প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ ২৩:০৪ পিএম
মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রশ্ন ফাঁসে চিকিৎসক ও কোচিং সেন্টারের মালিক জড়িত থাকার খবর আসে। এনজিও কর্মকর্তা ও ব্যাংক কর্মকর্তার নামও আসে মাঝেমধ্যে। এবার জানা গেল এক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানের নাম। প্রশ্ন ফাঁসের টাকায় তিনি চেয়ারম্যানও হয়েছেন। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারবার করেন তিনি। তার রয়েছে বিশাল চক্র। ফাঁস করা প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষার পাশাপাশি পছন্দের মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ারও ব্যবস্থা করে দিতেন তিনি। এই চেয়ারম্যানের নাম সাজ্জাদ হোসেন। তিনি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সিংড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য।
গত ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চেয়ারম্যান ও কোচিং সেন্টার মালিক আবদুল হাফিজ হাপ্পু ছাড়াও পাঁচ চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা চিকিৎসকরা হলেন- ফয়সাল আহমেদ রাসেল, মো. সোহানুর রহমান সোহান, তৌফিকুল হাসান রনি, ফয়সাল আলম বাদশা ও ইবরার আলম। এছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে মো. রায়হানুল ইসলাম সোহান, মো. আবদুল হাফিজ ও বকুল রায় শ্রাবণ নামে তিনজনকে।
সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, কোচিং সেন্টারের মালিকের কাছ থেকে পাওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছেন শত শত শিক্ষার্থী। পাস করে তারা ভর্তিও হন পছন্দের মেডিকেল কলেজে। তাদের কেউ এখনও পড়ছেন। কেউ পাস করে হয়েছেন চিকিৎসক। সারা দেশে এমন অসংখ্য চিকিৎসক রয়েছেন, যারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।
সিআইডির অতিরিক্ত এসপি জুয়েল চাকমা জানান, সম্প্রতি মেডিকেল প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত চক্রকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালায় সিআইডি। এ পর্যন্ত ১০টি পৃথক অভিযান চালানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হওয়া ৯ জনসহ এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪৮ জন। এদের মধ্যে ২৩ জনই চিকিৎসক। বাকিদের মধ্যে এনজিও কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্তা ও কোচিং সেন্টারের মালিকও রয়েছেন। এ চক্রের কাছ থেকে আমরা প্রায় ৪০০ জনের একটি তালিকা পেয়েছি। যারা সকলেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ পড়াশোনা করছেন, কেউ পাস করে বের হয়েছেন।
সিআইডি বলছে, গ্রেপ্তারকৃতদের গতকাল আদালতে হাজির করা হয়। তারা প্রত্যেকেই প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত একাধিক চিকিৎসক ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। যেমন আবদুল হাফিজ হাপ্পু নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় বিটস নামের একটি মেডিকেল ভর্তির কোচিং সেন্টারের মালিক। এর আগে বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে প্রশ্ন ফাঁসের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে জসীম উদ্দিন ভূইয়া মুন্নু নামে এক ব্যক্তির নাম আসে। তাকে সিআইডি গ্রেপ্তার করে। তার কাছ থেকে একটি ডায়েরি পায় সিআইডি। ওই ডায়েরিতে সারা দেশে মেডিকেল প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত চক্রের নামের তালিকা পাওয়া যায়। সেই তালিকা ধরে সিআইডির অভিযান অব্যাহত থাকে। মূলত ওই অভিযানের ধারাবাহিকতায় অভিযান চালিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান, কোচিং সেন্টারের মালিক, তাদের দুই সহযোগী ও পাঁচ চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির অভিযানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন ২০১০ সাল থেকে প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত। তিনি প্রশ্ন ফাঁস চক্রের হোতা জসীমের অন্যতম সহযোগী। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যেসব শিক্ষার্থী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে প্রস্তুতি নিয়েছেন বা নিচ্ছেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে সরবরাহ করতেন। এছাড়া ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পাস করা শিক্ষার্থীদের পছন্দের কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়ারও চুক্তি করতেন। প্রশ্ন ফাঁসে সাজ্জাদ চেয়ারম্যান কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আর সেই টাকায় তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন। চেয়ারম্যান হওয়ার সুবাদে তিনি প্রশ্ন ফাঁসে আরও বড় সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। দুই বছর আগে তিনি চেয়ারম্যান হন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় একটি কলেজের শিক্ষক। তার স্ত্রীও শিক্ষকতা করেন। ২০১৭ সালে মেডিকেল প্রশ্ন ফাঁসের এক মামলায় সাজ্জাদ চেয়ারম্যানকে আসামি করা হয়েছিল। এর আগে যেসব চিকিৎসক প্রশ্ন ফাঁসে গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারাও আদালতে জবানবন্দিতে সাজ্জাদ চেয়ারম্যানের জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে সিআইডি।