিনো’ এবং ‘লা নিনা’ হলো ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসকিলেশন (ইএনএসও) নামক আবহাওয়ার প্যাটার্নের দুটি অংশ, যা ক্রান্তীয় পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর বাতাসের ধরন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার একটি অনিয়মিত কিন্তু পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন। ‘এল নিনো’ বলতে ইএনএসওর উষ্ণায়ন পর্যায়কে বোঝায়। অন্যদিকে ‘লা নিনা’ বোঝায় এর শীতলকরণ পর্যায়কে। ‘এল নিনো’ বছরগুলোতে তাপমাত্রা প্রায় ০.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়ে থাকে যা ‘লা নিনা’র সময়ে প্রায় একই পরিমাণে হ্রাস পায়। দুই প্যাটার্নের ওঠানামার ঘটনাটি প্রায়ই একটি নিরপেক্ষ পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (বিএমডি) আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, এ বছর এল নিনোর বছর। আমাদের শীতকাল চলছে, কিন্তু শীত বলতে যা বোঝায় তা অনুভূত হচ্ছে না। মাত্র এক দিন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রির কিছু ওপরে ছিল। প্রকৃত শৈত্যপ্রবাহ আসেনি। প্রতিবছর স্বাভাবিক যে তাপমাত্রা থাকে সেই তুলনায় এ বছর এক থেকে দুই ডিগ্রি বেশি ছিল। বিশ্বে অক্টোবর মাস ছিল উষ্ণতায় রেকর্ড। বৈশ্বিক তাপমাত্রা অক্টোবর মাসে গড়ে ১.৫৯ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট বেশি ছিল। বিশ্বকে দুই ভাগ করে দেখানো হয়েছে- উত্তর গোলার্ধ ও দক্ষিণ গোলার্ধ। উত্তর গোলার্ধের তাপমাত্রা ২.২৭ ডিগ্রির বেশি ছিল। জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসেই তাপমাত্রা বেশি ছিল। জুনে ছিল ১.৩, জুলাইয়ে ১.৪২, আগস্টে ১.৫৪ ও অক্টোবরে ছিল ১.৫৯ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট, অর্থাৎ অক্টোবরে সবচেয়ে বেশি ছিল।
তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে প্রাকৃতিক ক্ষতি কী- জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। কৃষি খাতে প্রচুর ক্ষতি হয়। বিশেষ করে এ বছর বঙ্গোপসাগরে ৪টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় মিগজাউমের আঘাত আমাদের দেশে না এলেও প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। এতে আলু, শাক-সবজিসহ শীতকালীন ফসলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পোলট্রি শিল্পেও ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, এল নিনো মে পর্যন্ত থাকলে তো অর্ধেক বছরই পেয়ে যাবে। তা ছাড়া শুধু বৈশ্বিক নয়, আমাদের দেশে এ বছরের ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসের আবহাওয়াই অস্বাভাবিক ছিল। বেশিরভাগই তাপমাত্রা বেশি ছিল বা অন্য কিছু ছিল, যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।
সমাধান কী হতে পারে- জানতে চাইলে মো. বজলুর রশিদ বলেন, এটি যেহেতু বৈশ্বিক ইস্যু সেটি আমরা একা নিয়ন্ত্রণ ও সমাধান করতে পারব না। আমাদের জনসংখ্যাও বেশি। এর সমাধানে আন্তর্জাতিক সমন্বয় দরকার। বিশেষ করে আমরা যা করতে পারি তা হচ্ছে, পর্যাপ্ত গাছ লাগাতে হবে। আমাদের শিল্প ও নগরায়ণ দরকার। তাহলে কীভাবে কাজ করব? সেজন্য আমাদের পরিবেশবান্ধব কাজগুলো করতে হবে। পেট্রোলিয়াম থেকে বের হয়ে বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। যেমন- মেট্রোরেলে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, পেট্রোলিয়াম নয়। বিশ্বের অনেক দেশ বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার করছে।